ব্রেকিং নিউজ
জাতীয়

পাচারের থাবায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে বিচিত্র প্রাণী লেমুর

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
​সাব্বির হোসাইন ​গাছের ডালপালা টপকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে লাফিয়ে চলা বিচিত্র প্রাণী—লেমুর। মাদাগাস্কারের পাইন ও বাঁশবনের বুক চিরে ভেসে আসা এদের কোলাহল দিনদিন নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকা বা রেড লিস্টে পৃথিবীর অন্যতম বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে স্থান পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে এদের বিপন্নতার সংকট যখন তুঙ্গে; ঠিক তখনই বাংলাদেশের সরকারি সাফারি পার্ক থেকে লেমুর চুরির পর ভারতে পাচারের চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত করেছে গভীর উদ্বেগের চিত্র। ​আইইউসিএন রেড লিস্টের অশনিসংকেত ​আইইউসিএনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান ১১২টি লেমুর প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশই বিলুপ্তির চরম হুমকিতে। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩১%) প্রজাতিকে সরাসরি ‘অতি বিপন্ন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ​আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি ‘সাইটিস’র পরিশিষ্ট-১ ভুক্ত হওয়ায় বিশেষ অনুমতি ছাড়া বিশ্ববাজারে রিং-টেইলড লেমুরসহ এই প্রাণীদের কেনাবেচা সম্পূর্ণ বেআইনি। তা সত্ত্বেও বন উজাড়, ঝুম চাষ, চোরাশিকার এবং বিত্তবানদের কাছে ‌বিলাসবহুল খাবার কিংবা পোষা প্রাণী হিসেবে বেআইনি চাহিদার কারণে অরণ্যের এই সন্তানদের প্রজননক্ষম সংখ্যা দিনদিন তলানিতে ঠেকছে। আরও পড়ুন সামুদ্রিক কচ্ছপের বংশরক্ষায় করণীয় পৃথিবীর একমাত্র বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে মাদাগাস্কার দ্বীপে লেমুর প্রাকৃতিকভাবে বসবাস করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভূমিকা অপরিহার্য। এরা বনের বিভিন্ন ফল ও বীজ খেয়ে তা অরণ্যে ছড়িয়ে দেয় এবং দূর-দূরান্তের উদ্ভিদের পরাগায়ন ঘটায়। পরিবেশবিদরা তাই লেমুরদের বলেন ‘অরণ্যের স্থপতি’। নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ এই প্রাণী পৃথিবীর আর কোথাও প্রাকৃতিকভাবে বাঁচে না। ফলে এখান থেকে লেমুর নিশ্চিহ্ন হওয়া মানে পুরো বিশ্ব থেকে প্রজাতিটির চিরতরে হারিয়ে যাওয়া। ​কড়া নিরাপত্তা ডিঙিয়ে সাফারি পার্কের লেমুর গুজরাটের ‘বনতারা’য় ​আন্তর্জাতিক স্তরে লেমুর যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত; তখন বাংলাদেশে সামনে এসেছে ভয়াবহ পাচারকাহিনি। গাজীপুরের সাফারি পার্কের নিরাপত্তা বলয় ভেঙে চুরি যাওয়া দুটি অতি-বিপন্ন রিংটেইল লেমুরের সন্ধান মিলল ভারতের গুজরাটে—ধনাঢ্য আম্বানি পরিবারের বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র ‘বনতারা’য়। আরও পড়ুন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঠবিড়ালি বাংলাদেশে, তবুও কেন হারিয়ে যাচ্ছে? যেভাবে সীমান্ত পার হলো অতি-বিপন্ন প্রাণী ​তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ গভীর রাতে সাফারি পার্কের চুক্তভিত্তিক এক রক্ষীর সহায়তায় খাঁচা ভেঙে একটি মা লেমুর ও তার দুই ছানা চুরি করে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের দেশীয় এজেন্টরা। চুরির পর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয় ভারতের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে। ​কলকাতা ও মুম্বাইয়ের পাচারকারীদের সাথে দরদাম পাকা হওয়ার পর দর্শনা সীমান্ত দিয়ে মা লেমুর ও একটি ছানাকে ভারতে পাচার করে দেওয়া হয়। প্রায় ৪৮ লাখ ভারতীয় রুপিতে (প্রায় ৬৮ লাখ টাকা) কয়েক দফা হাতবদল হয়ে লেমুর দুটি ঠাঁই পায় গুজরাটের জামনগরে আম্বানিদের ‌‘বনতারা’ আশ্রয়ে। চুরি যাওয়া অন্য ছানাটির হদিস এখনো মেলেনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা ছবি থেকেই পাচারের রহস্য উন্মোচিত হয়। ​২০১৮ সালে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে জব্দ করার পর লেমুর জোড়াটিকে স্থায়ী আবাস হিসেবে সাফারি পার্কে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ছানার জন্ম হলেও টানা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় সরকারি হেফাজতে থাকা এই প্রাণীর শরীরে বসানো হয়নি কোনো শনাক্তকারী ইলেকট্রনিক মাইক্রোচিপ বা ডিএনএ ট্র্যাকিং ডেটাবেজ। ​আন্তর্জাতিক আইনে পাচারকৃত প্রাণীর স্বত্ব প্রমাণের মূল শর্তই হলো মাইক্রোচিপ বা জেনেটিক কোড। পার্ক কর্তৃপক্ষের এই উদাসীনতার কারণে ইন্টারপোলের সহায়তায় পাচার হওয়া প্রাণী দুটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে নিজেদের বলে দাবি করার আইনি পথ এখন অত্যন্ত জটিল রূপ নিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে থাকা অন্য ছানাটির ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পাচার হওয়া লেমুর দুটির সাথে বংশগত সূত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। আরও পড়ুন ৩ কারণে বিপন্ন হচ্ছে প্রকৃতির পরম বন্ধু ‘গন্ধগোকুল’ ​অরণ্যপতিদের বাঁচাতে এখন যা জরুরি ​বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মো. রেজা খানের মতে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কেবল প্রচলিত আইন যথেষ্ট নয়। এর জন্য সরকারি বা বেসরকারি আশ্রয়ে থাকা প্রতিটি বিপন্ন প্রাণীর শরীরে মাইক্রোচিপ স্থাপন ও ডিএনএ প্রোফাইলিং বাধ্যতামূলক করা জরুরি। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পাচার রুখতে দর্শনার মতো স্পর্শকাতর সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে ডিজিটাল নজরদারি ও সিসিটিভি জোরদার করা আবশ্যক। এমনকি বন বিভাগ, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। মাদাগাস্কারের অরণ্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সংরক্ষিত সাফারি পার্ক—কোথাওই যদি লেমুরদের জন্য নিরাপদ আবাস্থল নিশ্চিত করা না যায়, তবে পৃথিবীর অমূল্য এই ‘অরণ্যের স্থপতি’রা একদিন কেবল রূপকথার বই আর আলোকচিত্রেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। লেখক: শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী। এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>