বিজ্ঞাপন
বুলিং হলো কোনো শিশুকে ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার অপমান করা, ভয় দেখানো, মারধর কিংবা হেয় করা, গ্রুপ থেকে বাদ দেওয়া বা সামাজিকভাবে একঘরে করার আচরণ। সাধারণত শারীরিক শক্তি, জনপ্রিয়তা, দলগত প্রভাব কিংবা সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে এখানে ক্ষমতার অসমতা থাকে। অনলাইনেও একই ঘটনা ঘটতে পারে, যাকে সাইবারবুলিং বলা হয়।
শিশুর মানসিক ক্ষতি কীভাবে হয়?
বুলিংয়ের মুখোমুখি হতে থাকলে শিশুর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস কমে যায়। ‘তুই কিছু পারিস না’, ‘তুই দেখতে খারাপ’, ‘তুই বোকা’—এ ধরনের কথা বারবার শুনতে শুনতে সে একসময় এসব কথা সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করতে পারে। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়ে যেতে পারে। আত্মবিশ্বাস ভেঙে যেতে পারে।
ভয় ও উদ্বেগ
স্কুলে যাওয়া, সহপাঠীদের সামনে দাঁড়ানো বা কথা বলার আগে মনে ভয় তৈরি হতে পারে। শিশু সব সময় সতর্ক ও আতঙ্কিত থাকতে পারে।
বিষণ্নতা
দীর্ঘদিন বুলিংয়ের শিকার হতে থাকলে শিশুর মধ্যে মন খারাপ, আগ্রহ কমে যাওয়া, একাকিত্ব, কান্না, হতাশা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বুলিংকে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রফেশনাল হিসেবে আমরাও তার ব্যাপক প্রমাণ পাচ্ছি।
স্কুলে যেতে অনীহা তৈরি হয়
স্কুলকে নিরাপদ জায়গা মনে না করলে শিশু স্কুল ফাঁকি দিতে পারে, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যেতে পারে, ফলাফল খারাপ হতে থাকে।
ইউনেস্কো বলছে, স্কুলের সহিংসতা ও বুলিংয়ের সঙ্গে স্কুলে অনুপস্থিতি, খারাপ ফলাফল এবং স্কুল ছেড়ে দেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়
শিশু মনে করতে পারে, ‘কেউ আমাকে পছন্দ করে না’, ‘আমার কোনো বন্ধু নেই’। চিন্তার এই ত্রুটির কারণে সে পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে।
বুলিংয়ের মুখোমুখি হতে থাকলে শিশুর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস কমে যায়। ‘তুই কিছু পারিস না’, ‘তুই দেখতে খারাপ’, ‘তুই বোকা’—এ ধরনের কথা বারবার শুনতে শুনতে সে একসময় এসব কথা সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করতে পারে। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়ে যেতে পারে। আত্মবিশ্বাস ভেঙে যেতে পারে।
আত্মহত্যার চিন্তা
বুলিংয়ের সবচেয়ে গুরুতর দিকগুলোর একটি হলো আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। গবেষণায় বুলিং ও স্কুল-সহিংসতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মহত্যার চিন্তার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সাইবারবুলিং
সাইবারবুলিং আরও বিপজ্জনক। কেন?
সাধারণ বুলিং অনেক সময় স্কুলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সাইবারবুলিং ঘরে ফেরার পরও শিশুকে ছাড়ে না। অপমানজনক ছবি, ভিডিও বা মন্তব্য মুহূর্তে অনেক মানুষের কাছে ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে শিশুর মনে হতে পারে, তার নিরাপদ কোনো জায়গাই নেই।
WHO Europe-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, *প্রায় ১৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী সাইবারবুলিংয়ের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে; আগের তথ্যের তুলনায় সাইবারবুলিং বেড়েছে।
ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের আপডেটেও বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি মাসে প্রায় তিনজন শিক্ষার্থীর একজন স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হয়।
বাবা-মা কী লক্ষ করবেন?
‘আমাকে বুলিং করা হচ্ছে’—সরাসরি শিশু নাও বলতে পারে। তাই হঠাৎ স্কুলে যেতে না চাওয়া, ঘন ঘন পেটব্যথা/মাথাব্যথার অভিযোগ, ঘুম বা খাওয়ার পরিবর্তন, পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, বন্ধুদের এড়িয়ে চলা, মোবাইল ব্যবহার নিয়ে অস্বাভাবিক ভয় বা অস্বস্তি, নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলা ইত্যাদি পরিবর্তন দেখা গেলে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা দরকার।
কী করা উচিত?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুকে দোষারোপ না করে তার কথা শুনতে হবে, তার বয়সের তরে নেমে এসে।
‘তুমি প্রতিবাদ করলে না কেন?’
‘এতটুকু ব্যাপারে কাঁদছ কেন?’
এ ধরনের কথা বলা যাবে না।
বরং বলতে হবে, ‘তোমার সঙ্গে যা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। তুমি আমাকে বলেছ, এটা খুব ভালো করেছ।’
এরপর অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে।
শুধু আক্রান্ত শিশুকে ‘শক্ত হও’ বললেই সমস্যার সমাধান হয় না; যে পরিবেশে বুলিং হচ্ছে, সেই পরিবেশকেও নিরাপদ করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্কুল, পরিবার ও কমিউনিটিকে নিয়ে সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেয়।
শেষ কথা হলো, বুলিংকে শিশু বেড়ে ওঠার পথে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা চলবে না। গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং প্রাথমিকভাবে তার সমস্যা সমাধান করতে হবে।
তথ্যঋণ: WHO, UNESCO, UNICEF
লেখক: মনোশিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক; সাবেক পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন