বিজ্ঞাপন
হঠাৎ একটি লেখা পড়ে আঁতকে উঠলাম। শিশু-কিশোরেরা কি ক্রমেই কম মেধাবী হয়ে উঠছে? সঙ্গে দেওয়া রেখাচিত্রটি আরও ভাবিয়ে তুলল। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে উন্নত বিশ্বের বহু দেশে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতার সূচক নিচের দিকে নামছে। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল পড়ার দক্ষতার রেখাটি। সেটির পতন বেশ স্পষ্ট। প্রথমেই মনে হলো এটা কী করে সম্ভব?
আজকের শিশু-কিশোরেরা আমাদের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তথ্যের নাগাল পায়। তাদের হাতে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ইউটিউব, ডিজিটাল লাইব্রেরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে এখন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের পাতা ওল্টাতে হয় না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জ্ঞানের দরজা খুলে যায়।
তাহলে জ্ঞান এত সহজলভ্য হওয়ার পরও শেখার দক্ষতা কমছে কেন? কৌতূহল থেকেই আমি তথ্যটির মূল উৎস খুঁজতে শুরু করলাম। তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এই ফলাফল প্রমাণ করে না যে, আজকের শিশু-কিশোরেরা জন্মগতভাবে আগের প্রজন্মের চেয়ে কম বুদ্ধিমান হয়ে যাচ্ছে। একজন ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী যা শিখেছে, তা কতটা বুঝতে পারে এবং বাস্তব জীবনের সমস্যায় সেই জ্ঞান কতটা কাজে লাগাতে পারে।
মূলত একটি লেখা পড়ে শিক্ষার্থী তার অর্থ বুঝতে পারছে কি না, তথ্য বিচার করতে পারছে কি না, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না কিংবা গণিত ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারছে কি না- এসবের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এখানেই উদ্বেগের জায়গাটি তৈরি হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে পড়ার দক্ষতা। তিনটি বিষয়ের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে পড়ার দক্ষতার পতন। কারণ পড়া কোনো একটি বিষয়ের দক্ষতা নয়। এটি অন্য প্রায় সব ধরনের শিক্ষার দরজা। একটি গণিতের সমস্যা সমাধানের আগে প্রশ্নটি বুঝতে হয়। বিজ্ঞানের একটি জটিল ধারণা আয়ত্ত করতে হলে সেটি মন দিয়ে পড়তে হয়। ইতিহাস বুঝতে পড়তে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে হলে দীর্ঘ গবেষণাপত্র পড়তে হয়। কর্মজীবনে প্রতিবেদন বুঝতেও পড়তে হয়।
এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সত্য ও মিথ্যা তথ্যের পার্থক্য বুঝতেও প্রয়োজন পড়া, বোঝা এবং বিচার করার ক্ষমতা। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি কেড়েছে; তাড়াহুড়ো করে পড়া। অর্থাৎ শিক্ষার্থী লেখা পড়ছে ঠিকই, কিন্তু গভীরভাবে বুঝে পড়ার বদলে দ্রুত চোখ বুলিয়ে উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। ২০১৮ সালের তুলনায় এমন তাড়াহুড়ো করে পড়া শিক্ষার্থীর হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
প্রথমে মনে হতে পারে, এর উত্তর খুব সহজ; করোনা মহামারি। মহামারির সময় দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ ছিল। কোটি কোটি শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব শিক্ষায় পড়েছে।
অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের নিম্নমুখী প্রবণতা করোনার আগেই শুরু হয়েছিল। বিজ্ঞানের ফলাফল প্রায় ২০০৯ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে কমছিল। পড়ার ফলাফল সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল প্রায় ২০১২ সালের দিকে, তারপর থেকে সেটিও নিচের দিকে যেতে শুরু করে। গণিতের বড় পতন দেখা যায় ২০১৮ সালের পর। আর করোনা-পরবর্তী সময়েও সমস্যাটি থামেনি। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিজ্ঞানের গড় ফলাফল মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও গণিতে আরও ৯ পয়েন্ট এবং পড়ায় ১৪ পয়েন্ট কমেছে। অর্থাৎ করোনার ধাক্কা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই পুরো গল্প নয়।
তবে কি স্মার্টফোন আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে? এখানেই আসে প্রযুক্তির প্রশ্ন। আজকের একজন শিশু-কিশোরের মনোযোগের জন্য যত কিছু প্রতিযোগিতা করছে, সম্ভবত মানব ইতিহাসে কোনো প্রজন্মকে এত কিছুর মুখোমুখি হতে হয়নি। স্মার্টফোনে একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি প্রস্তুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টের পর আরেকটি। নোটিফিকেশন আসছে, বার্তা আসছে। গেম আছে, রিলস আছে, শর্ট ভিডিও আছে। এই পরিবেশে দশ মিনিটের একটি ভিডিও কখনো দীর্ঘ মনে হয়। সেখানে একটি বই নিয়ে এক ঘণ্টা বসে থাকা আরও কঠিন।
কিন্তু সরাসরি বলা যাবে না যে, স্মার্টফোনই শিক্ষার অবনতির একমাত্র কারণ। একই সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষায় দলীয়করণ, পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, পড়ার অভ্যাস এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সম্পৃক্ততা; সবকিছুই ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। সমস্যাটি প্রযুক্তির ব্যবহার।
আরও পড়ুন
শিশুর লেখাপড়ার হাতেখড়িতে মায়ের করণীয়
এই আলোচনায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একজন শিক্ষার্থী আগে একটি রচনা লিখতে বসলে তাকে ভাবতে হতো। তথ্য খুঁজতে হতো। প্রথম বাক্যটি কী হবে, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হতো। লিখতে গিয়ে ভুল হতো। সেই ভুল কাটিয়ে আবার লিখতে হতো। এই কষ্টটুকুই আসলে শেখার একটি অংশ। এখন এআইকে নির্দেশ দিলে কয়েক সেকেন্ডে সুন্দর একটি রচনা পাওয়া সম্ভব।
এটি অসাধারণ প্রযুক্তিগত অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও তৈরি করে; শিক্ষার্থী যদি প্রতিবার চিন্তা করার কঠিন অংশটুকু যন্ত্রের হাতে তুলে দেয়, তাহলে তার নিজের চিন্তার ক্ষমতার অনুশীলন হবে কখন? যেসব শিক্ষার্থী লেখার কাজের খসড়া তৈরিতে এআই ব্যবহার করেনি, তারা গড়ে এআই ব্যবহারকারীদের তুলনায় বিজ্ঞানে ভালো করেছে। নিয়মিত এআই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা এআইকে শেখার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং এআই থেকে পাওয়া তথ্যের মান যাচাই করতে শেখানো হয়েছে, তাদের ফলাফল তুলনামূলক ভালো ছিল।
সুতরাং এআইকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং আমাদের শিখতে হবে; এআই দিয়ে কীভাবে চিন্তা করতে হয়, এআইকে দিয়ে কীভাবে চিন্তা করিয়ে নিতে হয় না। তাহলে বইয়ের কাছে কি আবার ফিরতে হবে? আমার মনে হয়, উত্তরটি অনেকাংশে হ্যাঁ। তবে তার অর্থ প্রযুক্তি ছেড়ে আবার শুধু কাগজের যুগে ফিরে যাওয়া নয়। আমাদের ফিরতে হবে গভীরভাবে পড়ার অভ্যাসে।
একটি দীর্ঘ লেখা পড়লে মস্তিষ্ককে আগের অনুচ্ছেদের তথ্য মনে রাখতে হয়। একটি যুক্তির সঙ্গে আরেকটি যুক্তি মেলাতে হয়। লেখকের বক্তব্য নিয়ে ভাবতে হয়। কোথাও দ্বিমত হলে নিজের যুক্তি তৈরি করতে হয়। এটি সময় নেয়। আর আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী আমাদের ক্রমাগত শেখাচ্ছে; সময় নিও না, দ্রুত পরেরটিতে চলে যাও। সম্ভবত এখানেই দ্বন্দ্ব। জ্ঞান অর্জনের জন্য গভীরতা প্রয়োজন, কিন্তু ডিজিটাল জৌলুস আমাদের মনোযোগকে ছোট ছোট টুকরোয় ভাগ করে ফেলতে চায়।
আশার কথাও আছে, সব দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে না। অংশগ্রহণকারী চীনা অঞ্চল ও সিঙ্গাপুর ২০২৫ সালে তিনটি মূল বিষয়েই সর্বোচ্চ ফলাফলকারী শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে। এস্তোনিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চাইনিজ তাইপে ও যুক্তরাজ্যও বিজ্ঞান, গণিত ও পড়া; তিন ক্ষেত্রেই শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে। কিছু দেশ আবার গত এক দশকে উন্নতিও করেছে। তার অর্থ, পতনটি অনিবার্য নয়।
তবে বাংলাদেশের জন্যও বার্তা আছে। আমাদের শিশুর হাতেও স্মার্টফোন পৌঁছেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, রিলস, গেম এবং এখন এআই তাদের জীবনেও উপস্থিত। তাই আমাদেরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার। আমাদের সন্তান প্রতিদিন কতক্ষণ বই পড়ছে? শুধু পরীক্ষার বই নয়; কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, বিজ্ঞান কিংবা নিজের পছন্দের কোনো দীর্ঘ লেখা? সে কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে প্রথমে নিজে ভাবছে, নাকি সঙ্গে সঙ্গে গুগল বা এআইয়ের কাছে যাচ্ছে? সে কোনো তথ্য পেলে যাচাই করছে, নাকি প্রথম উত্তরটিকেই সত্য ধরে নিচ্ছে? স্কুলে আমরা কি শিক্ষার্থীদের শুধু সঠিক উত্তর শেখাচ্ছি, নাকি কোন উত্তরটি সঠিক, সেটিও ভাবতে শেখাচ্ছি? এ প্রশ্নগুলো এখন জরুরি।
এআই নিষিদ্ধ করে এর সমাধান হবে না। স্মার্টফোন কেড়ে নিয়েও স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রযুক্তির সঙ্গে বসবাস করেই নতুন প্রজন্মকে মনোযোগ, ধৈর্য, গভীর পাঠ এবং স্বাধীন চিন্তার অভ্যাস শেখাতে হবে। তাহলে শিশু-কিশোরেরা কি সত্যিই কম মেধাবী হয়ে যাচ্ছে? আমাদের শিশুরা সম্ভবত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া একটি প্রজন্ম। একই সঙ্গে তারা এমন একটি সময়েও বড় হচ্ছে, যখন তাদের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার আয়োজন ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
এটি আমাদের; অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ আমরাই শিশুদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দিয়েছি। এখন আমাদেরই তাদের শেখাতে হবে, কখন স্ক্রিনের দিকে তাকাতে হয় আর কখন স্ক্রিন বন্ধ করতে হয়। কখন এআইয়ের সাহায্য নিতে হয় আর কখন নিজের মাথা খাটাতে হয়। কখন দ্রুত উত্তর প্রয়োজন আর কখন একটি কঠিন প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘসময় ভাবতে হয়। কারণ আগামী পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটি হয়তো সে নয়; যে সবচেয়ে দ্রুত তথ্য খুঁজে বের করতে পারে। বরং সে, যে তথ্যের ভিড়ের মধ্যেও মনোযোগ দিয়ে পড়তে, গভীরভাবে বুঝতে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে।
আরও পড়ুন
স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে যেভাবে মানসিকভাবে প্রস্তুত করবেন
এসইউ
বিজ্ঞাপন