জাতীয়

নীরবতা নয়, কথোপকথনই বাঁচাতে পারে জীবন

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
আজ ১০ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। ২০২৪–২০২৬ মেয়াদের ত্রিবার্ষিক বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য হলো ‘Changing the Narrative on Suicide’—অর্থাৎ আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত বয়ান বদলানো। এই প্রতিপাদ্য নীরবতা ও কলঙ্কের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আত্মহত্যা নিয়ে খোলামেলা, সহমর্মী ও দায়িত্বশীল কথোপকথনের আহ্বান জানায়। আত্মহত্যা সম্পর্কে প্রচলিত নীরবতা, ভুল ধারণা ও কুসংস্কারের বয়ান বদলানোর ডাক এসেছে বিশ্বদরবার থেকে। মূল বার্তা হলো—আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলা, বিপন্ন ব্যক্তির কথা মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। এই বয়ান বদলানো আত্মহত্যা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসুন, আত্মহত্যা নিয়ে নীরবতা নয়, সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলি। আত্মহত্যা শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার মানুষ। ২০২১ সালে আত্মহত্যা ছিল বিশ্বে ১৫–২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। একই বছরে বৈশ্বিক আত্মহত্যার প্রায় ৭৩ শতাংশ ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। ফলে আত্মহত্যাকে শুধু ধনী দেশের সমস্যা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের চিত্র বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রকৃত সংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা কঠিন। সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক গোপনীয়তা, মৃত্যুর কারণ সঠিকভাবে নথিবদ্ধ না হওয়া এবং তথ্য সংগ্রহ ও নিবন্ধনের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারি পরিসংখ্যানে সব ঘটনা পুরোপুরি উঠে আসে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার তথ্যের প্রাপ্যতা ও মান এখনও দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনা কম রিপোর্ট বা অন্যভাবে শ্রেণিবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্যে দেশে বছরে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেন বলে একটি আনুমানিক হিসাব দেওয়া হয়েছে। তবে এই সংখ্যাকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর নির্ভুল জাতীয় পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো তরুণ-কিশোরদের আত্মহত্যার ঝুঁকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৩–১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪ শতাংশ ছেলে ও ৬ শতাংশ মেয়ে আত্মহত্যার কথা বিবেচনা করেছে। এই তথ্যটি ২০১৪ সালের Global School-Based Student Health Survey-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি; একই জরিপে দেখা যায়, ওই বয়সী শিক্ষার্থীদের ৮ শতাংশ আত্মহত্যার পরিকল্পনা করেছিল এবং ৭ শতাংশ গত ১২ মাসে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে—চুপ করে থাকবেন না। শুনুন, পাশে থাকুন, প্রয়োজন হলে পেশাদার সাহায্যের সঙ্গে যুক্ত করুন। জীবন বাঁচানোর জন্য কথোপকথনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, আত্মহত্যার চিন্তায় আক্রান্ত মানুষের মনে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও থাকতে পারে। সংকটের মুহূর্তে সহযোগিতা, নিরাপদ পরিবেশ এবং যথাযথ চিকিৎসা সেই আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করতে পারে। অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে এখন আর পারিবারিক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গৌণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেন মানুষ আত্মহত্যার কথা ভাবতে পারে? আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একক কোনো কারণ থাকে না। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যা, পূর্ববর্তী আত্মহত্যার চেষ্টা, আর্থিক সংকট, সম্পর্কের বিরোধ, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা অসুস্থতা, সহিংসতা, নির্যাতন, ক্ষতি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আত্মহত্যার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই তীব্র সংকটের মুহূর্তে মানুষ আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তও নিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে— বিষণ্নতা, উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যা; দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও অসহায়ত্বের অনুভূতি; প্রেম বা দাম্পত্য সম্পর্কের সংকট; পারিবারিক বিরোধ বা বিচ্ছিন্নতা; পরীক্ষায় ব্যর্থতা ও শিক্ষাজীবনের চাপ; চাকরি বা আর্থিক সংকট; সামাজিক অপমান; বুলিং ও সাইবার বুলিং; শারীরিক অসুস্থতা বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা; মাদকাসক্তি; আকস্মিক কোনো তীব্র মানসিক আঘাত। তবে মনে রাখা জরুরি—কোনো একটি ঘটনা একাই আত্মহত্যার কারণ নয়। একই সংকটে পড়ে একজন মানুষ ভেঙে পড়তে পারেন, আবার অন্যজন সহায়তা নিয়ে তা মোকাবিলা করতে পারেন। তাই আত্মহত্যাকে কোনো একক কারণ বা ব্যক্তির চরিত্রগত দুর্বলতার ফল হিসেবে দেখলে সমস্যাটিকে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। আত্মহত্যার ঝুঁকির সংকেত কী? কেউ যদি বারবার বলেন, ‘আমি আর বাঁচতে চাই না’, ‘আমাকে ছাড়া সবাই ভালো থাকবে’, ‘সবকিছু শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে’—তাহলে বিষয়টাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পেশাদার সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া হঠাৎ সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, গভীর হতাশা, বিদায় জানানোর মতো আচরণ, নিজের মূল্যহীনতার কথা বলা বা আচরণে আকস্মিক বড় পরিবর্তনও সতর্ক হওয়ার সংকেত হতে পারে। তবে শুধু কোনো একটি লক্ষণ দেখে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। সন্দেহ হলে সরাসরি, শান্তভাবে এবং বিচারহীনভাবে কথা বলা দরকার। কীভাবে কথা বলব? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিপন্ন ব্যক্তির কথা শুনতে হবে। তার কোনো কথা নিয়ে বিচার করা যাবে না, তাকে দোষারোপ করা যাবে না এবং ‘বিচারকের’ মতো আচরণ করা যাবে না। ‘এসব ভাবছ কেন?’ ‘তোমার তো সবই আছে।’ ‘এটা করলে পরিবার কী করবে?’ এ ধরনের প্রশ্ন বা মন্তব্য এড়িয়ে চলতে হবে। বরং বলা যেতে পারে, ‘তুমি খুব কষ্টের মধ্যে আছ বলে মনে হচ্ছে। আমি তোমার কথা শুনতে চাই। তুমি একা নও। আমরা একসঙ্গে সাহায্য খুঁজে নেব। তোমার মনের অবস্থাটা তোমার মতো করে বুঝতে চাই।’ এভাবে সহমর্মিতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। আত্মহত্যার চিন্তার কথা সরাসরি জিজ্ঞেস করলে সাধারণত সেই চিন্তা তৈরি হয় না; বরং বিপন্ন মানুষ নিজের কষ্ট প্রকাশ করার সুযোগ পান। তাই প্রয়োজন হলে সরাসরি জানতে হবে, ‘আপনার কি নিজেকে আঘাত করার বা জীবন শেষ করার চিন্তা হচ্ছে?’ যদি কেউ এমন চিন্তার কথা জানান, তাকে একা না রেখে দ্রুত বিশ্বস্ত ব্যক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। প্রতিরোধ সম্ভব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। সময়মতো সহায়তা, প্রমাণভিত্তিক হস্তক্ষেপ এবং সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে আত্মহত্যার ঝুঁকি কমানো যায়। বিশেষ করে প্রয়োজন— . মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা; . স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং এবং মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা বাড়ানো; . বুলিং ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ করা; . ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিকে একা না রাখা এবং দ্রুত পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা; . আত্মহত্যার উপায়গুলোর সহজলভ্যতা কমানো; . গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীলভাবে আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশন করা; . পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিজের কষ্টের কথা বলতে ভয় না পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আত্মহত্যা প্রতিরোধে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়—আত্মহত্যার উপায়গুলোর নাগাল সীমিত করা, আত্মহত্যার সংবাদ দায়িত্বশীলভাবে প্রচার করা, কিশোরদের সামাজিক ও আবেগীয় জীবনদক্ষতা বাড়ানো এবং আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত, মূল্যায়ন, চিকিৎসা ও পরবর্তী সহায়তার আওতায় আনা। এবারের থিমের মূল শিক্ষা ‘Changing the Narrative on Suicide’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আত্মহত্যাকে লজ্জা, অপরাধ বা চরিত্রের দুর্বলতা হিসেবে দেখলে বিপন্ন মানুষ আরও একা হয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, আত্মহত্যা নিয়ে সামাজিক কলঙ্ক ও নিষেধাজ্ঞা অনেক মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া থেকে দূরে রাখে। আমাদের বয়ান বদলাতে হবে। আত্মহত্যার কথা বলা মানুষকে ‘দুর্বল’ না বলে বলতে হবে—সে হয়তো অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং তার সাহায্য প্রয়োজন। সহানুভূতিশীল কথোপকথন হয়তো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করবে না, কিন্তু একজন মানুষকে সাহায্য গ্রহণের পথে প্রথম পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে। সুতরাং বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে—চুপ করে থাকবেন না। শুনুন, পাশে থাকুন, প্রয়োজন হলে পেশাদার সাহায্যের সঙ্গে যুক্ত করুন। জীবন বাঁচানোর জন্য কথোপকথনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, আত্মহত্যার চিন্তায় আক্রান্ত মানুষের মনে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও থাকতে পারে। সংকটের মুহূর্তে সহযোগিতা, নিরাপদ পরিবেশ এবং যথাযথ চিকিৎসা সেই আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করতে পারে। সময়মতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া তাই শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; আত্মহত্যা প্রতিরোধেরও গুরুত্বপূর্ণ উপায়। আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রথম কাজ আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রথম কাজ হলো মানুষকে তার কষ্টের কথা প্রকাশের জন্য নিরাপদ জায়গা তৈরি করে দেওয়া। বিচার নয়, সহমর্মিতা; নীরবতা নয়, কথোপকথন—এটাই এবারের থিমের মূল শিক্ষা। লেখক: মনোচিকিৎসা বিদ্যার অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক। সাবেক একাডেমি কোর্স ডিরেক্টর এবং পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। সম্পাদক, সাহিত্য-সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা ‘শব্দঘর’। এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>