বিজ্ঞাপন
সাজেদা বেগম (৫০) সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। মেরুদণ্ডে সমস্যা। শুয়ে আছেন স্ট্রেচারে। এভাবেই রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সামনে তার তিনদিন কেটে গেছে। কিন্তু এখনো ভর্তি হতে পারেননি।
গত ২৮ আগস্ট সাজেদাকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে রেফার করা হলে ১ সেপ্টেম্বর তাকে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেই থেকে স্ট্রেচারে রোগী আর স্বজনরা পাশে মাটিতেই শুয়ে-বসে দিনরাত কাটিয়ে দিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আলাপকালে রোগীর মেয়ে মীম আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘তারা বলে সিট খালি নাই, সিরিয়ালে থাকেন। তাই অপেক্ষা করছি। শুধু আমরা না, এরকম আশপাশের সবাই অপেক্ষায় আছে।’
আরও পড়ুন
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মুখের বুলিতেই সীমাবদ্ধ
ভোগান্তিতে শত শত রোগী ও স্বজন
শুধু সাজেদা নয়, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত হাসপাতালে অবস্থান করে এমন শত শত রোগী ও স্বজনের ভোগান্তির চিত্র চোখে পড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব রোগী ও তাদের স্বজনরা হাসপাতালের সামনের সড়ক, বারান্দা, সিঁড়িসহ নানা জায়গায় অপেক্ষা করছিলেন। বেশির ভাগেরই সমস্যা- সিট বা শয্যা খালি না থাকায় ভর্তি হতে পারছেন না।
যদিও হাসপাতালটির শয্যা দ্বিগুণ করতে নতুন ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে ইনডোর বা অন্তর্বিভাগ এখনো চালু হয়নি। এজন্য নিয়োগ হয়নি প্রয়োজনীয় জনবল। সেটি হলে দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে ওয়ার্ড চালু করা সম্ভব হবে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
৫০০ শয্যার নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগী আসে। তাদের চাহিদা পূরণে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। অতিরিক্ত ৫০০ শয্যার নতুন হাসপাতাল ভবন উদ্বোধন করা হলেও এখনো চালু হয়নি।
সাতক্ষীরার বাসিন্দা আমীর আলী (৭২) স্ট্রোক করলে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে তাকে এখন নিয়ে আসা হয়েছে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে। তাকে নিয়ে আবাসিক চিকিৎসকের কক্ষের সামনে বসেছিলেন ছেলে আইয়ুব আলী। কথা হলে তিনি বলেন, ‘সিট খালি নাই। সিট খালি হলে ভর্তি নেবে বলে জানিয়েছে।’
এছাড়া বহির্বিভাগের রোগীরাও নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। মাথাব্যথার কারণে চাঁদপুর থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ফাতেমা বেগম (৪২)। গতকাল চিকিৎসক দেখানোর পর আজ পরীক্ষার রিপোর্টসহ আসতে বলা হয়। কিন্তু এসে শোনেন, আজ চিকিৎসক দেখবেন না। তিনি শুধু শনি, সোম ও বুধবার বসেন। রোগীর ভাই মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘এটা আমাদের আগে বললে হতো, কিন্তু না বলায় ভোগান্তির শিকার হলাম।’
গত ১৫ আগস্ট হাসপাতালের সম্প্রসারিত ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
চাহিদা পূরণে ১০০০ শয্যায় উন্নীত
হাসপাতালে সূত্রে জানা গেছে, ৫০০ শয্যার নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগী আসে। তাদের চাহিদা পূরণে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। অতিরিক্ত ৫০০ শয্যার নতুন হাসপাতাল ভবন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একবার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় আরেকবার উদ্বোধন করা হলেও এখনো চালু হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্বোধনের পর নতুন ভবনের বি-২ ফ্লোরে ইমেজিং বিভাগ চালু হয়। কিন্তু বাকি ভবন অব্যবহৃত থেকে যায়। গেল ১৫ আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর গ্রাউন্ড ফ্লোর ও প্রথম তলায় বহির্বিভাগের সেবা দেওয়া শুরু হয়। তবে এখনো অন্যান্য তলা ফাঁকা পড়ে আছে।
সাধারণ বেড এবং ওয়ার্ডগুলো চালু করতে আরও সময় লাগবে। এখনো ২০০ চিকিৎসক এবং ২০০ নার্স ও আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ দেওয়া বাকি। এগুলো হলে দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে সাধারণ ওয়ার্ডও চালু করা হবে।- হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুজ্জামান
অন্যদিকে, শয্যার অভাবে রাস্তায় বা হাসপাতালের সামনে দিন কাটাচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। অস্ত্রোপচারের সিরিয়ালের জন্যও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা বলছে
এ নিয়ে কথা হলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উদ্বোধনের পর আমরা আউটডোর চালু করেছি। শিগগিরই অপারেশন থিয়েটোর এবং পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড চালু করবো। তবে সাধারণ বেড এবং ওয়ার্ডগুলো চালু করতে আরও সময় লাগবে। এখনো ২০০ চিকিৎসক এবং ২০০ নার্স ও আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ দেওয়া বাকি। এগুলো হলে দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে সাধারণ ওয়ার্ডও চালু করা হবে।’
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ, নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি
মূল্য নির্ধারণ বাতিল / শিল্পে স্বস্তি এলেও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শঙ্কা
দেশে নিউরোলজি ও নিউরোসার্জারি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানটি এখন মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ২০১২ সালে ১০ তলা ভবনে প্রথমে ৩০০ শয্যার হাসপাতাল চালু করা হয়। পরে ব্যাপক হারে রোগী আসতে থাকায় সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আরও ২০০ শয্যা বাড়ানো হয়। এবার নবনির্মিত ১৫ তলা ভবনে আরও ৫০০ শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলো।
এসইউজে/একিউএফ
বিজ্ঞাপন