বিজ্ঞাপন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ৪০ কোটি ডলারের বিশাল বলরুম নির্মাণ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রভাব এবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে তার অন্যান্য নির্মাণ প্রকল্পের আইনি চ্যালেঞ্জেও পড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ১৯৭০-এর দশকে পরিত্যক্ত ক্যালিফোর্নিয়ার একটি স্কি রিসোর্ট ও মিশরের নীল নদের কুমির নিয়ে করা একটি মামলার সূত্র ধরে ‘নান্দনিক স্বার্থে’ মামলা করার অধিকার নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
‘নান্দনিক স্বার্থ বা অ্যাসথেটিক স্ট্যান্ডিং’ ধারণা অনুযায়ী, কোনো প্রকল্পের কারণে কোনো ব্যক্তি কোনো দৃশ্য, স্থাপনা বা বিপন্ন প্রাণী দেখার বা উপভোগের সুযোগ হারালে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তিনি আদালতে যেতে পারেন। তবে মামলাকারীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে ওই প্রকল্পের কারণে তাদের প্রত্যক্ষ ও বাস্তব ক্ষতি হচ্ছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সিকোইয়া ন্যাশনাল পার্কের সংলগ্ন ‘মিনারেল কিং ভ্যালি’ (Mineral King Valley) নামের একটি নির্জন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকায় দ্য ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি ৩৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল স্কি রিসোর্ট বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
সেখানে হোটেল, সুইমিং পুল, পার্কিং ও বড় সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। তবে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সিয়েরা ক্লাব’ (Sierra Club) ১৯৬৯ সালে এই বাণিজ্যিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে ইউএস ফরেস্ট সার্ভিস ও সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে।
১৯৭২ সালে মামলাটি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে গেলে বিচারপতিরা ৪-৩ ভোটে রায় দেন যে, সিয়েরা ক্লাবের এই মামলা করার কোনো আইনি অধিকার (Standing) নেই। কারণ হিসেবে আদালত বলেন, প্রকল্পটির ফলে এলাকাটির সৌন্দর্য বা পরিবেশের ক্ষতি হলেও, সিয়েরা ক্লাব বা তাদের কোনো সদস্য প্রত্যক্ষ ও ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা মামলাকারীরা প্রমাণ করতে পারেননি।
আইনি প্রক্রিয়ায় হেরে গেলেও সিয়েরা ক্লাব পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলে। তীব্র আন্দোলনের কারণে ডিজনি কোম্পানি শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। পরে ১৯৭৮ সালে মার্কিন কংগ্রেস মিনারেল কিং ভ্যালিক জাতীয় উদ্যানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে চিরতরে সুরক্ষিত করে।
অন্যদিকে, ১৯৯২ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক মামলায় বিশ্ব পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করেছিলেন, মিশরে নীল নদের অববাহিকায় মার্কিন সরকারের সহায়তায় চলা উন্নয়ন প্রকল্পের ফলে নীল নদের বিলুপ্তপ্রায় কুমিরের আবাস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে আদালত রায় দেন, শুধু ‘পরিবেশগত বা নান্দনিক ক্ষতির আশঙ্কা’ তুলে ধরলেই মামলা করার অধিকার বা ‘স্ট্যান্ডিং’ তৈরি হয় না; বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের প্রত্যক্ষ ও বাস্তব ক্ষতি হচ্ছে।
ট্রাম্পের প্রকল্প কেন্দ্রিক বিতর্ক
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসিতে নতুন ইভেন্ট বলরুম, স্মৃতিস্তম্ভ বা অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করলে ঐতিহাসিক ও পরিবেশ সংরক্ষণবাদীরা এর নান্দনিক ও পরিবেশগত ক্ষতি দাবি করে আদালতে মামলা করেন। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের এসব নির্মাণকাজের পক্ষে রায় দিতে গিয়ে সেই ‘নীল নদের কুমির’ মামলার আইনি যুক্তিটি টেনে এনেছেন।
এদিকে, যদি কেউ সুদূর মিশরে ‘নীল নদের কুমির দেখতে না পাওয়া’-কে নিজের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে আইনি ভিত্তি দাবি করতে পারে, তবে ওয়াশিংটনের সাধারণ নাগরিকরা ঐতিহাসিক স্থাপনা বা প্রাকৃতিক দৃশ্য বদলে যাওয়ার বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার পাবে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান বিচারপতি ও বিচারকদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ও আদালতের তিন উদারপন্থি বিচারপতির আপত্তি উপেক্ষা করে পাঁচ রক্ষণশীল বিচারপতি গত সপ্তাহে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণকারী একটি সংগঠনকে ‘নান্দনিক’ কারণে বলরুম নির্মাণের বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ দেননি। এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ওয়াশিংটনের অন্য নির্মাণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো বন্ধে ওই রায়কে ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
ট্রাম্পের আইনজীবীরা বলছেন, প্রকল্পের সমালোচকরা এমন ‘বাস্তব ও নির্দিষ্ট ক্ষতি’ প্রমাণ করতে পারেননি। সুপ্রিম কোর্টও বলেছেন, শুধু কোনো বিষয়ে বিরক্তি, মতবিরোধ বা অপছন্দকে মামলা করার জন্য যথেষ্ট ক্ষতি হিসেবে ধরা যায় না।
জরুরি আবেদনের ভিত্তিতে দেওয়া সোমবারের রায়টির নজির হিসেবে আইনি মূল্য সীমিত। তবে পেপারডাইন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রবার্ট পুশাও মনে করেন, রায়টি পাঁচ রক্ষণশীল বিচারপতির ভবিষ্যৎ অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তার মতে, পরবর্তী কোনো মামলায় আদালত নান্দনিক ক্ষতির ধারণা বাতিল করতে পারে অথবা পরিবেশ আইন নিয়ে করা মামলায় এটি সীমিত করতে পারে। এতে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করা ব্যক্তিদের আদালতে দাঁড়ানোর অধিকার প্রমাণ করা কঠিন হবে।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন পটোম্যাক নদীর তীরে প্রস্তাবিত ২৫০ ফুটের তোরণ, ওয়াশিংটনের একটি সরকারি গলফ কোর্স সংস্কার ও লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের মামলাতেও এই রায় সামনে এনেছে। ঐতিহাসিক সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, চ্যালেঞ্জের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
প্রধান বিচারপতি রবার্টস তার ভিন্নমতপূর্ণ মতামতে এই দুই মামলার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন- কুমির দেখতে চাওয়াকে যদি মামলা করার মতো স্বার্থ ধরা যায়, তাহলে হোয়াইট হাউজ দেখতে চাওয়াকে কেন ধরা হবে না?
তবে বলরুম মামলার প্রধান আইনজীবী নিকোলাস সানসোন ও জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সারা ব্রোনিন মনে করেন, নতুন রায় চ্যালেঞ্জগুলো কঠিন করলেও অসম্ভব করে দেয়নি। তাদের মতে, মামলাকারীদের প্রকল্পগুলো কীভাবে তাদের ক্ষতি করছে বা করতে পারে, তা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
সূত্র: সিএনএন
এসএএইচ
বিজ্ঞাপন