বিজ্ঞাপন
বিদ্যুৎ চলে গেছে। ঘরে ছোট্ট একটি শিশুর কান্না, রান্নাঘরে থেমে গেছে চুলা, গরমে হাঁসফাঁস করছেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সমস্যাটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি নয়—মিটারে টাকা নেই। টাকা আছে, কিন্তু রিচার্জের পর পাওয়া দীর্ঘ টোকেন মিটারে ঢোকানো যাচ্ছে না। কোথাও আবার সার্ভার ডাউন, কোথাও মিটারের কারিগরি ত্রুটি, কোথাও ব্যাটারি শেষ। গ্রাহকের কাছে তখন ‘ডিজিটাল’ বিদ্যুৎব্যবস্থা হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য গোলকধাঁধা।
প্রি-পেইড মিটার চালুর মূল দর্শন ছিল উল্টো। গ্রাহক আগে টাকা দেবেন, পরে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন; বিল নিয়ে ঝামেলা থাকবে না, ভুল বিলের অভিযোগ থাকবে না, বিদ্যুৎ কোম্পানির বকেয়া কমবে, অপচয় ও অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণে আসবে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যও বলছে, প্রি-পেইড মিটারের উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহকের সুবিধা বাড়ানো, বিলিং-সংক্রান্ত জটিলতা কমানো এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, প্রযুক্তি নিজে কখনো গ্রাহকবান্ধব হয় না; তাকে গ্রাহকবান্ধব করে তুলতে হয়। আর বাংলাদেশের প্রি-পেইড মিটার ব্যবস্থায় সেই জায়গাটিতেই যেন সবচেয়ে বড় ঘাটতি।
৯ সেপ্টেম্বর ‘বিদ্যুৎ গ্রাহক অধিকার রক্ষা জাতীয় কমিটি’ প্রি-পেইড মিটার বাতিল করে আগের ডিজিটাল মিটার পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ—মিটার চার্জ, ডিমান্ড চার্জ, সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাটসহ নানা ধরনের অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে; মিটার নষ্ট হওয়া, ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়া, সার্ভার ডাউন, কারিগরি ত্রুটি কিংবা রিচার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে গ্রাহককে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, বিদ্যমান ডিজিটাল মিটার বদলে নতুন মিটার বসাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। প্রি-পেইড মিটার মানেই বেশি বিদ্যুৎ বিল—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রি-পেইড ও পোস্ট-পেইড—দুই ব্যবস্থাতেই অনুমোদিত ট্যারিফ একই; মূল পার্থক্য হলো কখন এবং কীভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ডিমান্ড চার্জ ও অন্যান্য নির্ধারিত চার্জও নির্দিষ্ট নিয়মে উভয় ব্যবস্থায় প্রযোজ্য।
সমস্যা হচ্ছে, গ্রাহকের কাছে হিসাবটি স্বচ্ছ নয়। পোস্ট-পেইড ব্যবস্থায় হাতে একটি বিল আসে। সেখানে কত ইউনিট ব্যবহার হয়েছে, কোন হারে দাম পড়েছে, কী কী চার্জ যুক্ত হয়েছে—সবকিছুর একটি দৃশ্যমান হিসাব থাকে। প্রি-পেইড ব্যবস্থায় গ্রাহক রিচার্জ করেন, তারপর ব্যালেন্স কমতে থাকে। কিন্তু কেন কত টাকা কমল, কোন খাতে কত কাটা হলো—তা অনেক গ্রাহকের কাছেই দুর্বোধ্য থেকে যায়। ফলে প্রযুক্তি যত আধুনিক হচ্ছে, সন্দেহও তত বাড়ছে।
সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে। জুনে নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার পর অনেক প্রি-পেইড গ্রাহক ২০০ বা তারও বেশি অঙ্কের টোকেন পেয়েছেন। বিদ্যুৎ বিভাগও এ ধরনের টোকেনের বিষয়টি স্বীকার করে গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানির নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলেছিল।
ভাবা যায়, একজন সাধারণ মানুষকে মোবাইলে পাওয়া প্রায় ২০০ অঙ্কের একটি কোড হাতে নিয়ে মিটারের বোতামে একের পর এক সংখ্যা চাপতে হচ্ছে! সামান্য ভুল হলেই আবার শুরু। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমনও এসেছে, দীর্ঘ টোকেন প্রবেশ করাতে গিয়ে কোথাও কোথাও মিটার লক হয়েছে এবং গ্রাহককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে।
প্রি-পেইড মিটার থাকবে কি থাকবে না, সেই সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় প্রশ্ন তাই অন্যটি: রাষ্ট্রের বিদ্যুৎব্যবস্থা কি গ্রাহকের জন্য, নাকি গ্রাহকই বিদ্যুৎব্যবস্থার জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর বদলাতে না পারলে মিটার বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, সফটওয়্যার বদলাবে—কিন্তু ভোগান্তির গল্প বদলাবে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি প্রযুক্তি যদি মানুষের সময় বাঁচানোর বদলে সময় খায়, স্বস্তির বদলে উৎকণ্ঠা তৈরি করে, তাহলে সেটিকে আধুনিক বলা যাবে কীভাবে? প্রি-পেইড মিটারের বিরুদ্ধে ওঠা ক্ষোভের আরেকটি বড় কারণ হলো চার্জ নিয়ে বিভ্রান্তি। মার্চে বিদ্যুৎমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, প্রি-পেইড মিটারের মাসিক ভাড়া বা মিটার চার্জ প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু জুলাইয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানায়, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা নির্দেশনা আসেনি। ফলে বাস্তবে চার্জ বহাল থাকে।
এ ধরনের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক গ্রাহকের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সরকার যদি কোনো চার্জ প্রত্যাহার করতে চায়, তাহলে তা কবে থেকে, কার ক্ষেত্রে, কীভাবে কার্যকর হবে—সেটি স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। ‘হবে’ আর ‘হয়েছে’—এই দুইয়ের মাঝখানে গ্রাহকের পকেট থেকে টাকা কাটা চলতে পারে না।
আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। মিটার ভাড়া পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে বলে সরকার জানিয়েছে। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, মিটার ভাড়া পুরোপুরি মওকুফ করতে ২৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন।
অতএব, বিষয়টি কেবল ‘ভাড়া নেব কি নেব না’—এমন আবেগনির্ভর সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। দরকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব। মিটারের ক্রয়মূল্য কত, স্থাপন ব্যয় কত, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কত, কত বছরে বিনিয়োগ উঠে এসেছে—এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। কোনো মিটারের মূল্য আদায় হয়ে যাওয়ার পরও যদি বছরের পর বছর ভাড়া নেওয়া হয়, তাহলে তার যৌক্তিকতাও ব্যাখ্যা করতে হবে।
প্রি-পেইড মিটারের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল—বিদ্যুৎ কোম্পানির বকেয়া কমবে। কিন্তু এখন বিদ্যুৎ খাতে বিপুল বকেয়ার কথাও সামনে এসেছে। গ্রাহক অধিকার সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৬ হলেও সংকট ও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠতেই পারে—প্রযুক্তি যদি রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার জন্য এত কার্যকর হয়, তাহলে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা কেন এত দুর্বল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু মিটার নয়, পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে দেখতে হবে। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি আমদানি, কেন্দ্রগুলোর চুক্তি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা, সিস্টেম লস, বকেয়া, ভর্তুকি—সবকিছুর সমন্বিত হিসাব জনগণের সামনে আনতে হবে। মিটারের ওপর চাপ দিয়ে একটি দুর্বল ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যায় না।
তবে সমাধান প্রি-পেইড মিটার পুরোপুরি বাতিল করাই—এমন সিদ্ধান্তেও এখনই যাওয়া উচিত নয়। পৃথিবীর বহু দেশে স্মার্ট মিটার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগও বলছে, স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারের মাধ্যমে সঠিক বিলিং, স্বয়ংক্রিয় সংযোগ-বিচ্ছিন্নকরণ, লোড ব্যবস্থাপনা, জরুরি ব্যালেন্স এবং রিমোট ডেটা ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়।
কাজেই প্রশ্নটি ‘প্রি-পেইড মিটার থাকবে কি থাকবে না’—এখানে আটকে থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেমন প্রি-পেইড মিটার চাই? চাই এমন মিটার, যার ব্যালেন্স গ্রাহক সহজেই বুঝতে পারবেন। চাই এমন ব্যবস্থা, যেখানে রিচার্জের পর ২০০ অঙ্কের কোড মুখস্থ বা হাতে চাপতে হবে না। চাই মোবাইল অ্যাপ বা এসএমএসে পরিষ্কারভাবে জানানো হবে—রিচার্জের কত টাকা বিদ্যুৎ ব্যবহারে গেল, কত টাকা ডিমান্ড চার্জ, কত টাকা ভ্যাট, কত টাকা অন্য কোনো খাতে কাটা হলো। চাই সার্ভার বন্ধ থাকলেও জরুরি বিদ্যুৎ পাওয়ার ব্যবস্থা। চাই রাত, ছুটির দিন কিংবা দুর্যোগের সময় গ্রাহককে অসহায় করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি বিতরণ কোম্পানিতে একটি কার্যকর গ্রাহক ক্ষতিপূরণ নীতি থাকতে হবে। মিটারের ত্রুটি বা বিতরণ কোম্পানির সার্ভার সমস্যার কারণে কোনো পরিবার বিদ্যুৎবিহীন হলে দায় গ্রাহকের ওপর চাপানো যাবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হলে স্বয়ংক্রিয় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির হটলাইন থাকলেও অভিযোগ গ্রহণ আর কার্যকর সমাধান—দুটিকে এক করে দেখতে হবে। সাম্প্রতিক অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ডিপিডিসি গ্রাহকদের ১৬১১৬ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেছে।
বিদ্যুৎ শুধু একটি পণ্য নয়; আধুনিক জীবনে এটি মৌলিক সেবা। একজন নাগরিকের ঘরে আলো, পাখা, ফ্রিজ, চিকিৎসা-সরঞ্জাম কিংবা অনলাইন কাজ—সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যুৎ জড়িয়ে আছে। তাই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ‘গ্রাহক’ শব্দটির অর্থ শুধু টাকা পরিশোধকারী ব্যক্তি নয়; তিনি রাষ্ট্রীয় সেবার অধিকারী নাগরিক।
প্রি-পেইড মিটারের আসল পরীক্ষা তাই প্রযুক্তির জটিলতা নয়, মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো—সেটি। যে মিটার গ্রাহককে হিসাবের স্বচ্ছতা দেয়, অপচয় কমায়, বিল নিয়ে বিরোধ কমায় এবং সহজে রিচার্জের সুযোগ দেয়, সেটি অবশ্যই রাখা যেতে পারে। কিন্তু যে মিটার সার্ভার ডাউনে অন্ধকার করে, দীর্ঘ টোকেনে মানুষকে বিপাকে ফেলে, চার্জের হিসাব বুঝতে দেয় না এবং সমস্যায় পড়লে গ্রাহককে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘোরায়, সেটি যত আধুনিকই হোক, জনবান্ধব নয়।
সরকারের উচিত এখনই একটি স্বাধীন প্রি-পেইড মিটার অডিট ও গ্রাহক সন্তুষ্টি জরিপ করা। কোন কোম্পানির মিটারে কত অভিযোগ, কত সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়, কত মিটার নষ্ট হয়, কতবার সার্ভার সমস্যা হয়, কত টাকা কোন খাতে কাটা হয়—সব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। এরপর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ মানুষের ঘরে আলো জ্বালানোর প্রযুক্তি যদি মানুষের চোখেই অন্ধকার তৈরি করে, তবে সেই প্রযুক্তিকে নতুন করে ভাবতেই হবে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন দরকার, নিঃসন্দেহে। কিন্তু আধুনিকায়নের প্রথম শর্তই হলো—মানুষকে কেন্দ্রে রাখা।
প্রি-পেইড মিটার থাকবে কি থাকবে না, সেই সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় প্রশ্ন তাই অন্যটি: রাষ্ট্রের বিদ্যুৎব্যবস্থা কি গ্রাহকের জন্য, নাকি গ্রাহকই বিদ্যুৎব্যবস্থার জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর বদলাতে না পারলে মিটার বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, সফটওয়্যার বদলাবে—কিন্তু ভোগান্তির গল্প বদলাবে না।
আর নাগরিকের ঘরে আলো জ্বালানোর নামে যদি প্রতিদিন তার মনে নতুন অন্ধকার জমে, তবে সেই আলোকে উন্নয়নের আলো বলা কঠিন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন