বিজ্ঞাপন
ওমর ফারুক নাঈম
ভূমধ্যসাগরের নীল জলের পাড়ে গড়ে ওঠা শহর বার্সেলোনা। পাহাড়, স্থাপত্য, শিল্প, ইতিহাস ও মানুষের প্রাণচাঞ্চল্যের অপূর্ব সমন্বয়। স্পেনের কাতালোনিয়া অঞ্চলের রাজধানী শহরের একদিকে বিস্তৃত ভূমধ্যসাগর; অন্যদিকে পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। রাস্তায় হাটলে কখনো চোখে পড়ে আন্তোনি গাউদির অনন্য স্থাপত্য, কখনো শত বছরের পুরোনো সরু গলি, আবার কোথাও আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা। সাগরাদা ফামিলিয়া, পার্ক গুয়েল, লা রামব্লা কিংবা গোথিক কোয়ার্টার। প্রতিটি স্থানই যেন শহরের আলাদা একটি গল্প বলে। দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে সন্ধ্যায় সমুদ্রতীরের বাতাস, ক্যাফের আড্ডা আর আলোকিত শহর বার্সেলোনাকে আরও জীবন্ত করে তোলে। ইতিহাস ও আধুনিকতার এমন স্বাভাবিক সহাবস্থানই বার্সেলোনাকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় নগরীতে পরিণত করেছে।
বার্সেলোনাকে দেখার অনেক উপায় আছে। কেউ গাউদির স্থাপত্যে শহরকে খোঁজেন, কেউ ভূমধ্যসাগরের তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখেন, আবার কেউ শহরের অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে নেন কাতালোনিয়ার জীবনযাত্রার গল্প। কিন্তু বার্সেলোনাকে যদি একসঙ্গে, একটু দূর থেকে, অনেকটা পাখির চোখে দেখতে চান, তাহলেই যেতে হবে তিবিদাবো পাহাড়ে।
শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে যতই ওপরে ওঠা যায়, ততই বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। নিচে ছোট হতে থাকে বাড়িঘর, সড়কের গাড়িগুলো হয়ে যায় বিন্দুর মতো, আর দূরে নীল ভূমধ্যসাগর যেন শহরটিকে একটি বিশাল নীল ফ্রেমে আটকে রাখে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তখন মনে হবে বার্সেলোনা একটি অনন্য শিল্পকর্ম।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত তিবিদাবো হলো কোলসেরোলা ন্যাচারাল পার্কের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। এই উচ্চতাই তাকে করে তুলেছে বার্সেলোনার অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। তিবিদাবোর প্যানোরামিক এলাকা হলো পাহাড়ের সর্বোচ্চ অংশ, যেখানে বিনামূল্যে প্রবেশ করে শহরের বিস্তৃত দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
তিবিদাবো ভ্রমণের আনন্দ শুরু হয় আসলে চূড়ায় পৌঁছানোর আগেই। শহরের প্লাসা ডক্টর আন্দ্রেউ থেকে কুকা দে লুম ফানিকুলারে ওঠা যায়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ফানিকুলার যখন ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে থাকে; তখন চোখের সামনে খুলে যায় অন্য এক বার্সেলোনা। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্যানোরামিক এলাকায় পৌঁছানোর দ্রুত ও পরিবেশবান্ধব উপায়গুলোর একটি হলো এই কুকা দে লুম ফানিকুলার।
আরও পড়ুন
যে বাড়িটি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যে নোবেল এনে দিয়েছিল
চূড়ায় পৌঁছানোর পর প্রথম যে অনুভূতিটি তৈরি হয়, সেটি হলো বিস্ময়। এতক্ষণ যে শহরের ভেতরে ছিলাম, এবার সেই শহরটিই যেন পায়ের নিচে। প্রশস্ত সড়ক, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, গাছপালা, স্থাপত্য আর সমুদ্র। সবকিছু নিজ চোখের এক ফ্রেমে ধরা দেয়। পরিষ্কার আকাশের দিকে দূর থেকে বার্সেলোনার বিখ্যাত স্থাপনাগুলোও চোখে পড়ে। তবে তিবিদাবোর সৌন্দর্য শুধু শহর দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে শহর, পাহাড়, প্রকৃতি এবং বিনোদন মিলেমিশে একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
তিবিদাবোর প্যানোরামিক এরিয়ায় আছে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক আকর্ষণ। তার মধ্যে গিরাদাবো অন্যতম। পাহাড়ের সর্বোচ্চ অংশে স্থাপিত এই প্যানোরামিক চাকা থেকে বার্সেলোনাকে আরও উঁচু থেকে দেখা যায়। দিনের আলোয় এক ধরনের সৌন্দর্য, আর সন্ধ্যার পর আলো জ্বলে উঠলে তৈরি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহ। চাকার একটি কেবিন যখন ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে, তখন মনে হয় শহরটি আরও নিচে নেমে যাচ্ছে। চারপাশে পাহাড়ি বাতাস, সামনে শহর আর দূরে সমুদ্র, এই অভিজ্ঞতা তিবিদাবো ভ্রমণকে নিছক দর্শনীয় স্থান দেখা থেকে আলাদা করে দেয়।
তিবিদাবোর আরেক ঐতিহাসিক আকর্ষণ তালাইয়া। ১৯২১ সাল থেকে এটি দর্শনার্থীদের ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক দৃশ্য দেখিয়ে আসছে। প্রায় ৫৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই আকর্ষণকে শহরের ওপর একটি বিশাল বারান্দার সঙ্গে তুলনা করা যায়। এখান থেকে শহর, সমুদ্র এবং কোলসেরোলা এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসঙ্গে দেখা যায়।
তালাইয়ায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালে শহরের ব্যস্ততা আর তেমন ব্যস্ত মনে হয় না। গাড়ির সারি, মানুষের চলাচল, সবই দূরের কোনো দৃশ্যের অংশ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলে বোঝা যায়, ভ্রমণের আনন্দ কখনো কখনো কোনো রাইডে নয়; একটি দৃশ্যের সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।
তিবিদাবোর সবচেয়ে আইকনিক আকর্ষণগুলোর একটি আভিও বিমান। এটি ১৯২৭ সালে বার্সেলোনা-মাদ্রিদ রুটে উড়ে যাওয়া প্রথম বিমানের প্রতিরূপ। তিবিদাবোর তথ্য অনুযায়ী, এটিকে ইতিহাসের প্রথম ফ্লাইট সিমুলেটর হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়। এর নিজস্ব প্রপেলার আছে এবং ভেতরে ঐতিহাসিক কিছু উপাদানও সংরক্ষিত আছে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে একটি বিমানের ভেতরে বসা, অভিজ্ঞতাটি নিঃসন্দেহে আলাদা। চারদিকে শহর, নিচে ভূমধ্যসাগর আর সামনে আকাশ। মনে হয়, তিবিদাবো যেন একই সঙ্গে ইতিহাস ও ভবিষ্যতের গল্প বলছে।
আরও পড়ুন
কোটলার জিনের মসজিদে নামাজ পড়তে হয় টিকিট কেটে
তিবিদাবোর ক্যারোসেল ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে। ১৯৮৯ সালে চালু হওয়া ক্যারোসেলটি ঘোড়া ও সাজানো গাড়ির মাধ্যমে এক ধরনের রূপকথার পরিবেশ তৈরি করে। এর হাতে আঁকা নকশায় তিবিদাবো ও বার্সেলোনার বিভিন্ন প্রতীক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাই তিবিদাবো শুধু শিশুদের বিনোদনের জায়গা নয়। বড়দের কাছেও এটি শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার মতো একটি স্থান।
পাহাড় চূড়ার অন্যতম পরিচিত স্থাপনা টেম্পল এক্সপিয়াটোরি দেল সাগরত কোর স্যাক্রেড হার্টের গির্জা। দূর থেকেই এর উপস্থিতি পাহাড়টির দৃশ্যপটকে আলাদা করে চেনায়। বিনোদন পার্কের কোলাহলের পাশেই ধর্মীয় স্থাপত্যের গাম্ভীর্য এবং চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ। এই বৈপরীত্য তিবিদাবোর বিশেষ আকর্ষণ। চূড়ার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তাই একসময় রোমাঞ্চ, আবার পরক্ষণেই নীরবতা। কোথাও মানুষের হাসি, কোথাও ক্যামেরার ক্লিক, কোথাও আবার পাহাড়ি বাতাসের শব্দ।
তিবিদাবোর প্যানোরামিক এরিয়ার একটি বড় সুবিধা হলো প্রবেশ বিনামূল্যে। তবে ঐতিহাসিক রাইডগুলোতে উঠতে আলাদা টিকিট প্রয়োজন। পৃথক আকর্ষণের টিকিটের দাম বর্তমানে ৪ ইউরো থেকে শুরু। আর নিচের শহর থেকে ফানিকুলারে চড়ে আসা যাওয়া করতে খরচ করতে হবে ২৩ ইউরো। এ ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থাও আছে। যদিও এটি গুগল ম্যাপে আসে না। বার্সেলোনা কাতালোনিয়া মেট্রো স্টেশন থেকে পেউ দেল ফুনিকুলার পর্যন্ত এফজিসি এস১ বা এস২ ট্রেন যায়। সেখান থেকে ভ্যালভিদ্রেরা ফুনিকুলার বদল করে ১১১ নাম্বার মাইক্রোবাস ধরে সরাসরি চূড়ায় পৌঁছানো যায়। মেট্রো, এফজিসি ও বাসের জন্য নিয়মিত টিইউজিয়াল কার্ড বা পর্যটক ট্রান্সপোর্ট কার্ড থাকলেই চলবে।
তিবিদাবো ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় সময় হতে পারে বিকেল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের রং বদলাতে থাকে। দিনের উজ্জ্বল সাদা-ধূসর ভবনগুলো ধীরে ধীরে সোনালি আলোয় রাঙা হয়। সমুদ্রের ওপর আলো পড়ে তৈরি করে দীর্ঘ ঝিলিক। আর তখনই বোঝা যায়, কেন তিবিদাবোকে শুধু একটি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক বা পাহাড়ি দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেখা যায় না। এটি আসলে বার্সেলোনাকে অনুভব করার ভিন্ন জানালা। কোথাও দেখা যায় আলো-ছায়ার খেলা। শহরের কোথাও রোদ আবার কোথাও মেঘে ডাকা ছায়া। ফুটবলের শহর বার্সেলোনাকে রাস্তা কিংবা অলিগলিতে দেখে যখন অনুভব করা যায় না; তখন অনুভব করতে হয় আকাশের কাছাকাছি উঠে।
এসইউ
বিজ্ঞাপন