বিজ্ঞাপন
টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের বন ও জনবসতির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গারো সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাও। বন উজাড় করে আনারস-কলা চাষ এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নতুন বসতি বাড়ায় ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে গারোদের নিজস্ব ‘আচিক ভাষা’ ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। এতে অস্তিত্ব সংকটের দিকে যাচ্ছে তাদের আদি ইতিহাস-ঐতিহ্য।
শিক্ষক সংকটে পাঠদানের সুযোগ কম
সম্প্রতি সরকার গারো আচিক ভাষার বই বিদ্যালয়ে দিলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদানের সুযোগ কম। তাই মায়ের কাছ থেকে শেখা পদ্ধতিই শিশুদের শেখার মাধ্যম। তাদের ভাষা শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নতুন প্রজন্ম টিকে থাকতে পারবে।
জানা গেছে, জীবন-জীবিকা ও উচ্চশিক্ষার জন্য গারো সন্তানরা আশপাশের বাঙালিপ্রধান এলাকায় আসতে শুরু করেছে। অন্যদিকে আদিবাসী জনপদেও বাঙালিরা এসে বসতি স্থাপন করায় মূল অধিবাসীরা আজ নিজ ভূমিতেই বিপাকে পড়েছেন।
‘গারোদের ভাষায় পাঠদান করা বেশ কঠিন। ইংরেজি উচ্চারণে পাঠদান করে বোঝানো সাধারণ শিক্ষকদের জন্য মোটেই সহজ নয়।’
আদিবাসী নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, আগের তুলনায় আদিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে। মধপুরে গড় অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার আদিবাসীর বসবাস।
নেই ‘আচিক’ ভাষার কোনো লিখিত বর্ণমালা
জানা গেছে, গারোদের ‘আচিক’ ভাষার কোনো লিখিত বর্ণমালা নেই। বহুকাল আগে তিব্বত এলাকা থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করার সময় গারোরা তাদের ভাষার বর্ণমালা হারিয়ে ফেলে। বসতি স্থাপনে এলাকা বাছাইসহ নানা প্রতিকূলতায় ভাষার প্রতি আর যত্নবান হতে পারেননি তারা। ফলে স্থায়ীভাবে ভাষা, ভাষার বর্ণ তারা চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। তাই তখন থেকে তাদের মুখে মুখে নিজেদের ভাষার যেটুকু ব্যবহার ছিল তার ছিটেফোঁটা আচিক (মান্দি ভাষা) রূপে এখনো টিকে আছে মাত্র। ‘কোচ’ ভাষার (বর্মণদের ভাষা) ব্যবহারতো হারিয়েই গেছে।
গারো সম্প্রসায়ের আচিক ভাষা ও মান্দি ভাষা মূলত একই। মান্দি ভাষাকেই আচিক ভাষা ধরে নেওয়া হয়। গারোরা নিজেদেরকে ‘মান্দি’ (যার অর্থ মানুষ) বলে পরিচয় দেন। স্থানীয়ভাবে তাদের ভাষাকে অনেক সময় মান্দি বা মান্দি খুসিক বলা হয়। অন্যদিকে গারো জাতির নাম হচ্ছে আচিক। আচিক শব্দের অর্থ গারো ও পাহাড়।
‘গারো শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে সম্পূর্ণ বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করতে হয়। কর্মজীবনে এসেও অফিস-আদালতসহ সব সব ক্ষেত্রেই তাদের বাংলা ব্যবহার করতে হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাবে পরিবার ও সমাজে আচিক ভাষার চর্চা প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে যাচ্ছে।’
বই থাকলেও শিক্ষক নেই
ভাষা আন্দোলনের চেতনায় আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল দর্শনে ২০১০ সালে সরকারের শিক্ষানীতিতে ভাষা রক্ষা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হয়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের হাতে তাদের নিজ নিজ ভাষার পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৪ সালে এ নিয়ে কাজ শুরু করে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রথম পর্যায়ে ২০১৭ সাল থেকে চাকমা, ত্রিপুরা, সাদরি, মারমা ও গারো এই পাঁচটি ভাষার শিশুদের জন্য প্রাক প্রাথমিক থেকে শুরু করে বর্তমানে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই ও শিখন সামগ্রী তৈরি করেছে। তবে এতে ভাষা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা কমলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংকট রয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ গারোরা জাগো নিউজকে বলেন, অতীতে এ অঞ্চলের গারো আদিবাসীরা আচিক ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানতেন না বা ব্যবহার করতেন না। কিন্তু কালের বিবর্তনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। শহরমুখী এবং চর্চার অভাবে আচিক ভাষার এখন ব্যবহার কম হচ্ছে।
‘গারো সম্প্রদায়ের লোকজন বাঙালিদের কাছাকাছি এসেছে। আমাদের সন্তানদের সঙ্গে তারা খেলাধুলা করছে। আমাদের লেখাপড়াসহ সকল কার্যক্রম বাংলাতেই করতে হয়। অনেকেই নিজেরাই উৎসাহিত হয়ে বাংলা ভাষা কথা বলে। আমাদের ভাষার চর্চার সুযোগও কম।’
গারোরা জাগো নিউজকে বলেন, গারো শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে সম্পূর্ণ বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করতে হয়। কর্মজীবনে এসেও অফিস-আদালতসহ সব সব ক্ষেত্রেই তাদের বাংলা ব্যবহার করতে হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাবে পরিবার ও সমাজে আচিক ভাষার চর্চা প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়া শিশুরা তাদের মাতৃভাষা ভালোভাবে বলতেই পারে না। কেউ কেউ নিজ বাড়িতে মা-বাবার মুখে শুনে এই ভাষা কিছুটা বুঝতে শিখলেও তারা নিজেরা আচিক ভাষায় কোনো উত্তর দিতে পারে না। মা-বাবা নিজের ভাষায় ডাকলেও উত্তর আসে বাংলায়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জাগো নিউজকে বলেন, গারোদের ভাষায় পাঠদান করা বেশ কঠিন। ইংরেজি উচ্চারণে পাঠদান করে বোঝানো সাধারণ শিক্ষকদের জন্য মোটেই সহজ নয়।
আরও পড়ুন
মুণ্ডা সম্প্রদায়ের জীবনচিত্র দেখতে ঘুরে আসুন
এদিকে মধুপুরের ১১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ভুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজন ও শোলাকুড়ি, আমলীতলা, ইদিলপুর, বেরিবাইদ, হাগুড়াকুড়ি ও মমিনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে গারো শিক্ষক কর্মরত। মিশনারি স্কুল ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আট শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য এ কয়েকজন শিক্ষক যথেষ্ট নয়। ভাষা রক্ষায় সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগ সফলে সংশ্লিষ্ট ভাষার এবং বিশেষ প্রশিক্ষিত শিক্ষকের বিকল্প নেই।
গারো সম্প্রদায়ের লোকজন জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের দাদু ও দাদিরা যে পোশাক পরতেন, যে পোশাকগুলো এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব আদিবাসী ভাষা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে বসবাস করায় আমাদের ছেলে মেয়েরা তাদের কাছ থেকে ভাষা শিখে কথা বলে। যার কারণে আমাদের এ ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তারপরও আমরা আমাদের ভাষা টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছি।
স্থানীয় সুলেখা ম্রং জাগো নিউজকে বলেন, গারো ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার মূল কারণ আমাদের শিক্ষা ও চর্চা নেই। ছোট ছোট বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে না। তাদের বাবা-মাও বাংলা ভাষা দিয়ে কথা বলে। ভাষা হারিয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের নিজস্ব অস্তিত্ব সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে। গারো যারা স্কুলে লেখাপড়া করে তারা বাংলাও ভালো পারে না। এরজন্য বাচ্চারা স্কুলে যেতেও অনীহা প্রকাশ করে এবং স্কুলের ফলাফল ভালো না করলে ঝরে পড়ে।
ভুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মার্জিনা চিসিম জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের মাতৃভাষা হচ্ছে গারো আচিক ভাষা। এই ভাষায় পড়াশোনা করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু শিশুরা সেভাবে শিখতে পারছে না। কারণ আমাদের সেরকম শিক্ষক নেই। পাঠ্য বই সেভাবে শেখাতে পারছি না।
আরও পড়ুন
মুণ্ডা সম্প্রদায়ের জীবনচিত্র দেখতে ঘুরে আসুন
ভুটিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এপ্রিল ম্রি জাগো নিউজকে বলেন, এখন বিভিন্ন কারণে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। সব সময়ই বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে। বাংলা ভাষা দিয়েই পড়াশুনা করতে হচ্ছে। আমাদের ভাষা দিয়ে লেখাপড়ার সুযোগ কম হচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলগুলোতে গারোদের ভাষায় বই থাকলেও সব জায়গায় গারো শিক্ষক নেই। যেসব জায়গায় গারো শিক্ষক রয়েছে, সেসব জায়গায় পড়ানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজেন নকরেক জাগো নিউজকে বলেন, গারো সম্প্রদায়ের লোকজন বাঙালিদের কাছাকাছি এসেছে। আমাদের সন্তানদের সঙ্গে তারা খেলাধুলা করছে। আমাদের লেখাপড়াসহ সকল কার্যক্রম বাংলাতেই করতে হয়। অনেকেই নিজেরাই উৎসাহিত হয়ে বাংলা ভাষা কথা বলে। আমাদের ভাষার চর্চার সুযোগও কম। এছাড়া আমাদের লোকজন জীবিকার তাগিদে শহরমুখী হওয়ায় বিলুপ্তির পথে এ ভাষা ও সংস্কৃতি।
আরও পড়ুন
বাঁশ-বেতের শিল্পে পাহাড়ের প্রাণ, টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম লাকি চাকমার
তিনি আরও বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষরা এই ভাষার কথা বলতেন। তখন থেকেই ভাষার প্রচলন ছিল ব্যাপক। আমাদের প্রত্যেকটি গ্রামে মিশনারি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে গারো শিক্ষক থাকলেও যথাযথভাবে পড়ানোর দিকনির্দেশনা নেই। এই জাতিগোষ্ঠীর ওপর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, গারো কোচসহ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বিষয়ে সরকারের নজর রয়েছে। পিছিয়ে থাকা নারী ও শিক্ষার্থীদের সেলাই মেশিন, বাইসাইকেল ও উপবৃত্তিসহ ঘরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পরিচয় ও অস্তিত্ব। টিকে থাকার লড়াই নয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেই টিকে থাকবে তাদের ভাষা শিক্ষা সংস্কৃতি।
এফএ/জেআইএম
বিজ্ঞাপন