বিজ্ঞাপন
ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়ে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। গ্যাসের সংকট, জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ একা নয়। বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে এখনো বিদ্যুৎ–সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। কোথাও জ্বালানি–সংকট, কোথাও যুদ্ধ ও অবকাঠামো ধ্বংস, আবার কোথাও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘাটতি এ পরিস্থিতির কারণ।
সুদানে ভয়াবহ বিদ্যুৎ-বিভ্রাট
বাংলাদেশের বাইরে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুতর বিদ্যুৎ সংকটের উদাহরণগুলোর একটি সুদান।
দেশটির সেনা-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। রাজধানী খার্তুম ও ওমদুরমানের মতো এলাকায় বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে ব্যবসা, কারখানা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর পুরো রাতে লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা, তার ও অন্যান্য সরঞ্জাম লুট এবং মেরামতের জন্য অর্থের অভাব—সব মিলিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুদানের প্রধান বিদ্যুৎ উৎসগুলোর একটি মেরোয়ে বাঁধও সংঘাতের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সংকট সেখানে শুধু লোডশেডিংয়ের সমস্যা নয়, বরং যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
পাকিস্তানে আবার বাড়ছে লোডশেডিং
পাকিস্তানে বিদ্যুৎ সংকট নতুন নয়। তবে চলতি আগস্টের শেষ দিকে আবারও নির্ধারিত ও অনির্ধারিত বিদ্যুৎ বন্ধের খবর এসেছে।
পাকিস্তান সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এলএনজি সরবরাহে সমস্যা হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় রাতের পিক সময়ে এক থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়েছে।
২৯ আগস্টের এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সরকার জানায়, এলএনজির একটি কার্গো সময়মতো না আসায় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে লোড ম্যানেজমেন্ট করতে হয়েছে।
অর্থাৎ পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহও সরাসরি সম্পর্কিত। গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়, আর তার প্রভাব পড়ে গ্রাহকের ওপর।
ভেনেজুয়েলায় তীব্র লোডশেডিং
ভেনেজুয়েলায় চলতি বছর বিদ্যুৎ–সংকট আবারও তীব্র আকার নিয়েছে। দেশটির অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে রাজধানী কারাকাসের বাইরে পরিস্থিতি বেশি খারাপ। কয়েকটি এলাকায় বাসিন্দারা প্রতিদিন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগের ঘাটতি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অচলাবস্থা। ভেনেজুয়েলার ৩৬ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার মধ্যে কার্যকর সক্ষমতা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
দেশটির বিদ্যুতের বড় অংশ জলবিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় খরার আশঙ্কাও নতুন করে সংকট বাড়াচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই ভেনেজুয়েলাবাসীর ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বছর ভেনেজুয়েলার বিদ্যুৎ সংকটকে ২০১৯ সালের পর সবচেয়ে তীব্র সংকটগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিউবায় ভয়াবহ লোডশেডিং
ক্যারিবীয় দেশ কিউবায় বিদ্যুৎ–সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আগস্টের শেষ সপ্তাহেও দেশটির অনেক এলাকায় দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
রাজধানী হাভানায় কোথাও কোথাও টানা ২০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার খবর পাওয়া গেছে। প্রদেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ—কিছু এলাকায় টানা দুই দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছে স্থানীয়রা।
চলতি বছরের আগস্টের শুরুতে কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড একাধিকবার পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ২ আগস্টের পর আবারও জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের ব্ল্যাকআউট হয়। এর আগে জুলাইয়েও কয়েক দফা দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয়েছিল।
এই বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম কারণ জ্বালানি ঘাটতি। একই সঙ্গে কিউবার বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রিড অবকাঠামো পুরোনো হওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতাও কমে গেছে। জ্বালানি সরবরাহের সংকট এবং যন্ত্রাংশের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে রেকর্ড লোডশেডিং
রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত বিদ্যুৎ-বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। আগস্টের মাঝামাঝি রুশ ড্রোন ও গোলাবর্ষণের পর ওদেসা, দনিপ্রোপেত্রোভস্ক, দোনেৎস্ক, খেরসন ও খারকিভ অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েন। নিরাপত্তা পরিস্থিতি যেখানে অনুমতি দিয়েছে, সেখানে জরুরি মেরামতের কাজ চালানো হয়েছে।
আগস্টের শেষ সপ্তাহেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ২৭ আগস্ট রুশ হামলার পর ছয়টি অঞ্চলে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্নতার খবর পাওয়া যায়। দেশটির জাতীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সে সময় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানায়।
যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালনলাইন ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাড়তি চাপের মধ্যে রয়েছে।
দেশে দেশে লোডশেডিংয়ের কারণ
বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি হলে সাধারণত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি, পুরোনো গ্রিড, অর্থের অভাব কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
সুদান ও ইউক্রেনের ক্ষেত্রে যুদ্ধ ও অবকাঠামো ধ্বংস বড় কারণ। পাকিস্তানে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গ্যাসের ঘাটতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স ১ ও ২, ডন, বিগ নিউজকেএএ/
বিজ্ঞাপন