ইসরায়েলের আগামী নির্বাচনের আর দুই মাসও বাকি নেই, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ মোটেও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে না। জনমত জরিপগুলো বলছে, তাঁর দল লিকুদ পার্টির জনপ্রিয়তা হয় থমকে আছে, না হয় ক্রমেই কমছে। বিপরীতে মূল বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে হু হু করে।
অতীতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমাতে যে ভয় দেখানোর কৌশল নেতানিয়াহু সফলভাবে ব্যবহার করতেন, তা এবার আর ভোটারদের মনে দাগ কাটতে পারছে না। পাশাপাশি নতুন কয়েকটি ডানপন্থী দলের আবির্ভাব নেতানিয়াহুর ভোটব্যাংকে ধস নামানোর এবং লিকুদ পার্টির ঐতিহ্যবাহী ভোট কেটে নেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে।
তাহলে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এই নিশ্চিত বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে নেতানিয়াহু এখন কী করতে পারেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্টরা সতর্ক করে বলেছেন যে নেতানিয়াহু সহিংসতায় উসকানি দিয়ে (কিংবা পেছনে থেকে তা পরিচালনা করে), বিরোধীদের বিরুদ্ধে পুলিশ বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে, ভোট পরিচালনাকারী কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করে এবং শেষ রক্ষা না হলে ট্রাম্পের কায়দায় ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলে পুরো নির্বাচনব্যবস্থাকেই ভন্ডুল করে দিতে পারেন। যদিও এখন পর্যন্ত এই হুমকিগুলোর কোনোটিই বাস্তবরূপ নেয়নি, কিন্তু ৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা জমা দেওয়ার মধ্য দিয়েই প্রচারণা পুরোদমে শুরু হতে যাচ্ছে।
তবে নেতানিয়াহু সম্ভবত ইতিমধ্যেই অন্য একটি কৌশল সাজাতে শুরু করেছেন—তা হলো কৃত্রিমভাবে এক বা একাধিক নিরাপত্তাসংকট তৈরি করা। উদ্দেশ্য স্পষ্ট: নিজের ধূলিসাৎ হওয়া ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তি উদ্ধার করা। আর যেসব মাঝারি ধারার ভোটার লিকুদ পার্টি ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের মনে এই দ্বিধা তৈরি করা যে নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের মতো অনভিজ্ঞ হাতে দেশের নিরাপত্তা তুলে দেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
এর জন্য নেতানিয়াহুকে পুরোপুরি বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে হবে না; বরং তিনি একটি ছোটখাটো সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটিয়ে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি সহজেই দাবি করতে পারবেন যে যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
গত ১৮ আগস্টের ঘটনার মধ্য দিয়ে হয়তো তারই একঝলক দেখা গেছে, যখন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলা চালায়। নেতানিয়াহু ও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, সিরিয়াতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে তুরস্ককে সতর্ক করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের প্রভাব বিস্তার নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সিরিয়া ও তুরস্কবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত টম বারাকসহ অনেক পর্যবেক্ষকই ইসরায়েলের এই নিরাপত্তার দাবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
তবে অন্য ফ্রন্টগুলোতে নেতানিয়াহুর অস্থিরতা তৈরির সুযোগ ট্রাম্পের কারণে কিছুটা সীমাবদ্ধ। ইসরায়েলি জনগণের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ যে ইরানকে আপাতত স্পর্শ না করার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অন্তত আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো যুদ্ধ দেখতে চান না। একই সঙ্গে গাজা ও লেবাননেও ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি আরোপ করায় নেতানিয়াহুর হাত অনেকটাই বাঁধা।
সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্ত সংঘাত বাড়ানোতেও বেশ ঝুঁকি রয়েছে। ওয়াশিংটন বর্তমানে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে সমর্থন দিচ্ছে দেশটিকে স্থিতিশীল করতে। এই প্রক্রিয়ায় তুরস্কের সামরিক সহযোগিতাকে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক হিসেবেই দেখে। যেখানে ওয়াশিংটন নিজেই সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে নিরাপত্তা আলোচনার মধ্যস্থতা করছে, সেখানে শারাকে নেতানিয়াহু দুর্বল করুক—তা ট্রাম্প প্রশাসন কিছুতেই চাইবে না।
তা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তুরস্ককে ক্রমাগত এক বড় হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করছেন; যেন তিনি জনগণকে এক সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করছেন। এর জবাবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন। ট্রাম্পের অস্থির মনোভাব এবং গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতি তাঁর ঐতিহাসিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে নেতানিয়াহু হয়তো প্রয়োজনীয় সবুজ সংকেত পেয়েও যেতে পারেন।
তবে আসল বিপজ্জনক ক্ষেত্রটি হলো পশ্চিম তীর। ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পরপরই শুরু হওয়া উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সম্প্রতি আরও বেপরোয়া ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এসব উগ্রপন্থী কেবল ফিলিস্তিনি ও তাদের ঘরবাড়িতেই হামলা চালাচ্ছে না; বরং বিদেশি সাংবাদিক, ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারী—এমনকি বাধা দিতে এলে ইসরায়েলি সেনাদের ওপরও চড়াও হচ্ছে।
কিন্তু নেতানিয়াহু ও তাঁর মন্ত্রিসভা এতে কানই দিচ্ছে না। অতি ডানপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতা হারানোর ভয়ে সহিংসতার সুযোগ নিয়ে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে বাস্তব পরিস্থিতি চিরতরে বদলে দিতে চাইছে। তাদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যপট হলো—এই চরম অত্যাচারের মুখে ফিলিস্তিনিরা যখন পাল্টাপ্রতিরোধ গড়ে তুলবে, তখন সেনাবাহিনী ও উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিলিস্তিনিদের গণহারে বিতাড়িত করার অজুহাত পেয়ে যাবে।

পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি যদি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে বা নতুন কোনো নিরাপত্তার সংকটের কারণে আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তবে সেই জরুরি অবস্থাকে অজুহাত বানিয়ে নেতানিয়াহু নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করতে পারেন। যদিও এটি ঘটার সম্ভাবনা কম। কারণ, ইসরায়েলের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এটি করতে হলে নেসেটে (সংসদ) দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হবে—যা নেতানিয়াহুর পক্ষে জোগাড় করা কঠিন। তবু তাঁর চরম সমালোচকেরা নেতানিয়াহুর এই চালকে একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না। ট্রাম্পের মতোই নেতানিয়াহু গণতান্ত্রিক নীতিমালা ভাঙতে সিদ্ধহস্ত এবং এ কাজে তিনি জোটসঙ্গীদের পূর্ণ সমর্থন পাবেন।
প্রায় তিন বছর ধরে চলা টানা যুদ্ধের পর ইসরায়েলি ভোটাররা কেন আবারও এমন একজনকে ভোট দেবেন, যিনি দেশকে আরও নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন—তা সাধারণ দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে জনমত বিষয়টাই বেশ জটিল। দীর্ঘ যুদ্ধে জনগণের মধ্যে একধরনের ক্লান্তি এসেছে ঠিকই, তবে তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এই অনুভূতি যে এত যুদ্ধের পরও ইসরায়েল সুরক্ষিত নয়। ইসরায়েলিদের এক বড় অংশ মনে করে, যুদ্ধগুলো এখনো অধরা বা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
তবে যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢাললেই যে নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন, তা কিন্তু নিশ্চিত নয়। জরিপগুলো বলছে, বেশির ভাগ ইসরায়েলি বিশ্বাস করেন, নেতানিয়াহু সামরিক সিদ্ধান্তগুলো অন্তত আংশিকভাবে হলেও তাঁর নির্বাচনী স্বার্থ হিসাব করে নেন। এমনকি ক্ষমতাসীন জোটের ভোটারদের কাছেও সেনাবাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার তুলনায় নেতানিয়াহু ও তাঁর মন্ত্রিসভার গ্রহণযোগ্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক কম।
তা সত্ত্বেও, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নেতানিয়াহু বারবার এমন সব কুটিল কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন, যা অন্য কোনো রাজনীতিবিদ ভাবতেও দ্বিধা করতেন। আর এবারের নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়। ক্ষমতা বাঁচাতে নেতানিয়াহু হয়তো শেষ চাল হিসেবে এবার সব বাজি একাই ধরে বসবেন।
ডেভিড ই. রোজেনবার্গ হারেৎজের ইংরেজি সংস্করণের অর্থনীতিবিষয়ক সম্পাদক ও কলামিস্ট। ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>