জাতীয়

নোয়াখালীর সেই ছেলেটি যেভাবে এটিএম শামসুজ্জামান হয়ে ‍ওঠলেন

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাদের অভিনীত চরিত্র পর্দা পেরিয়ে মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে যায়। এটিএম শামসুজ্জামান ছিলেন তেমনই একজন। খলনায়ক, কৌতুক অভিনেতা কিংবা গম্ভীর চরিত্র; যে ভূমিকাতেই হাজির হয়েছেন নিজের অভিনয় দিয়ে সেটিকে করে তুলেছেন স্মরণীয়। আজ এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে জন্মগ্রহণ করেন আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। তিনিই সবার কাছে এটিএম শামসুজ্জামান নামে পরিচিত। ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। তবে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের শিল্পীজীবনে রেখে গেছেন অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র। অদ্ভুত বিষয় হলো, তার চলচ্চিত্রযাত্রার শুরু কিন্তু অভিনয় দিয়ে নয়। ক্যামেরার সামনে আসার আগে তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রের নেপথ্যের একজন কর্মী। ক্যামেরার পেছন থেকে শুরুজন্মেছিলেন মৌলভীবাড়িতে। রক্ষণশীল পরিবার। সেই রক্ষণশীলতার দেয়াল ডিঙিয়ে তিনি হয়ে ওঠেছিলেন অভিনয়ের কিংবদন্তি। শুরুতে অভিনয়ের নেশা ছিলো না। ২০ বছর বয়সে ১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন এটিএম শামসুজ্জামান। এরপর চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখাতেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ‘জলছবি’ সিনেমার কাহিনি ও চিত্রনাট্য লেখার মাধ্যমে তিনি নতুন করে পরিচিতি পান। পরবর্তী সময়ে শতাধিক চলচ্চিত্রের কাহিনি ও চিত্রনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই গুণী শিল্পী। তবে শেষ পর্যন্ত অভিনয়ই তাকে দর্শকের হৃদয়ে সবচেয়ে বড় জায়গা করে দেয়। ‘এতটুকু আশা’ থেকে অভিনয়ের পথচলাষাটের দশকের মাঝামাঝি অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন এটিএম শামসুজ্জামান। ১৯৬৮ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘এতটুকু আশা’ সিনেমায় প্রথমবার তাকে পর্দায় দেখা যায়। শুরুতে কৌতুক চরিত্রে অভিনয় করলেও খুব দ্রুতই তিনি বুঝিয়ে দেন, একটি নির্দিষ্ট চরিত্রে তাকে আটকে রাখা যাবে না। সময়ের সঙ্গে নিজেকে ভেঙেছেন, নতুন করে তৈরি করেছেন এবং নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। ‘নয়নমণি’ বদলে দিল পরিচয়এটিএম শামসুজ্জামানের ক্যারিয়ারে বড় বাঁক আসে ১৯৭৬ সালে। আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি। এই সিনেমার পরই খলনায়ক হিসেবে তার আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়। ‘লাঠিয়াল’, ‘অশিক্ষিত’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ও ‘স্বপ্নের নায়ক’-এর মতো সিনেমায় খলচরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।কিন্তু এটিএম শামসুজ্জামান শুধু খলনায়ক ছিলেন না। তার অভিনয়ের পরিধি ছিল আরও অনেক বড়। ভয় দেখিয়েছেন, আবার হাসিয়েছেনওএকই অভিনেতা কখনো দর্শকের মনে ভয় ধরিয়েছেন, আবার কখনো তার অভিনয়েই হেসে উঠেছে পুরো হল। চরিত্র বদলে ফেলার এই অসাধারণ ক্ষমতাই ছিল এটিএম শামসুজ্জামানের অন্যতম বড় শক্তি। ‘রামের সুমতি’, ‘যাদুর বাঁশি’, ‘ম্যাডাম ফুলি’ ও ‘চুড়িওয়ালা’র মতো সিনেমায় তার কৌতুক অভিনয় দর্শকদের দারুণ আনন্দ দিয়েছে। কমেডি চরিত্রেও যে তিনি কতটা শক্তিশালী, তার প্রমাণ মিলেছে এসব সিনেমায়। যে সিনেমাগুলোতে রয়ে গেছে তার ছাপদীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘ওরা ১১ জন’, ‘সংগ্রাম’, ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ও ‘গেরিলা’র মতো অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। বিশেষ করে সাহিত্যনির্ভর ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ ও ‘হাজার বছর ধরে’ সিনেমাগুলোতে তার অভিনয় দেখিয়ে দেয়, কমেডি কিংবা খলচরিত্রের বাইরেও কতটা শক্তিশালী অভিনেতা ছিলেন তিনি। পুরস্কার ও স্বীকৃতিঅভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন এটিএম শামসুজ্জামান। ‘দায়ী কে?’, ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘চুড়িওয়ালা’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’ ও ‘চোরাবালি’র জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ২০১৫ সালে তাকে দেওয়া হয় একুশে পদক। দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন আজীবন সম্মাননাও। অভিনয়ের পাশাপাশি গল্প ও চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি পরিচালনাতেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ‘এবাদত’ সিনেমা পরিচালনা করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। পর্দায় বেঁচে থাকবেন কিংবদন্তি২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন এটিএম শামসুজ্জামান। শারীরিকভাবে তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার অভিনীত অসংখ্য চরিত্র আজও দর্শকের মনে জীবন্ত। ক্যামেরার পেছনে সহকারী পরিচালক হিসেবে যার পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই মানুষটিই একসময় হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেতা। তার চলে যাওয়া তাই শুধু একজন শিল্পীর বিদায় নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়েরও সমাপ্তি।   এলআইএ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>