আদালতের কাঠগড়ায় ডাক্তার প্যাটেল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশাগত দায়িত্ব পালনে গাফিলতি। উৎকণ্ঠিত চেহারা নিয়ে প্যাটেলের কয়েকজন রোগীও উপস্থিত আছে আদালতে। এই মামলায় উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ডা. বিবেক প্যাটেলের বড় বোন ভিদিয়া প্যাটেল আইনজীবী হিসেবে ওর পক্ষে লড়বে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ভাই, তার পক্ষে আইনের সাফাই গাইতে এসেছে আইনজীবী বোন। আদালতও একটা যুদ্ধক্ষেত্র। থাকে পরস্পরবিরোধী দুই পক্ষ। রণাঙ্গনে কামান–গোলার শঙ্খনিনাদে শক্তির প্রদর্শন হয়।। আদালতে আইনের শঙ্খ বাজিয়ে হয় যুক্তিতর্কের উৎসারণ। আদালতে জুরিরাও গভীর আগ্রহ নিয়ে মামলার বয়ান শুনতে প্রস্তুত।
ডা. প্যাটেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ অদ্ভুত। সে যে দুই সার্জারিতে কাজ করে তার দুজন প্র্যাকটিস ম্যানেজার অভিযোগ এনেছে। সময়ে–সময়ে রোগীদের উল্টাপাল্টা ওষুধ লিখে দিয়েছে সে। লিখে দিত বেশি বেশি ওষুধ। যার অ্যাজমা বা হাঁপানি নেই, তাকে দিয়েছে অ্যাজমার ওষুধ, যাকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দিয়েছে অথচ তার ওই অসুখ ছিলই না কোনোদিন।
আদালতকক্ষ ঝকমক পরিষ্কার, ভাবগম্ভীর নৈঃশব্দ্য এখানে বিরাজমান। বিচারকের এজলাস মেঝে থেকে ফুট দেড়েক উঁচু মঞ্চে। লাল ভেলভেটে পায়া পর্যন্ত আচ্ছাদিত লম্বা টেবিল। মাঝামাঝি সিংহাসন আকৃতির চেয়ার। টেবিলের দুই মাথায় দুটি চেয়ার, আদালতের কর্মীদের জন্য। একপাশে কাঠের রেলিং দিয়ে আরামদায়ক গদিআঁটা কিছু চেয়ার জুরিদের জন্য। মঞ্চের পেছনটা পাতলা প্লাইউডের পর্দার আড়ালে। পর্দার আড়াল থেকে বিচারক যখন আসন গ্রহণের জন্য বেরিয়ে আসেন তখন কক্ষে উপস্থিত সবাইকে উঠে দাঁড়াতে হয়। বিচারকের বাঁ দিকে কাঠগড়া ও সামনের মেঝেতে এক পাশে আইনজীবীদের জন্য ডেস্কসহ চেয়ার ও যাতায়াতের পথ রেখে অন্য পাশে দর্শকদের জন্য চেয়ার পাতা। একদম পেছনে বিবদমান দুই পক্ষের বসার ব্যবস্থা।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
আদালত বসল অর্থাৎ বিচারক আসন নিয়ে কাজ শুরু করলেন। প্রথমেই জুরি নির্বাচন। বিচারকের সহকারীরা নাম বলার পর সেই নামের ব্যক্তি বিবদমান দুই পক্ষের সামনে দিয়ে হেঁটে ঘোরাপথে দর্শকসারিতে নিজের আসনে এসে বসে। হাঁটার সময়ে দুই পক্ষই তীক্ষ্ণভাবে লোকটিকে দেখে। তারপর আচমকা খরখরে গলায় কোনো একপক্ষ হেঁকে ওঠে ‘চ্যালেঞ্জ’। আদালতের গুরুগম্ভীর পরিবেশে ‘চ্যালেঞ্জ’ ধ্বনি শুনেই চলন্ত ব্যক্তি থমকে দাঁড়িয়ে যায়। ভয়ও পায়। নিজ আসনে ফিরে হাঁপ ছেড়ে যেন বাঁচে। ‘চ্যালেঞ্জ’–এর মানে হচ্ছে জুরি হিসেবে তাকে কোনো এক পক্ষ চাইছে না। যাই হোক ভিদিয়া দেখল কুর্তা পায়জামা পরা ওড়নায় মাথা ঢাকা মাঝারি গড়ন উজ্জ্বল ত্বকের পরিণত বয়সের এক মহিলা ‘চ্যালেঞ্জ’–এর মুখে পড়ে বাদ পড়ল। বাদামি চামড়া, খয়েরি চোখ ও কালো গোফওয়ালা একজনও বাদ। শেষে বারোজন জুরি নির্বাচিত হলো। বিচারকের বাঁ দিকে রেলিংঘেরা জায়গায় জুরিরা বসার পরই আসল কাজ শুরু হলো।
প্রথমেই বাদীপক্ষের উকিল অভিযোগ পেশ করল। ভিদিয়া অভিযোগ শুনতে শুনতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো তার ভাইয়ের দিকে তাকাল, চোখে তার অশেষ স্নেহ ঝরে পড়ল। ভাসা–ভাসা চোখে ভীতবিহ্বল বিষণ্নতা নিয়ে মাঝারি উচ্চতার নম্রভদ্র, দেখতে ভালো ডা. প্যাটেল দাঁড়িয়ে। বোনের মনে সূক্ষ্ম এক অপরাধবোধ জাগল। ভাবল ডা. প্যাটেল আজকে যে আদালতের কাঠগড়ায় দাড়ানো তার পেছনে বোন হিসেবে তারও কি কোনো ভূমিকা ছিল না? ছিল, অবশ্যই ছিল। সে নিজে ডাক্তারি পড়তে চায়নি। মা-বাবার ইচ্ছার কাছে সে হার মানেনি। সমাজে সবার ওপরে থাকার জন্য মা-বাবা দুই সন্তানকেই ডাক্তার বানানোর নানা চেষ্টা করেছে। মেধাবী দুজনই। সুতরাং ডাক্তারি পড়তে অসুবিধা কোথায়? ভিদিয়ার মতে মেধাবী হলেই যে ডাক্তার হওয়া চাই বা হওয়া যাবে, তা কেন? একজনকে ডাক্তার হতে হলে তার মেধাবী মাথাই যথেষ্ট নয়। সেবা করার জন্য দয়ালু অন্তর ও পুঁজ-রক্ত-বমি দেখেও সহ্য করার মানসিক শক্তি থাকা চাই। রোগী আসবে গায়ে ঘাম জ্বর ও অসুখের গন্ধ নিয়ে। ডাক্তারকে সব মেনে নিয়েই প্রেসার ও জ্বর মাপার জন্য রোগীকে স্পর্শ করতে হবে। সে স্পর্শ শুধু কর্তব্যই নয়, তাতে থাকা চাই ডাক্তারের আন্তরিক সেবার আশ্বাস। ভিদিয়া পরিষ্কার বলেছিল ‘আমি জর, বমি, ঘা, পাতলা পায়খানা কোনোকিছু দেখতে বা ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাই না, তাই ডাক্তার হওয়ার শখ আমার নাই, ইচ্ছাও নাই’
মা–বাবা বলল ‘পরে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ হবে, তাহলে তো ওইসব ঘাঁটতে হবে না।
ভিদিয়া দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলেছিল ‘আমি পাগলের ডাক্তার প্যাটেল হতে চাই না’। তারপর হেসে দিয়ে ভিদিয়া বলেছিল ‘বাংলাদেশি বন্ধুরা আমাকে বলবে পাগলের ডাক্তার পটল।’
সেই ভিদিয়া তার ছোট ভাইকে মা–বাবার শখ পূরণের জন্য নাকি তাদের ইচ্ছার কাছে বলি হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত ও প্ররোচিত করেনি? করেছিল। ভাই তার নরম মনের হৃদয়বান মানুষ। ভাই ডাক্তার হতে চায়নি। ভিদিয়া বুঝিয়েছিল অনেক করে—
‘দেখ ভাইয়া তুমিও যদি মা–বাবার শখ পূরণ না কর তারা মারাই যাবে!’
‘তারা হয়তো আমাকেই মেরে ফেলতে পারে তাই না?’
‘ছি, এ রকম কেন ভাবছ?’
‘খবরে পড়োনি আমাদের দেশে কলকাতা শহরে এক ছেলে টেনিস প্র্যাকটিস ভালো করে করছিল না বলে বাবা এমন মার দিয়েছে যে ছেলেটি মারাই গেছে; ছেলে টেনিস তারকা না হওয়ার শাস্তি হলো মৃত্যু!’
‘স্যাড স্টোরি কেন বলছ।’ শেষে সে ডাক্তার হয়েছিল ঠিকই, তার পেছনে কারণ ছিল একটি। মায়ের কাছে শুনেছিল কোনো কোনো ডাক্তার নাকি রোগী বুঝে স্টেথিস্কোপ দিয়ে তাদের পরীক্ষা করার সময় নাকমুখ কুঁচকে রাখে অবজ্ঞায়। মা বলেছিল শুধু পয়সার জন্য যারা ডাক্তার হয় তারা পিশাচ। তবে তার শখ হয়েছিল পৃথিবীর যে জায়গায় ডাক্তার নেই এমন জায়গায় চিকিৎসার হাত বাড়িয়ে দিতে। মা-বাবা তাতেও বাধা দিলেন। গরিবদের চিকিৎসা করলে পয়সা বেশি পাওয়া যায় না। তার চেয়ে এ দেশে দশ মিনিটে যেনতেনভাবে রোগী দেখে সামান্য কফসিরাপ বা প্যানাডল খাও বলেই চল্লিশ ডলার বা পঁয়তাল্লিশ ডলার রুজি করা যায়। গরিবের সেবা বোকারাই করে, এই বাবার অভিমত।
ভিদিয়া নিজের মাঝে ফিরল সাক্ষীদের নাম ডাকাতে। অভিযোগ করলেই হয় না, সাক্ষ্যসাবুদ দিয়ে তা প্রমাণ করতে হয়।
ডাক্তার, উকিলের কাছে কোনো কিছু লুকাতে নেই। ভাই ভিদিয়াকে বলেছে সে ভুল চিকিৎসা করেনি, তবে এই রেজিমেন্টেড সমাজের কিছু রুলস সে মানেনি। নিয়ম হলো গিয়ে যে এ দেশে বেড়াতে এসেছে, যার হেলথ ইনস্যুরেন্স নেই, হাতেও যার নগদ পয়সা নেই, তো সে চিকিৎসাও পাবে না। পাকিস্তানি ফয়েজ আলীর ভাই বেড়াতে এসে সামান্য অসুস্থ হয়েছিল। ডাক্তার দেখানোর পয়সা নেই। ফয়েজ আলী ভাইকে নিজ নামে চালিয়ে দিয়ে ওষুধ লিখিয়ে নিয়ে গেছে। পাঞ্জাবের হরবিন্দ সিংও এমনি ফাঁকিবাজি করে আত্মীয়ের জন্য ওষুধ নিয়েছে। বাংলাদেশের হেলালুজ্জামানও তাই করেছে। পরে অবশ্য এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো ডা. প্যাটেলের কাছে গোপনে মাপ চেয়ে গেছে। নিজের জানা তিনটা ঘটনাই ডা. প্যাটেল তার আইনজীবী বোন ভিদিয়াকে বলেছে।
‘যারা এ দেশে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যোগ্য নয়, তাদের অসুখ কী, তা দেখা ও ওষুধ দেওয়া অবশ্যই অন্যায়, এটা কেন করতে গেছ?’
সরল অথচ কৌতুকের হাসি হেসে ডা. প্যাটেল বলেছিল—
‘আরে টাকা নাই বলে তুমি কাউকে আইনের সেবা না দিতে পার, চিকিৎসাও দিবে না এটা তো হতে পারে না, ক্যানসার, তা হলে তো শুধুই ধনীদের হওয়া উচিত, তাই না?’
‘কথাটা বুঝতে চেষ্টা কর, যারা এ দেশের নাগরিক নয়, ট্যাক্স দেয় না, তারা কেন বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাবে?’
‘দেখ অসুস্থকে এত রুলস মেনে দেখতে গেলে ডাক্তারকে সেবার ব্রত ও মানবিকতা বিসর্জন দিতে হবে, এটা কি উচিত?’
ভাইয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপরও ভিদিয়া বলেছিল—
‘এভাবে বাছবিচার না করে অসুস্থ দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়লে বিপদে পড়বে।’
গভীরভাবে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল ডা. প্যাটেল, তারপর বিষণ্ন স্বরে বলল—
‘শুন, কোনো এক ফটোসাংবাদিক আগুনে এক লোক পুড়ছে দেখে ক্যামেরা ছুড়ে ফেলে তাকে বাঁচাতে চেষ্টা করছিলেন, ওইখানে পৌঁছে আরেক সাংবাদিক ছবিটা তুলে খুব মূল্যবান খবর প্রকাশ করলেন, ওই ছবির জন্য পুরস্কারও পেলেন, জ্বলন্ত লোকটিকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন যে সাংবাদিক তাকে সাসপেন্ড করা হয় কর্তব্যে অবহেলার জন্য, তুমি বল মনুষ্য আগে না কর্তব্য আগে?’
ভিদিয়া লা-জওয়াব রইল। তখন ডা. বিবেক প্যাটেল দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল—
‘শুন, অসুখ শুনলেই রোগীর দরদে আমি সীমা ছাড়াই না; মনে আছে মায়ের বান্ধবী মিসেস নন্দী তার বেড়াতে আসা বোনকে হাসপাতালে তাঁর পরিচয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য আমার কাছে এসেছিলেন।’
‘তুমি তো করনি, খুব সুন্দর একটা যুক্তিও দেখিয়েছিলে।’
‘যুক্তি তো একটা দেখিয়েছিলাম, তবে ওই মহিলার ব্যাপারে আমার কোনো অপরাধবোধ ছিল না, কারণ তারা যথেষ্ট ধনী, চিকিৎসা করানোর মতো টাকাও আছে, তারা কেন অন্যায়ভাবে বিনা পয়সায় চিকিৎসা নেবে।’
‘কে জানে মিসেস নন্দী অন্য কোনো ডাক্তারকে পটিয়ে এই সুযোগটা আদায় করেছিলেন কি না!’
বিবেক বিস্ময় নিয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। ভিদিয়া জানে এরপর নামীদামি প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষিকা মিসেস নন্দী আর কোনোদিন তাদের বাড়ি আর আসেননি।
আদালতকক্ষে সাক্ষীদের ডাক পড়তেই ভিদিয়ার চেতন ফিরল। সাক্ষীদের এমনভাবে ‘ক্রস এগজামিনেশন’ করবে বলে ভিদিয়া যে জটিল প্রশ্ন তৈরি করেছিল তার কোনো কিছুই কাজে লাগল না। তার আগেই সহজ–সরল খেটে খাওয়া মানুষগুলো বাদীর মামলাই ভন্ডুল করে দিল। হেলালুজ্জামানকে হাজিরই করতে পারেনি ওরা। বাকি দুজন এমন এলোমেলোভাবে কথা বলল যে মনেই হলো ডাক্তার প্যাটেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ভুয়া। শেষ পর্যন্ত আদালত মামলাই ডিসমিস করে দিলেন।
ডা. বিবেক ও তার বোন আইনজীবী ভিদিয়া আদালত থেকে বেরিয়ে যখন হাসতে হাসতে রাস্তা পার হচ্ছে তখন দেখে হরবিন্দ সিংহ আর ফয়েজ আলীকে। ভিদিয়া বিবেককে দেখে তারা সম্ভ্রমের সঙ্গে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল। দুই ভাই–বোনই সরাসরি ওদের চোখে চোখ রাখল। ডাক্তারের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে আসা লোক দুজনের চোখে তখন শ্রদ্ধামেশানো লাজুক হাসি।
*এটি একটি গল্প। চরিত্র সব কাল্পনিক।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>