ব্রেকিং নিউজ
নিজের গুমের ৬২ দিনের বর্ণনা দিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ জবিতে এআই-আইটি ফেস্ট, এক মঞ্চে ২০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ উদ্ভাবক টেস্টে নো বল ঠেকাতে গাভাস্কারের টোটকা—বোলারের সঙ্গে কোচেরও জরিমানা হোক লাশের ‘প্যাকেট’, বলেশ্বরের স্রোত ও গুমের গোপন ব্যাকরণ ফেসবুকে হঠাৎ এআই ড্রামার কেন এত জনপ্রিয়তা? হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে আমাকে কাজে লাগাতেন : অ্যাডলফ খান শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর আগে ভেবে দেখবেন, যদিও আপনি পারবেন কি না নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে সাতশো ছাড়িয়ে গেছে, তিব্বতে আরেকটি হৃদের সৃষ্টি সারের চাহিদা-বরাদ্দে অসামঞ্জস্য, সংকট মোকাবিলায় সাত দফা দাবি ডিলারদের ঢাবির পিএমআইসিএসের তৃতীয় ব্যাচের ৩৬ শিক্ষার্থী পেলেন সনদ
জাতীয়

প্রকৃতি ও মানুষ: অধ্যাপক গোলাম মুরশিদকে স্মরণ

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
বিধান চন্দ্র পাল কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও আমাদের সঙ্গে থেকে যান—তাঁদের লেখা, চিন্তা, প্রশ্ন, পরামর্শ ও কাজের মাধ্যমে। সময় যত এগিয়ে যায়, তাঁদের রেখে যাওয়া কিছু চিন্তা ও প্রশ্ন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। গোলাম মুরশিদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন স্বনামধন্য প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর দীর্ঘসময় ধরে গবেষণা তাঁকে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এক অনন্য মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি এককথায় ‘বঙ্গবিদ’ বলে অভিহিত ও সমাদৃত। বাংলাদেশ ও বাঙালিকে তিনি দেখেছেন ইতিহাস, সমাজ, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির নানান দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর কাজের বিস্তার এত ব্যাপক যে, তাঁকে কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা কঠিন। কালান্তরে বাংলা গদ্য, আশার ছলনে ভুলি, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, কালাপানির হাতছানি, রেনেসাঁস বাংলার রেনেসাঁস, বিদ্রোহী রণক্লান্ত—তাঁর লেখা প্রতিটি বইই যেন বাঙালির জীবন ও ইতিহাসের একেকটি আলাদা জানালা। কিন্তু এসব বৈচিত্র্যময় কাজের ভেতরেও একটি গভীর ঐক্য ছিল: মানুষকে তিনি তার সময়, সমাজ, ভূগোল ও জীবন বাস্তবতার ভেতর থেকে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এই জায়গা থেকেই তাঁর প্রকৃতি ও পরিবেশ ভাবনার দিকটি নতুন করে ভাবা যায়। তাঁকে সরাসরি ‘পরিবেশ-চিন্তাবিদ’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন হয় না। তাঁর কাজের ব্যাপ্তি তার চেয়ে অনেক বড়। কিন্তু প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার প্রশ্ন তাঁর চিন্তার বাইরে ছিল না। তাঁর উজান স্রোতে বাংলাদেশ গ্রন্থটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রকৃতি ও পরিবেশকে কেন্দ্র করে তাঁর এই কাজ থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, বাংলাদেশের ভূগোল ও মানুষের জীবনকে তিনি আলাদা করে দেখেননি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিবেশ সম্পর্কে তাঁর নিজের একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য ও অবস্থান ছিল কিংবা রয়েছে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে নিজের লেখালেখির প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‌‘তবে আমি পরিবেশবাদী।’ এরপরই বই প্রকাশের জন্য গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপও পোষণ করেছিলেন—বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানের ওজনই যখন নয় কেজি; তখন ‘কত গাছ গেল!’ আরও পড়ুন ‘দুখু মিয়া’ ছাড়াও আর কী কী নামে ডাকা হতো নজরুলকে? এই কথার মধ্যে তাঁর পরিবেশবোধের একটি গভীর মানবিক দিক ধরা পড়ে। যে মানুষটি সারাজীবন বই লিখে জ্ঞান সংরক্ষণ করেছেন, তিনিই আবার সেই বই তৈরির বস্তুগত মূল্য—গাছের ক্ষয়—নিয়ে অস্বস্তিও প্রকাশ করেছেন। জ্ঞানচর্চা এবং প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে এর চেয়ে সংবেদনশীল উপলব্ধি খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রকৃতি তাঁর চিন্তায় আরেকভাবে ফিরে আসে ভূগোল, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। একই সাক্ষাৎকারে বাংলা গানের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রচলিত ইতিহাসচর্চার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বলেন, গানকে শুধু গান হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ ইতিহাস পাওয়া যায় না; তাকে দেখতে হবে ‘দেশ, কাল, সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে।’ আবার বঙ্গীয় স্থাপত্যের ইতিহাস লেখার পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘বঙ্গের ভেজা আবহাওয়ায় বেশির ভাগ স্থাপত্যই বিলীন হয়ে গেছে।’ দুটি বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর যোগ আছে। তিনি কোনো বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে দেখতেন না। গানকে সমাজ ও সময়ের সঙ্গে, স্থাপত্যকে ভূগোল ও আবহাওয়ার সঙ্গে, সংস্কৃতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতেন। অর্থাৎ তাঁর ইতিহাস চর্চায় মানুষ কখনো প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা ছিল না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি বইটিকেও নতুনভাবে পড়া যায়। বাংলার নদী, বর্ষা, পলি, উর্বর মাটি, জলাভূমি, কৃষি, মাছ, খাদ্যাভ্যাস, বসতি ও ঋতুচক্র—এসব বাদ দিয়ে বাঙালির সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা কখনোই সম্ভব নয়। মানুষের খাদ্য, পোশাক, জীবিকা, বসতি, উৎসব ও দৈনন্দিন জীবন তার চারপাশের পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কটা অত্যন্ত গভীর ও আত্মীক। গোলাম মুরশিদ মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে যে সামগ্রিকতায় দেখেছেন, সেখানে এই প্রাকৃতিক বাস্তবতা অনিবার্যভাবেই উপস্থিত। আজকের সময়ে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়। নদী হারিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট, বন উজাড়, কৃষিজমি হ্রাস পাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, বন্যা, নদীভাঙন ও জীববৈচিত্র্যের সংকট মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেছে। আরও পড়ুন আবদুল্লাহ আল মামুন ও তাঁর কালজয়ী নাট্যভুবন এসবকে শুধু ‘পরিবেশের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ অর্থ বোঝা যায় না। এগুলো একই সঙ্গে মানুষের ইতিহাস, অর্থনীতি, খাদ্য, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতেরও প্রশ্ন। একটি নদী হারানো মানে শুধু একটি জলধারা হারানো নয়; তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে জীবিকা, নৌপথ, মাছ, কৃষি, লোকজ সংস্কৃতি এবং একটি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য ও স্মৃতি। একটি জলাভূমি ভরাট করা মানে শুধু একটি জমির ব্যবহার বদলে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে বদলে যায় জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রাও। গোলাম মুরশিদের কাজকে এই দৃষ্টিতে পড়লে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা নতুনভাবে সামনে আসে। তিনি হয়তো আজকের অর্থে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেননি। কিন্তু মানুষকে তার ভূগোল, সমাজ, ইতিহাস ও জীবন-যাপনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার যে অভ্যাস তাঁর গবেষণায় ছিল, আজকের পরিবেশ-সংকট বোঝার জন্য সেই দৃষ্টিভঙ্গিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গোলাম মুরশিদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের আরেকটি দিকও এখানে স্মরণযোগ্য। প্রভা অরোরা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠার প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তাঁর পরামর্শ, উৎসাহ ও সহযোগিতা আমাদের জন্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমর্থন ছিল না; ছিল চিন্তার প্রতিও গভীর আস্থা। নতুন উদ্যোগ, নতুন প্রজন্ম এবং সমাজের জন্য কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর আগ্রহ তাঁর দীর্ঘজীবনের কৌতূহল ও উদারতারই অনন্য পরিচয় বহন করে। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ তাই শুধু তাঁর কৃতিত্বের তালিকা তৈরি করা নয়। বরং তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোর সামনে নিজেদেরকে দাঁড় করানো। মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক কী? আমাদের উন্নয়নের প্রাকৃতিক ভিত্তি কোথায়? আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আসলেও কী রেখে যাচ্ছি? সম্ভবত গোলাম মুরশিদের পরিবেশ ভাবনার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই—প্রকৃতি কোনো আলাদা বিষয় নয়। মানুষের ইতিহাসের ভেতরেই প্রকৃতির ইতিহাস আছে। মানুষের সংস্কৃতির ভেতরেও আছে তার ভূগোলের ছাপ। আর প্রকৃতির ভবিষ্যৎ থেকে মানুষের ভবিষ্যৎকে আলাদা করে দেখা যায় না। আরও পড়ুন শামসুর রাহমানের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গোলাম মুরশিদ চলে গেছেন। তাঁর কণ্ঠ আর শুনবো না, নতুন কোনো বইও আর আসবে না। কিন্তু তাঁর লেখা আছে, তাঁর গবেষণাসমূহ আছে, আর আছে তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ আমাদের নিজেদেরই জিজ্ঞেস করতে হবে—আমরা কেমন ভবিষ্যৎ তৈরি করছি? শুধু সমৃদ্ধ একটি সমাজ, নাকি সেই সমাজ টিকে থাকার মতো একটি সুস্থ পৃথিবীও? লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রভা অরোরা লিমিটেড। এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>