বিজ্ঞাপন
মো. শহীদ, বয়স ৭০ বছর। এ বয়স যেখানে মানুষকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের দিকে টেনে নেয়, সেখানে মো. শহীদের দিন শুরু হয় পুরোনো গাড়ির খোঁজখবর দিয়ে। কোনো গাড়ি বিক্রি হবে, কোথাও নতুন কোনো গাড়ির সন্ধান মিলেছে কি না, ক্রেতার চাহিদা কী-এসব নিয়েই তার ব্যস্ততা। ব্যবসা আগের মতো নেই, লাভও কমেছে অনেক। তবু গাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কটা যেন শুধু ব্যবসার নয় বরং জীবনের দীর্ঘ এক অধ্যায়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক ভালোবাসা।
শহীদের জন্ম জেলা চাঁদপুরে হলেও বহু বছর ধরে ঢাকার ধানমন্ডিতে বসবাস করছেন। বর্তমানে পুরোনো গাড়ির ব্যবসাই তার প্রধান কাজ। একসময় ঢাকার রাস্তায় ভাড়ায় গাড়ি চালিয়েছেন। স্বাধীনতার কয়েক বছর পরের সেই সময় থেকেই গাড়ির সঙ্গে তার পথচলা। তখন গাড়ি চালানো ছিল জীবিকার পথ, পরে সেই গাড়িই হয়ে ওঠে ব্যবসার পুঁজি এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের দীর্ঘ সঙ্গী।
গাড়ি চালানোর সময় থেকেই শহীদের মনে পুরোনো গাড়ি কেনাবেচার ভাবনা আসে। সেই ভাবনা থেকেই পুরোনো গাড়ি কিনে মেরামত করে বিক্রি শুরু করেন। তখনকার ঢাকা আজকের মতো ছিল না। গাড়ি কেনাবেচার জন্য এত শোরুম, এত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। ক্রেতা খুঁজতে হলে মানুষের কাছে যেতে হতো, পরিচিতদের জানাতে হতো। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেওয়াই ছিল অন্যতম ভরসা।
শহীদও সেই পথেই হাঁটতেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতেন। কখনো মাসে একটি গাড়ি বিক্রি হতো, কখনো আবার কয়েক মাসে একটি-দুটি। সংখ্যাটা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তখনকার ব্যবসার একটি আলাদা হিসাব ছিল-গাড়ি কম বিক্রি হলেও প্রতি গাড়িতে লাভ হতো মোটা অঙ্কের। যা তাকে আবার নতুন গাড়ি কিনতে উৎসাহ দিত। একটি গাড়ি বিক্রি, সেই টাকা দিয়ে আরেকটি গাড়ি কেনা, মেরামত করা, আবার বিক্রির চেষ্টা-এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে তার ব্যবসা।
আরও পড়ুন
শখ থেকে ব্যবসা, পুরোনো মোটরসাইকেলে বিক্রি করেই সফল রাসেল
এক পর্যায়ে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালের দিকে এসে শহীদ গাড়ি চালানো পুরোপুরি ছেড়ে দেন। এরপরে গাড়ির ব্যবসার পাশাপাশি একটি মুদির দোকান দেন তিনি। পাশাপাশি হাতে হাতে খোঁজ নেওয়া ও পরিচিতির মাধ্যমেই চলছিল শহীদের গাড়ির ব্যবসা।
এদিকে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এসে পুরোনো গাড়ির বাজারে নতুন একটি সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৯৯ সালের দিকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকার রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজন করা হয় পুরোনো গাড়ির হাট। শহীদের মতো ব্যবসায়ীদের জন্য এটি হয়ে ওঠে নতুন একটি সুযোগ। হাতে হাতে গাড়ি কেনাবেচার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সাপ্তাহিক এই হাটে যেতে শুরু করেন। সেখানে গাড়ি দেখানো, ক্রেতার সঙ্গে কথা বলা, দরদাম করা-সব মিলিয়ে পুরোনো গাড়ির ব্যবসা যেন একটি নতুন ঠিকানা পেয়ে যায়। তবে শহীদের চোখে সেই সময়ের ব্যবসা আর এখনকার ব্যবসার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
শহীদ বলেন, ‘২০০০ সালের আগে পুরোনো গাড়ি বিক্রি করা তুলনামূলক কঠিন ছিল। গাড়ি বিক্রির জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতাম। এক মাসে বা কয়েক মাস পর গাড়ি বিক্রি হতো। গাড়ি বিক্রি কম হতো। কিন্তু একটি গাড়ি বিক্রি করতে পারলে লাভ থাকত ভালো। সময় বদলেছে। বদলে গেছে গাড়ি কেনাবেচার ধরনও। এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো গাড়ির শোরুম হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাড়ির ছবি, দাম, মডেল, সুযোগ-সুবিধা-সবকিছু মুহূর্তেই সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে যায়। একজন ক্রেতা চাইলে একসঙ্গে অনেক গাড়ির দাম তুলনা করতে পারেন। কোথায় কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, সেটাও সহজেই জানতে পারেন।
এই অভিজ্ঞচালকের ভাষায়, ক্রেতা যেখানে একটু কম দাম পাচ্ছেন, সেখানেই গাড়ি কিনছেন। ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। আগে একটি গাড়ি বিক্রি করে যে লাভ পাওয়া যেত, এখন কখনো কখনো সেই লাভের আশাও করা যায় না। এমন পরিস্থিতিও আসে, যখন খুব বেশি লাভের কথা না ভেবে কেনাদামেই গাড়ি ছেড়ে দিতে হয়।’
আরও পড়ুন
বিদেশে প্রতারণার শিকার, দেশে ফিরে পুরোনো বাইকের ব্যবসায় সফল মেহেদী
তবে এই গাড়ি ব্যবসায়ীর আক্ষেপের চেয়ে অভিজ্ঞতার কথাই বেশি। কারণ তিনি দেখেছেন একটি সময়, যখন গাড়ির বিজ্ঞাপন দিতে হতো পত্রিকার পাতায়। দেখেছেন এমন দিন, যখন মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও গাড়ি বিক্রি হতো না। আবার দেখেছেন, সেই অপেক্ষার শেষে একটি গাড়ি বিক্রি হয়ে হাতে ভালো লাভ এসেছে। দেখেছেন গাড়ির হাটের উত্থান, দেখেছেন শোরুমের বিস্তার। আর এখন দেখছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপট। সত্তর বছরের জীবনে গাড়ির ব্যবসার পরিবর্তন যেন শহীদের নিজের চোখের সামনে বদলে যাওয়া বাংলাদেশেরই একটি ছোট গল্প।
সম্প্রতি রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বসা পুরোনো গাড়ির হাটে দুটি গাড়ি বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন মো. শহীদ। হাটে ক্রেতাদের সঙ্গে গাড়ির দাম, অবস্থা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন তিনি। ক্রেতাদের সঙ্গে দরদাম ও কথাবার্তার ফাঁকেই তার সঙ্গে কথা হয়। এ সময় দীর্ঘদিনের পুরোনো গাড়ির ব্যবসার নানা অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির কথা তুলে ধরেন শহীদ।
তিনি বলেন, ‘আমার তিন সন্তানেরই পড়াশোনা শেষ হয়েছে। তারা এখন নিজেদের মতো করে প্রতিষ্ঠিত। তাই সংসারের দায়িত্বও আগের তুলনায় অনেক কম। তারপরও এ বয়সে বসে থাকতে ভালো লাগে না। ব্যবসা কম হোক কিংবা বেশি হোক, আমি এখনো পুরোনো গাড়ির ব্যবসা করে যাচ্ছি। যতদিন শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, ততদিন কাজ করে যেতে চাই।’
কেএসকে
বিজ্ঞাপন