টবে মাটি খুঁড়তে গিয়ে চারটি অচেনা ডিম। আবার নিজের গ্রামের পরিত্যক্ত ঢেঁকিঘরের মাচায় একসঙ্গে ১২টি সাপের ডিম—দুটোই আমার নিজের দেখা। এমন দৃশ্য যে কাউকে ভয় পাইয়ে দিতে পারে। কিন্তু সাপের ডিম দেখলেই কি ধরে নিতে হবে, আশপাশে সাপ ঘুরছে? সাপ কোথায় ডিম পাড়ে, ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর কী হয়, আর হঠাৎ সাপের ডিম চোখে পড়লে কী করা উচিত, জেনে নেওয়া যাক সেসব

টিকটিকির ডিম দেখেছেন নিশ্চয়ই। আমিও দেখেছি। ঘরের পুরোনো আসবাব; অনেক দিন পরা হয়নি, এমন কাপড়ের ভাঁজে ডিম পাড়ে টিকটিকি। নিতান্তই নিরীহ ছোট্ট এই প্রাণীর ছোট ছোট ডিম আমাদের ভয় ধরায় না। কখনো দেখা যায় আস্ত ডিম, কখনোবা ভাঙা, মানে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়ে গেছে।
তবে সাপের ডিম কি দেখেছেন?
সেদিন টবে আগাছা পরিষ্কার করছি। একটা পুরোনো বালতিতে আম্মা বারোমাসি কালো মরিচের বীজ বুনেছিলেন। টানা তিন বছর একই টবে থেকে ফলন দিয়ে পরে অজানা কারণে গাছটি মারা যায়।
খালি টবে আমি আবারও কিছু মরিচ, মাধুরী পেয়ারা আর দোপাটি ফুলের বীজ বুনি। সঙ্গে ছোট্ট একটা ক্যাকটাস।

একসময় বীজগুলো থেকে চারা মাথা তুলে দাঁড়ায়। চারা বড় হওয়ার পাশাপাশি টবে আগাছাও জন্মায়। সেই আগাছা নিড়ানি দিয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছিলাম। আর ঠিক তখনই মাটির নিচে আবিষ্কার করলাম ছোট চারটি ডিম।
টিকটিকির ডিমের চেয়ে একটু বড় আর লম্বাটে। ভাবলাম, নিশ্চয়ই কোনো সাপের ডিম হবে!
এই ভেবে ভয়ে ভয়ে যেখানকার ডিম, সেখানে রেখে মাটি চাপা দিলাম। ডিমের মালিক সাপ যাতে টের না পায়। আর সেই থেকে ওই টব থেকে এক শ হাত দূরে থাকারও পণ করলাম। তবে ডিম মাটি চাপা দেওয়ার আগে ছবি তুলেছিলাম। সেই ছবি দিলাম ফেসবুকে। ক্যাপশনে লিখলাম, ‘গাছের ডালে ডিম পাড়ে পক্ষী রানি আর আমার টবে একি দেখি সর্প নাগিনী!’

পোস্টের অনেকের মন্তব্য পড়ে বুঝতে পারলাম, এই এক হালি ডিম সাপের নয়, বরং অঞ্জনের। যাক বাবা, সাপের ডিম নয়, এই ভেবে স্বস্তি পাওয়া গেল।
অঞ্জন নিরীহ সরীসৃপ। ডোরাকাটা তামাটে রঙের চকচকে শরীর, চার পায়ে দৌড়ে বেড়ায়। আর্জিনা, অ্যাঞ্জন, সাপের আঁচিল, সাপের লাঠি ইত্যাদি নামেও পরিচিত।
ইংরেজি নাম Keeled grass skink। বৈজ্ঞানিক নাম Eutropis carinata। শরীরের মাপ (লেজ বাদে) ১৩ সেমি। লেজ ১৭ সেমি।
শরীরের উপরিভাগটা ধাতব-বাদামি। নিচের রং ক্রিমরঙা অথবা হলুদাভ সাদা। সারা দেশেই দেখা মেলে এদের।

অঞ্জনের ডিম দেখে সাপের ডিম শুধু শুধু ভাবিনি। আমি ‘ঘরপোড়া গরু’, ‘সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয়’ পেতেই পারি। মানে একবার সত্যিই সাপের ডিম দেখেছিলাম। আর সেবারও ভয় পেয়েছিলাম। না পেয়ে উপায় ছিল না। কারণ, ঝোপ-জঙ্গলে নয়, সাপ ডিম পেড়েছিল আমাদের ঘরে।
বিনা ভাড়ায় সংসার পেতেছিল সাপ দম্পতি। ডিম দিয়েছিল, ডিম ফুটিয়ে বাচ্চাও তুলেছিল আমাদের ঢেঁকিঘরে।
আমাদের গ্রাম কুমিল্লা সদরের মৌলভীনগর। মাত্র ৪০ ঘর পরিবার নিয়ে ছোট্ট সুন্দর সবুজ গ্রামে মানুষ আর প্রকৃতির সহাবস্থান। গ্রামের ঠিক উত্তর মাথায় আমাদের বাড়ি। আর বাড়ির উত্তর দিকে ঢেঁকিঘর।

একসময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই ঢেঁকিঘর ছিল। ঢেঁকিছাটা চালের জন্য ঢেঁকির ধাপুরধুপুর শব্দ শোনা যেত ঘরে ঘরে। দিনে দিনে এর আবেদন ফুরিয়েছে।
নানি ও আম্মা বেঁচে থাকতে আমাদের ঢেঁকিঘর সচল ছিল। এখন বহুদিন ধরেই ঢেঁকিঘরে আমাদের যাওয়া হয় না। ফলে অযত্ন–অবহেলায় নাজুক হয়ে পড়েছে। ঘরের ওপর বাঁশঝাড়ের বাঁশ পড়ে টিনের চালা ভেঙে গেছে। বৃষ্টি হলেই ঘরটা পানিতে থইথই।
ওই ঘরে ঢেঁকির পাশাপাশি আছে কাঠের চৌকি, আম্মার হাতে তৈরি হাঁটুসমান উঁচু মাটির স্তম্ভ। সেই স্মম্ভের ওপর বাঁশের ছাউনিতে গড়া আরেক চৌকি।
সেই চৌকির নিচে আছে মাটির হাঁড়িপাতিল, কলস, তৈজসপত্র, মুড়ি ভাজার পাত্র, দইয়ের পাত্র, তাওয়াসহ পুরোনো অনেক কিছুই। আর ওপরে রাখা ধান শুকানোর জিনিসপত্র, ধান রাখার গোলা।

একদিন বড় ভাইয়ের সঙ্গে জীর্ণ ঢেঁকিঘর থেকে পুরোনো জিনিসপত্র বের করার অভিযানে নেমে পড়ি। অন্ধকার ঘর। এমনিতেই ভুতুড়ে পরিবেশ, তার ওপর বড় ভাই দিলেন সতর্কবাণী, ‘সাবধান, দেখিস সাপ থাকবার পারে।’
বড় ভাইয়ের কথায় তেমন গা করলাম না।
বাঁশের চৌকির নিচের সব মাটির হাঁড়িপাতিল একে একে বের করলাম। নাহ্, সাপখোপ কিছুই নেই। তবে বাঁশের চৌকির ওপরের অংশে অভিযান চালাতে গিয়েই বড় ভাইয়ের কথা ফলে গেল।
তিন হাত দূরে ছিটকে গেলাম। চোখের সামনে একসঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকা ১২টি সাপের ডিম! বাঁশের মাচার ওপর বিছানো বস্তা, তার ওপর ভাঙা টিনের চালা দিয়ে পড়া বাঁশপাতা আর বৃষ্টির পানি পড়ে ভিজে স্যাঁতসেঁতে। আর তাতেই মোক্ষম পরিবেশ পেয়ে ডিম পেড়েছে সাপ।

তবে সব ডিমই ছিল ফুটো, মানে এরই মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চাকাচ্চাও হয়েছে। একেবারে সত্যিকারের ‘বাচ্চা ভয়ংকর কাচ্চা ভয়ংকর’ ব্যাপার!
ডিমগুলো দেখে মনে প্রশ্ন, এসব আসলে কোন জাতের সাপের ডিম?
কৌতূহল থেকে ফেসবুকের ‘ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন ফাউন্ডেশন’ গ্রুপে ছবি পোস্ট করে জানতে পারি, ডিমগুলো বিষধর গোখরা সাপের। কেউ কেউ আরও নির্দিষ্ট করে বললেন, পদ্ম গোখরার ডিম।
এসব পড়েটড়ে আমি আর ঢেঁকিঘরের কাছে যাওয়ার সাহস পেলাম না। বড় ভাই সাবধানে বাসাসহ ডিমের খোসাগুলো দূরে ফেলে দিলেন। কিন্তু দুশ্চিন্তা যায় না, এখন সাপ যদি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ফেরত এসে বাসা খুঁজে না পায়? যদি প্রতিশোধ নেয়?


হঠাৎ সাপের ডিম চোখের সামনে পড়লে কী করা উচিত? আতঙ্কিত না হয়ে কী করা যেতে পারে? এসব জানতে চেয়েছিলাম গাজীপুরের বন অধিদপ্তরের বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের হারপেটোলজিস্ট (উভচর ও সরীসৃপ বিশারদ) সোহেল রানার কাছে।
সাপের খাবার মূলত ইঁদুর। তাই সাপের উৎপাত কমাতে হলে আগে ইঁদুরের উৎপাত কমাতে হবে। ইঁদুরের উৎপাত ঠেকাতে ঘরে বিড়াল পুষতে পারেন।
মাটির ঘর বা মাটির মেঝেতে ইঁদুরের গর্ত দেখামাত্রই তা মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে; কেননা সাপ নিজে গর্ত করতে পারে না, ইঁদুরের গর্তে এসে ডিম পাড়ে, বসতি গড়ে। চাইলে মাটির মেঝে সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া যেতে পারে।
বাড়ির আশপাশে ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখুন।
হাঁস–মুরগি খামারে সাপের আক্রমণ ঠেকাতে চারপাশে নেট বা জাল দিয়ে বেড়া তৈরি করা যায়।
সাপ তাড়াতে কার্বলিক অ্যাসিডের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে কার্বলিক অ্যাসিড অকার্যকর।

বাড়ির আশপাশে দীর্ঘদিন কোনো কিছু স্তূপ করে রাখা যাবে না।
সাপকে জানতে–বুঝতে ও সতর্ক থাকতে গুগল প্লে থেকে ডাউনলোড করে রাখতে পারেন ‘সর্প দংশনে সচেতনতা অ্যাপ’।
বাড়িতে সাপ বা সাপের ডিমের উপস্থিতিতে টের পেলে আতঙ্কিত না হয়ে অ্যাপে থাকা ফোন নম্বরের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন বন বিভাগের প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে। সারা দেশের যেকোনো প্রান্তে সেবা পাওয়া যায়।
সাপ নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না, তবে সচেতনতা জরুরি। আমরা নিরাপদ থাকি, নিরাপদ থাকুক প্রকৃতির সাপেরাও।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>