বিজ্ঞাপন
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে যেদিন (শনিবার) ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য—তার আগের দিন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদু সালাম বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আলাদিনের চেরাগ নেই যে ঘষা দিলেই গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি—সব চলে আসবে।’ ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে লংমার্চ করে কোনো লাভ নেই। বরং এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে যে পেট্রল বা গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও অপচয়।’
প্রশ্ন হলো, গ্যাস-বিদ্যুৎ তথা জ্বালানি সংকট নিরসনে আলাদিনের চেরাগ কেন লাগবে? প্রচলিত ব্যবস্থাটি কেন ধ্বংস হয়ে গেল যে এখন আলাদিনের চেরাগের মতো অলৌকিক কিছু একটা না হলে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না? এই পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী?
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হয় গত ৭ জুন। এর তিন দিন পরে, ১০ জুন অর্থাৎ বাজেট পেশ করার আগের দিন জাতীয় সংসদের বৈঠকে দেশের চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তার আগের দিনও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে এমপিদের তোপের মুখে পড়েন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এমনকি জাতীয় সংসদের স্পিকারও তাঁর নিজ জেলা ভোলায় গ্যাস থাকলেও সেখানকার মানুষ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছে না বলে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১০ জুন জাতীয় সংসদে জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের আলোচনায় নাটোরের এমপি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার তাঁর এলাকার শিল্পকারখানা ও আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগের দাবির জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, ‘আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের সবার শ্বশুরবাড়ি আছে। সিলেটে গেলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলে সিলেটের দামান, আর নাটোরে গেলে আমাকে বলে নাটোরের জামাই। নাটোর বাংলা ভাষার গালির জায়গা, আমার শ্বশুরবাড়ি। এখানে তো গ্যাস দিতেই হবে।’
দেশের জ্বালানি সংকট অবশ্য এখন আর রসিকতার পর্যায়ে নেই। এটি এখন দেশের এক নম্বর সমস্যা। কেননা, জ্বালানি সংকটে ইতিমধ্যে বহু কল-কারখানা বন্ধ। চালু থাকা কারখানার উৎপাদন কমেছে। অনেক শ্রমিক বেকার হয়েছেন। উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই বলতে গেলে পাইপলাইনে গ্যাস না পেয়ে সাধারণ মানুষকে বিকল্প হিসেবে বেশি দামে এলএনজি এবং ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
মাসে মাসে গ্যাসের বিল দিয়েও এলএনজি এবং ইলেকট্রিক চুলার পেছনে অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু মানুষের আয় কি বেড়েছে? সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সম্প্রতি একশ থেকে ১৪২ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ছোট ব্যবসায়ীদের কী হবে? সরকারি-বেসরকারি সবাই তো একই বাজারে গিয়েই সদাই কেনেন।
বাংলাদেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মূলত বহুমুখী সমস্যা এবং অতীতের সরকারগুলোর গণবিরোধী নীতির একটি সম্মিলিত বিস্ফোরণ। ফলে এখান থেকে রাতারাতি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তবে দিন শেষে নিজের ভূখণ্ড আর সমুদ্রের তলদেশই ভরসা। কেননা, বাংলাদেশের মাটির নিচে যে প্রচুর গ্যাস আছে, সেটি প্রমাণিত।
বাংলাদেশ এখন যে জ্বালানির গভীর সংকটে নিমজ্জিত হলো, সেটি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে যদি আমদানি-নির্ভরতা আরও বাড়ে। এ মুহূর্তে ৬০ ভাগের বেশি জ্বালানি আমদানিনির্ভর। ১০ বছর পরে যদি এটা ৯০ শতাংশ হয়ে যায়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এজন্য জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাসের আহরণ বাড়াতে হবে।
উপরন্তু গভীর সমুদ্রের তলদেশেও গ্যাস থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, দেশের জ্বালানি সরবরাহের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে এটিকে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছে মূলত কিছু কোম্পানির স্বার্থে—যারা বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। পক্ষান্তরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। অথচ অতীতের সরকারগুলো যদি বাপেক্সকে শক্তিশালী করত, নিজের দেশের মাটি ও গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস উত্তোলন করতে পারত, তাহলে আজকের এই সংকটের বোঝা বইতে হতো না।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট নিরসনের আরেকটি বড় উপায় কয়লা। দিনাজপুরে যে কয়লা আছে, সেটি উন্নত মানের। কিন্তু সেখানের সংকটটা ভিন্ন। সেটি হলো, ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতিতে যে পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করা যায় বা কয়লাকে গ্যাসে রূপান্তর করে যে পরিমাণ জ্বালানি পাওয়া যায়, সেটি চাহিদার তুলনায় কম।
সেক্ষেত্রে বিকল্প হচ্ছে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিপদ ও ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২০০৬ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর মানুষ তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং প্রাণও দিয়েছে। সুতরাং, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার মতো সিদ্ধান্তটিও ঝুঁকিপূর্ণ। এর সঙ্গে সরাসরি মানুষের জীবন, পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির সম্পর্ক।
পৃথিবীর অনেক দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলেও সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতা মেলে কি না, সেটি ভাবা দরকার। আবার সব কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তোলা যায় না। কয়লার স্তর কত গভীরে, ভূতাত্ত্বিক গঠন, কয়লার মান এবং খনন ব্যয়—এসবের ওপর নির্ভর করে কোথাও উন্মুক্ত এবং কোথাও ভূগর্ভস্থ খনন করা হয়। উন্মুক্ত খনির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিপুল পরিমাণ জমি ও ওপরের মাটির স্তর অপসারণ। এর ফলে বন, কৃষিজমি, জলাধার ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
পাশাপাশি কয়লা খনি থেকে মিথেন নির্গমন এবং কয়লা পোড়ানোর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা বেড়ে যায়। ফলে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনায় ভূগর্ভস্থ পানি, কৃষিজমি, বসতি, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতিই মুখ্য বিবেচনা। গত ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং তাঁদের জীবিকা যাতে নষ্ট না হয়, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার ইঙ্গিত কি না, সেটি অন্য আলোচনা।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মানুষের জীবন ও পরিবেশের ঝুঁকি যেমন বিবেচনায় নিতে হবে, তেমনি কোন খনিতে কী পরিমাণ কয়লা আছে, প্রতি টন কয়লার বিপরীতে কত একর জমি, কত ঘনমিটার পানি, কত পরিবার এবং কত বছরের কৃষি ঝুঁকিতে পড়বে—সেই হিসাবও করতে হবে। অর্থাৎ ‘খাজনার চেয়ে বাজনা’ বেশি হলে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
‘আলাদিনের চেরাগ’ দিয়েই শেষ করা যাক। বাংলাদেশ এখন যে জ্বালানির গভীর সংকটে নিমজ্জিত হলো, সেটি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে যদি আমদানি-নির্ভরতা আরও বাড়ে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, এ মুহূর্তে ৬০ ভাগের বেশি জ্বালানি আমদানিনির্ভর। ১০ বছর পরে যদি এটা ৯০ শতাংশ হয়ে যায়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। সুতরাং, প্রথমেই জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে এবং সেজন্য নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাসের আহরণ বাড়াতে হবে।
এই খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ত্রুটি দূর করতে হবে। অপচয় রোধ করতে হবে। চুরি ও দুর্নীতি শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। তারপর গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি কয়লার নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের আকাশে যেহেতু সারা বছরই সূর্য থাকে এবং মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া বিরাজ করে, অতএব সৌরশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত উৎপাদনে নিয়ে আসতে হবে এবং ধীরে ধীরে সেখানে উৎপাদন বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে মাটির নিচে এবং গভীর সমুদ্রে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়াতে হবে।
১০টি অনুসন্ধানের পরে যদি একটি বড় নতুন গ্যাসক্ষেত্রেরও সন্ধান মেলে, সেটিও দীর্ঘমেয়াদে সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখবে। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হবে। তার আগে ওই গ্যাস দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনে স্বস্তি আনতে হবে। বড় শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার আগে মানুষের নিত্যদিনের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ভোলার গ্যাসকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থাৎ গল্পের আলাদিনের চেরাগ বাস্তবে পাওয়া যাবে না।
মানুষের জীবনে স্বস্তি দেওয়া এবং উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হলে বাস্তবসম্মত, দীর্ঘমেয়াদি এবং অবশ্যই জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে হবে—যেখানে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নয়, বরং প্রাধান্য পাবে দেশের আপামর মানুষের স্বার্থ।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন