বিজ্ঞাপন
মুসা (আ.) ফেরাউনের রাজপ্রাসাদেই বড় হন। তিনি ফেরাউনের সওয়ারিতে চড়তেন, ফেরাউনের মত পোশাক পরতেন। সবাই তাঁকে ‘ফেরাউনের ছেলে’ বলে ডাকত। ‘ফেরাউনের ছেলে’ হিসেবে তিনি বেশ ক্ষমতাবানও হয়ে উঠেছিলেন। তার ভয়ে কোনো কিবতি (মিশরের মূল অধিবাসী) বনি ইসরাইলের কারো ওপর জুলুম করার সাহস পেত না। বনি ইসরাইল তার কারণে কিছুটা শক্তি ও মর্যাদা ফিরে পেয়েছিল, যেহেতু তারা তাঁকে দুধ পান করিয়েছিল এবং সেই সূত্রে তারা ছিল তার দুধ-সম্পর্কের আত্মীয়।
একদিন ফেরাউন সওয়ারি নিয়ে শহরের বাইরে গেলেন, মুসা (আ.) তার সঙ্গে ছিলেন না। পরে মুসা (আ.) যখন শুনলেন ফেরাউন বেরিয়ে গেছেন, তিনি ফেরাউনের পিছু পিছু রওনা হলেন। চলতে চলতে দুপুরে তিনি \'মানফ\' নামক স্থানে পৌঁছালেন। দুপুরবেলা শহরের হাট-বাজারগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং চারপাশ শান্ত ছিল। কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনা বর্ণনায় বলেছেন, তিনি এমন এক সময় শহরে প্রবেশ করলেন, যখন অধিবাসীরা ছিল অসতর্ক।
শহরে ঢুকে মুসা (আ.) দেখলেন, দুজন লোক মারামারি করছে। তাদের একজন ছিল বনি ইসরাইলের, অন্যজন ছিল কিবতি বা মিশরের মূল অধিবাসী। মুসাকে (আ.) দেখে বনি ইসরাইলি লোকটি মুসার (আ.) সাহায্য প্রার্থনা করল। মুসা (আ.) এগিয়ে গেলেন এবং কিবতিটিকে নিরস্ত করতে তার বুকে একটি ঘুষি দিলেন। তিনি তাকে শুধু নিরস্তই করতে চেয়েছিলেন, তাকে হত্যা করার জন্য ঘুষি দেননি। কিন্তু ওই এক ঘুষিতেই কিবতিটি মারা গেল।
লোকটি মারা যাওয়ায় মুসা (আ.) অনুশোচনায় দগ্ধ হলেন। আল্লাহ তাআল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এই ভুলের জন্য।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনা বর্ণনায় বলেন, “তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন তার অধিবাসীরা ছিল বেখবর। তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখলেন। এদের একজন ছিল তার নিজ দলের এবং অন্য জন তার শত্রু দলের। যে তার নিজ দলের সে তার শত্রু দলের লোকটির বিরুদ্ধে তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মুসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং এতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মুসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয় সে প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী।
তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।
তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, এরপর আমি কখনও অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না।”
(সুরা কাসাস: ১৫-১৭)
পরদিন সকালে মুসা (আ.) অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় শহরে হাঁটছিলেন। তিনি আশঙ্কায় ছিলেন গতকাল যে নিহত হয়েছে, তার কথা ফেরাউন ও তার দরবার জেনে ফেলল কি না!
ঠিক সেই সময়ে তিনি দেখতে পেলেন, গতকাল যে ইসরাইলি লোকটি সাহায্য চেয়েছিল, সে আজ আবার অন্য এক কিবতির সাথে ঝগড়া করছে এবং মুসাকে (আ.) দেখে উচ্চৈস্বরে সাহায্য চাইছে!
মুসা (আ.) লোকটির ওপর ভীষণ বিরক্ত হলেন। তিনি বললেন, তুমি তো দেখছি অত্যন্ত ফেতনাবাজ লোক!
এ কথা বলে মুসা (আ.) যখন তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন, ইসরাইলি লোকটি ভাবল মুসা (আ.) বুঝি তাকেই মারতে আসছেন। কারণ মুসা (আ.) তাকে একটু আগেই ধমক দিয়েছিলেন। সে ভয়ে চিৎকার করে গতকালের হত্যাকাণ্ডের গোপন সত্যটি ফাঁস করে দিল! সে বলে উঠল, মুসা! তুমি গতকাল যেমন একজনকে হত্যা করেছিলে, আজকে কি আমাকে হত্যা করতে চাও!
ফলে সবাই জেনে গেলো, গতকালের কিবতি খুনের পেছনে মুসাই দায়ী। ফেরাউন ও তার আমত্যরা মুসাকে (আ.) মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা শুরু করল। ফেরাউনের এক সভাসদ যিনি মুসাকে পছন্দ করতেন, গোপানে তাকে সতর্ক করে বললেন, মুসা! দরবারের প্রভাবশালীরা তোমাকে হত্যা করার পরামর্শ করছে। তুমি অবিলম্বে মিশর থেকে বের হয়ে যাও।
মুসা (আ.) তখনই এক কাপড়ে মিশর ত্যাগ করলেন। তার কাছে পথের রসদ ছিল না, খাবার ছিল না, কোথায় যাবেন তাও জানা ছিল না। তিনি দোয়া করলেন, হে আমার রব! আমাকে জালেম সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করুন!
তথ্যসূত্র:
কোরআন, সুরা কাসাস: ১৮–২১
তাফসিরে ইবনে কাসির
তাফসিরে তাবারি
আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন