মঞ্চে ফিলিস্তিনের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার কারণে মার্কিন র্যাপার ম্যাকলমোরকে অ্যাড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে বাদ দেওয়ার পর এখন সফর থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ট্যুরের সব সহশিল্পী।
তাঁদের মধ্যে আছেন সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক ফিনিয়াস, আইরিশ গায়ক-গীতিকার অ্যারন রো ও ডেনিশ ব্যান্ড লুকাস গ্রাহাম। শিরানের সঙ্গে লাইভ পারফর্ম করা আইরিশ লোকসংগীতের ব্যান্ড বিওগাও নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
বিলি আইলিশের ভাই ও দীর্ঘদিনের সংগীত সহযোগী ফিনিয়াস গতকাল ইনস্টাগ্রামে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলার কারণে শিল্পীদের চুপ করিয়ে দেওয়া উচিত নয়।’
গতকাল ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে লুকাস গ্রাহাম বলেন, ‘যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু কিংবা শিশুদের বেড়ে ওঠার অধিকার নিয়ে কথা বলার স্বাধীনতা শিল্পীদের থাকা উচিত। অর্থ বা ক্ষমতা দিয়ে ঠিক করে দেওয়া উচিত নয়, কে কথা বলতে পারবে কিংবা কোন মানুষের দুর্ভোগের কথা বলা যাবে।’
অ্যারন রো গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, শিরান তাঁর বন্ধু এবং তাঁর ক্যারিয়ারে শিরানের অবদান অনেক। তাই সফর ছাড়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না।
সিদ্ধান্ত আমার নয়: শিরান
ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার পরই অবশ্য এড শিরান স্পষ্ট করে জানান, ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর ছিল না।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি জানান, কয়েকটি ভেন্যু আপত্তি জানানোর পর সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেন্যু ও সফরের প্রোমোটার মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।
শিরানের ভাষ্য, ম্যাকলমোরের সঙ্গে চুক্তি তাঁর নয়, প্রোমোটারের। আগে থেকেই কনসার্টের পরিকল্পনা করা দর্শকদের হতাশ করতে চাননি তিনি। পাশাপাশি সফরের সঙ্গে যুক্ত কর্মী, সংগীতশিল্পী ও অন্য সহশিল্পীদের কাজ ও জীবিকার কথাও বিবেচনায় নিতে হয়েছে। তাঁর এই ব্যাখ্যার অল্প সময়ের মধ্যেই একে একে সফর ছাড়ার ঘোষণা দেন সহশিল্পীরা।

ঘটনার যেভাবে শুরু
ঘটনার সূত্রপাত ৪ সেপ্টেম্বর। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরানের কনসার্টে পারফর্ম করার সময় ম্যাকলমোর বলেন, এত বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের বিশ্বাসের কথা বলার সুযোগও এই সফরে যোগ দেওয়ার অন্যতম কারণ। এরপর দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন (ফিলিস্তিন মুক্ত করো)।’
পরে ম্যাকলমোর পরিবেশন করেন ‘হিন্দ’স হল’। ২০২৪ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গানটি প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এতে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করা হয়েছে। গান পরিবেশনের সময় বড় পর্দায় গাজার ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যও দেখানো হয়। পরদিন একই ভেন্যুতে আবার পারফর্ম করেন ম্যাকলমোর।
এরপরই শুরু হয় বিতর্ক। ইসরায়েলি-আমেরিকান কাউন্সিল তাঁকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে আবেদন শুরু করে। ‘স্টপঅ্যান্টিসেমিটিজম’ নামের সংগঠনও তাঁর পারফরম্যান্সের সমালোচনা করে। সংগঠনটির একটি পোস্ট ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে শেয়ার করেন পপ তারকা পিঙ্ক।
তবে পরে তিনি স্পষ্ট করেন, ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেননি এবং ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বলারও বিরোধিতা করছেন না। তাঁর উদ্বেগ ছিল কনসার্টে উপস্থিত ইহুদি দর্শকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে।
দ্বিতীয় দিনের পারফরম্যান্সে ম্যাকলমোরও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের সমালোচনা কিংবা বর্ণবৈষম্য ও গণহত্যার বিরোধিতা করা ইহুদি জনগোষ্ঠীর সমালোচনা নয়। গাজা ও পশ্চিম তীরের মানুষ যেন মনে না করেন, তাঁদের ভুলে যাওয়া হয়েছে—সেটিও উল্লেখ করেন তিনি।
সামনে আসে রবার্ট ক্রাফটের নাম
কয়েক দিনের বিতর্কের পর গত সোমবার ম্যাকলমোর জানান, তাঁকে সফরের বাকি কনসার্টগুলো থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ম্যাসাচুসেটসের জিলেট স্টেডিয়াম ও আমেরিকান ফুটবল দল নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফট এ সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ম্যাকলমোরকে নিজের ভেন্যুতে পারফর্ম করতে না দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ক্রাফট। তাঁর বক্তব্য, স্টেডিয়ামকে ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্ল্যাটফর্ম’ হতে দিতে চান না। একই সঙ্গে ম্যাকলমোরের অতীতের কিছু বক্তব্য ও উপস্থাপনাকে ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য আঘাতমূলক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ক্রাফট বলেন, সংঘাতে অনেক বেশি মানুষের প্রাণ গেছে ও দুর্ভোগ হয়েছে। তবে তাঁর দাবি, হামাসের কর্মকাণ্ড বাদ দিয়ে নির্বাচিত কিছু তথ্য তুলে ধরা বিভাজন ও বিদ্বেষ আরও বাড়াতে পারে। অন্য ভেন্যুগুলোকে ম্যাকলমোরকে বাদ দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।
পরে সফরের প্রোমোটার মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ জানায়, কয়েকটি ভেন্যু ম্যাকলমোরকে পারফর্ম করতে দেবে না বলে জানিয়েছিল। ফলে সফরের বাকি অংশ বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যাতে কয়েক লাখ দর্শক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারতেন।
শিরানের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন
নিজের বিবৃতিতে শিরানের অবস্থানেরও সমালোচনা করেন ম্যাকলমোর। তিনি বলেন, শিরান যে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন, সেটি তিনি বুঝতে পারেন। তবে কোনো অবস্থান নেওয়ার মূল্যও দিতে হয়। এতে অর্থ, ব্র্যান্ড চুক্তি, স্পনসরশিপ, উৎসব, ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান, সম্পর্ক কিংবা বিভিন্ন সুযোগ হারানোর ঝুঁকি থাকে। ম্যাকলমোর জানান, এসবের অনেক কিছুই তিনি হারিয়েছেন। তাঁর মতে, নিপীড়ক ও নিপীড়িতের মধ্যে নিরপেক্ষ অবস্থান বলে কিছু নেই।
অন্যদিকে শিরান জানিয়েছেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং দুই পক্ষের মানুষের দুর্ভোগ তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করে। তবে নিজের পেশাগত মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর শ্রোতাদের মধ্যে নানা বয়স ও পটভূমির মানুষ, এমনকি অনেক শিশুও রয়েছে। তাই কনসার্টকে রাজনৈতিক বিতর্কের মঞ্চ করতে চান না।
ম্যাকলমোর নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানোর যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, সেটিকে সম্মান করেন বলেও জানান শিরান। তবে তাঁর মতে, একই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ আলাদা হতে পারে। নিজের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের বদলে আলোচনা ও সংলাপের পথকেই বেছে নিয়েছেন তিনি।
বিবিসি, রয়টার্স, রোলিং স্টোন ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>