জাতীয়

বেশিরভাগ মানুষ গরিব থাকার আসল কারণ

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
আমাদের চারপাশে তাকালে একটা অদ্ভুত বাস্তবতা চোখে পড়ে। একই শহরে, একই সমাজে, প্রায় একই সুযোগ নিয়ে বড় হওয়া দুজন মানুষের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে চলে যায়। একজন সারাজীবন পরিশ্রম করেও আর্থিকভাবে একই জায়গায় আটকে থাকেন, অন্যজন সেই একই পরিস্থিতি থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সচ্ছলতার দিকে এগিয়ে যান। এই পার্থক্যটা দেখে অনেকেই ভাবেন, এটা হয়তো কপালের খেলা, বা কারও ভাগ্যে বেশি সুযোগ জুটেছে। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এর পেছনে কিছু নির্দিষ্ট, বারবার ঘটতে থাকা কারণ কাজ করে, যেগুলো নিয়ে সাধারণত খোলাখুলি আলোচনা হয় না। প্রথম এবং সবচেয়ে সাধারণ কারণটি হলো, আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচও বেড়ে যাওয়া। একজন মানুষ যখন প্রথম চাকরি শুরু করেন, তখন তাঁর চাহিদা সীমিত থাকে। কিন্তু বেতন বাড়তে থাকলে ধীরে ধীরে জীবনযাত্রার মানও বাড়তে থাকে—নতুন ফোন, বড় বাসা, দামি গাড়ি, বাইরে খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস। এই প্রবণতাকে অর্থনীতিতে বলা হয় লাইফস্টাইল ইনফ্লেশন। সমস্যাটা হলো, আয় যত বাড়ে, খরচও প্রায় সমান হারে বেড়ে যায়। ফলে সঞ্চয়ের পরিমাণ কখনোই বাড়ে না। বছরের পর বছর একই অবস্থায় থেকে যাওয়ার এটাই সবচেয়ে বড় কারণ, অথচ এটা এতটাই স্বাভাবিকভাবে ঘটে যে বেশিরভাগ মানুষ নিজেই বুঝতে পারেন না কোথায় ভুল হচ্ছে। দ্বিতীয় কারণটি হলো টাকাকে শুধু খরচ করার একটা মাধ্যম হিসেবে দেখা। বেশিরভাগ মানুষ সারাজীবন পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করেন, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে শুধু প্রয়োজন আর শখ মেটান, বিনিয়োগ করেন না। অথচ প্রকৃত অর্থে সম্পদ তৈরি হয় তখনই, যখন টাকা দিয়ে এমন কিছু কেনা হয়, যা আবার নতুন টাকা তৈরি করে—শেয়ার, ব্যবসা, বা এমন কোনো দক্ষতা, যা ভবিষ্যতে আয় বাড়ায়। শুধু বেতনের ওপর নির্ভর করে জীবন চালালে, সেই আয় যতই বেশি হোক না কেন, প্রকৃত সম্পদ কখনোই গড়ে ওঠে না। কারণ বেতন আসে, আর প্রায় সমান হারে খরচ হয়ে যায়—মাঝখানে সম্পদ তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না। অনেক মানুষ ভেতরে ভেতরে বিশ্বাস করেন, “আমার ভাগ্যে এটাই লেখা আছে”, অথবা “সচ্ছল হওয়া আমার মতো মানুষের জন্য নয়।” এই ধরনের চিন্তাভাবনা মানুষকে নতুন সুযোগ খুঁজতে বাধা দেয়, নতুন কিছু চেষ্টা করার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। অথচ বাস্তবতা হলো, যারা নিজেদের আর্থিক পরিস্থিতি বদলাতে পেরেছেন, তাঁরা সবার আগে নিজেদের চিন্তাভাবনাটাই বদলেছেন। তৃতীয় কারণ হিসেবে আসে আর্থিক শিক্ষার অভাব। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস শেখানো হয়, কিন্তু বাজেট কীভাবে করতে হয়, ঋণ কীভাবে কাজ করে, বিনিয়োগ আসলে কী জিনিস—এই মৌলিক বিষয়গুলো প্রায় কখনোই শেখানো হয় না। ফলে একজন মানুষ যখন প্রথম নিজের আয় নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পান, তখন তাঁর কাছে সঠিক তথ্য বা দিকনির্দেশনা থাকে না। এই অজ্ঞতার সুযোগে অনেকে ভুল সিদ্ধান্ত নেন—অপ্রয়োজনীয় ঋণ নেওয়া, না বুঝে বিনিয়োগ করা, বা সঞ্চয়ের কোনো পরিকল্পনা না রাখা। আর্থিক শিক্ষা না থাকলে ভালো আয় থাকা সত্ত্বেও মানুষ ভুল সিদ্ধান্তের ফাঁদে পড়েন। চতুর্থ কারণটি হলো ঝুঁকি নিতে ভয় পাওয়া। নিরাপদ থাকার প্রবণতা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, কিন্তু অতিরিক্ত নিরাপত্তাপ্রিয়তা অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নতুন কিছু শেখা, নতুন দক্ষতা অর্জন করা, বা একটা ছোট ব্যবসা শুরু করার মতো সিদ্ধান্তে ঝুঁকি থাকে, আর এই ঝুঁকির ভয়ে বেশিরভাগ মানুষ পরিচিত, নিরাপদ পথেই থেকে যান। অথচ যারা জীবনে এগিয়ে যান, তাঁরা অন্ধভাবে ঝুঁকি নেন না—তাঁরা হিসাব করা, পরিকল্পিত ঝুঁকি নিতে শেখেন। ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চেষ্টা করার সাহসটাই তাঁদের অন্যদের থেকে আলাদা করে। পঞ্চম কারণ হলো, শুধুমাত্র সময় বিক্রি করে আয় করার প্রবণতা। বেশিরভাগ মানুষের আয়ের একটাই উৎস থাকে—একটা চাকরি, যেখানে সময়ের বিনিময়ে টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, এক দিনে চব্বিশ ঘণ্টার বেশি কেউ কাজ করতে পারেন না। ফলে এই ধরনের আয়ের একটা স্বাভাবিক সীমা থাকে। যাঁদের একাধিক আয়ের উৎস থাকে—যেমন বিনিয়োগ থেকে আসা মুনাফা, পার্ট-টাইম ব্যবসা, বা কোনো সৃজনশীল কাজ থেকে আসা রয়্যালটি—তাঁরাই সময়ের এই সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে যেতে পারেন। একমুখী আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক অগ্রগতিকে থামিয়ে দেয়। তবে এই সব কারণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর কারণটি হলো মানসিকতা। অনেক মানুষ ভেতরে ভেতরে বিশ্বাস করেন, “আমার ভাগ্যে এটাই লেখা আছে”, অথবা “সচ্ছল হওয়া আমার মতো মানুষের জন্য নয়।” এই ধরনের চিন্তাভাবনা মানুষকে নতুন সুযোগ খুঁজতে বাধা দেয়, নতুন কিছু চেষ্টা করার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। অথচ বাস্তবতা হলো, যারা নিজেদের আর্থিক পরিস্থিতি বদলাতে পেরেছেন, তাঁরা সবার আগে নিজেদের চিন্তাভাবনাটাই বদলেছেন। তাঁরা নিজেদের পরিস্থিতিকে স্থায়ী কিছু হিসেবে না দেখে পরিবর্তনযোগ্য একটা অবস্থা হিসেবে দেখেছেন। সব মিলিয়ে দেখা যায়, গরিব থেকে যাওয়ার পেছনে কোনো একটিমাত্র কারণ কাজ করে না। লাইফস্টাইল ইনফ্লেশন, বিনিয়োগ না করার প্রবণতা, আর্থিক শিক্ষার অভাব, ঝুঁকি নিতে না চাওয়া, একমুখী আয়, আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের সম্পর্কে ভুল বিশ্বাস—এই সবকিছু একসঙ্গে মিলেই একজন মানুষকে বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে রাখে। ভালো খবর হলো, এই প্রতিটি কারণই সচেতনভাবে বদলানো সম্ভব। প্রয়োজন শুধু নিজের অভ্যাস আর চিন্তাভাবনার দিকে সৎভাবে তাকানো, আর আজ থেকেই ছোট ছোট পরিবর্তন শুরু করা। আর্থিক স্বাধীনতা কোনো রাতারাতি ঘটে যাওয়া বিষয় নয়, এটা দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের সমষ্টি—আর সেই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার ক্ষমতা প্রত্যেকের হাতেই আছে। লেখক : করপোরেট ট্রেইনার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস,ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>