বিজ্ঞাপন
(পূর্ব প্রকাশের পর- পর্ব ১৫)
ষাটের দশকে ডাকসু, বিভিন্ন হল, বিভাগীয় সংসদ অথবা শ্রেণি-প্রতিনিধি বাছাই করার নিমিত্তে নির্বাচন হতো। এই পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল, যা আজকাল বিলুপ্তই বলা চলে। তা হচ্ছে, সংসদের বিভিন্ন পদে, বিশেষত ভিপি-জিএস পদে, কোন ছাত্র সংগঠন কত বেশি মেধাবীকে মনোনয়ন দিতে পারে, তার একটি প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা। এবং মেধার বিচার শুধু লেখাপড়ার মাপে নয়—বাগ্মিতা, আচার-আচরণ, আদর্শ ইত্যাদি সব মিলে। এতে করে ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের ছাত্ররাজনীতিতে জায়গা পাওয়ার অপার সম্ভাবনা থাকত এবং ইতিহাস বলে, সেই সময়টায় ছাত্ররাজনীতির মুকুট ছিল মেধাবীদের মাথায়। গ্রেশামসের বিখ্যাত সূত্র উল্টিয়ে বললে অবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল এমন যে, ভালো ছাত্র খারাপ ছাত্রকে রাজনীতির নেতৃত্ব থেকে বের করে দিত। এই ‘ট্যালেন্ট হান্ট’-এর দৌড়ে এমনকি তৎকালীন সরকার-সমর্থিত ছাত্র সংগঠন এনএসএফও বাদ ছিল না।
বস্তুত, আমাদের জানাশোনার মধ্যে অনেক মেধাবীকে এনএসএফ করতে দেখেছি। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, আইয়ুব স্বৈরশাসকের সেই জমানায়ও সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বেশ কটি হলের নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো।
মনে পড়ে, মুহসিন হলে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের ছাত্র খন্দকার মোশাররফ হোসেন (পরবর্তীতে বিএনপির মন্ত্রী ও নেতা)। তিনি এনএসএফের প্রার্থী মোমতাজ উদ্দিনকে পরাজিত করেন (পরবর্তীতে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ)। রোকেয়া হলের ভিপি ছিলেন আয়েশা খানম এবং ইকবাল হলের তোফায়েল আহমেদ। অবিসংবাদিত নেতা তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ডাকসুর সহ-সভাপতি। সেই হিসেবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক এবং ঊনসত্তরের গণজাগরণের অন্যতম প্রধান নায়ক। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের জেরে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সবাইকে জেল থেকে মুক্তি দিতে সরকার বাধ্য হয়। সেই সময় তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত জনসভায় তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি অর্পণ করেন।
তখনকার দিনে ইকবাল হল ছিল ছাত্রলীগ নামে সংগঠনটির দুর্জয় ঘাঁটি। শুনতাম সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব, নূর এ আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজ ইত্যাদি নেতার সংগ্রামী আলেখ্য; এস এম হল মূলত বামপন্থীদের এবং অন্যান্য হলে এনএসএফ কিংবা মিশ্র।
অবশ্য, সময়ের আবর্তনে এবং বাস্তবতার নিরিখে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ন্যায্য দাবির প্রতি বেশ কিছু এনএসএফ সমর্থক একাত্মতা প্রকাশ করেছিল। সম্ভবত ১৯৬৮ সালে এনএসএফ বিভক্ত হয়। একদিকে মাহবুবুল হক দোলন, অন্যদিকে জমির আলী। মাহবুবুল হক দোলনের পথ ধরে জিন্নাহ হলের নাজিম কামরান চৌধুরী, বদিউল আলম, লুতফর রহমান চৌধুরী এবং অনেকেই এনএসএফের তাবু ত্যাগ করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
যাই হোক, এমএ ক্লাসে উঠে শ খানেক ছাত্রছাত্রীর সরাসরি ভোটে আমি শ্রেণি প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলাম। এর ফলে নানা প্রয়োজনে বিভাগের তৎকালীন সভাপতি এম এন হুদা এবং অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক শানিত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে হলে উঠলাম। দীর্ঘ নয় মাস বিচ্ছেদের পর বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও আলিঙ্গনের মাধ্যমে। প্রাপ্তি এবং হারানো—উভয় কারণেই অশ্রুসিক্ত উভয় পক্ষ। সবার কামনায় তখন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্যবাদী এক বাংলাদেশ। এরই মধ্যে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী)-এর এক নেতার রুমে গেলাম সৌজন্য সাক্ষাতে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে হলে উঠলাম। দীর্ঘ নয় মাস বিচ্ছেদের পর বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও আলিঙ্গনের মাধ্যমে। প্রাপ্তি এবং হারানো—উভয় কারণেই অশ্রুসিক্ত উভয় পক্ষ। সবার কামনায় তখন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্যবাদী এক বাংলাদেশ।
দেখি, পড়ার টেবিলে বিএলএফ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের জন্য এক গাদা সনদপত্র রাখা আছে। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘নেবে নাকি একটা, নাও না।’ আমি বললাম, ‘না, আমার আগ্রহ নেই, কারণ মুক্তিযুদ্ধে আমি সরাসরি অংশগ্রহণ করিনি।’ পরে জেনেছি, তাঁর কাছ থেকে সনদপত্র নিয়েছে অনেকে, যারা বহাল তবিয়তে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের ভেতরেই ছিল।
একটা নজিরবিহীন ঘটনার উল্লেখ করতেই হয়। আমি প্রায়ই প্রতিবেশী হল জিন্নাহ হলে যেতাম আমার অত্যন্ত প্রিয় এক ঝাঁক ‘বড় ভাই’-এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। মাঝেমধ্যে আলাপচারিতায় উঠে আসত বদিউল আলম নামে অর্থনীতি বিভাগের আমাদের এক বছরের সিনিয়র ছাত্রের প্রসঙ্গ। উনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে স্ট্যান্ড করা, এনএসএফের ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয় ফ্রন্টেই ‘লড়াকু’ কর্মী ছিলেন।
১৯৭২ সালে হলে ফিরে এসে অনেকের মধ্যে তাঁর খবরও নিলাম। শোনা যায়, সেই বদির জীবন পাল্টে দিয়েছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং বিশেষত ২৫ মার্চের ভয়াল রাত্রি। সব পরিত্যাগ করে তিনি মুক্তিবাহিনীর ‘ক্র্যাক প্লাটুনে’ যোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় কয়েকটি অবিস্মরণীয় অপারেশন চালানোর পর একদিন অস্ত্র হাতে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। অস্ত্রের উৎস বের করতে তাঁর ওপর প্রবল নির্যাতন চালালে বদি মৃত্যুবরণ করেছিলেন বটে, কিন্তু মুখ থেকে একটা কথাও বের করেননি।
সেই থেকে তিনি ‘শহীদ বদি’—হাইকোর্ট-সংলগ্ন একটি রাস্তা যার নামে রাখা—মরণোত্তর বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত।
মুহসিন হল থেকে বেশ কয়েকজন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, যার মধ্যে এম সাঈদ (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) এবং আবদুর রউফ (পরবর্তীতে কর্নেল) অন্যতম।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ১৯৭২ সালটি ছিল নানান দিক থেকে ঘটনাবহুল, তাৎপর্যপূর্ণ, আলোচনা ও সমালোচনামুখর। পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লন্ডন থেকে নয়াদিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পৌঁছান। লাখ লাখ সাধারণ মানুষ তাঁকে অশ্রুসিক্ত ও আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেয়। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে তিনি এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন ভাষণ দেন।
এই বছরেই শেষের দিকে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ধারণ করে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্য প্রথম সংবিধান রচিত হয়। ১৯৭২ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয়করণ কর্মসূচির আওতায় ব্যাংক, বিমা এবং শিল্প ইউনিটসহ প্রায় ৯০ ভাগ সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়।
এর প্রথম কারণ হিসেবে বলা হতো তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য এবং দ্বিতীয় কারণ, এগুলো চালানোর মতো শক্তিশালী ব্যক্তি খাত, বিশেষত পাকিস্তানি উদ্যোক্তাদের প্রস্থানের পর, তখনকার বাংলাদেশে ছিল না। তবে এ সমস্ত ইউনিট পরিচালনায় যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ ছিল দলীয় রাজনৈতিক কর্মী এবং অচিরেই এদের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ উঠতে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে শিল্পকারখানাগুলো অচিরেই রুগ্ণ হওয়ার পথ ধরে।
১৯৭২ সালে গঠিত হয় জাতীয় রক্ষীবাহিনী। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালান রোধ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রতিনিধিরা—এমনকি আমার নিজ এলাকা মতলব উত্তরেও—গণসংযোগ করতেন সশস্ত্র রক্ষীবাহিনীর সদস্য সঙ্গে নিয়ে।
অভিযোগ ছিল যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করা হতো। সেই সময়কার সরকারবিরোধী পক্ষ মনে করত, তাদের অনেক রাজনৈতিক কর্মী রক্ষীবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত বা গুম হয়েছিল এবং সারা দেশে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে।
অপরদিকে, ১৯৭২ সালে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সশস্ত্র গণবাহিনী এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্ম নেওয়া সিরাজ শিকদারের ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’র সশস্ত্র সদস্যদের হাতেও অনেক মানুষ, বিশেষত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, নিগৃহীত বা নিহত হওয়ার খবর চাউর ছিল। সরকারি পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ উঠল যে, বস্তুত এই দুই দলের লক্ষ্য ছিল অস্ত্রশক্তির মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। একদিকে সরকারি রক্ষীবাহিনী এবং অন্যদিকে বেসরকারি গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সাঁড়াশি আক্রমণে সাধারণ জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে অবকাঠামোগত পুনর্গঠন, খাদ্য ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অস্ত্রের ঝনঝনানি দেশটির স্থিতিশীলতার পক্ষে অন্তরায় হয়ে উঠেছিল।
(চলবে)
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীনরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন