বিজ্ঞাপন
মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকার ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তফা মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার জনস্বার্থে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এ লিগ্যাল নোটিশটি পাঠান।
এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব, অর্থ সচিব এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে।
ব্যারিস্টার সারওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জাগো নিউজকে জানান, মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সরকার ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছি।
এক বিজ্ঞপ্তিতে আইনজীবী সারওয়ার জানান, জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যে ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের জন্য একটি চুক্তি করেছে। এই বিশাল অংকের জনসাধারণের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, আর্থিক যৌক্তিকতা, জনস্বার্থ এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি (বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মূল্যস্ফীতি) এবং বিকল্প প্রস্তাবের (যেমন- এয়ারবাসের অফার) অস্তিত্ব বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আরও পড়ুন
বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না: তারেক রহমানকে ট্রাম্প
তিনি বলেন, বোয়িং বিমান ক্রয়ের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে কি না বা নতুন কোনো ক্রয়/লিজের পরিকল্পনা আছে কি না, তা প্রকাশ করতে হবে। একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ এবং স্বাধীন যাচাই সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যে কোনো ক্রয় প্রক্রিয়া পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৬ অনুসরণ করে স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। অন্যথায় জনসাধারণের অর্থ সুরক্ষায় হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী সারওয়ার।
গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে একটি চুক্তির খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রস্তাবিত বহরে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ।
নোটিশে বলা হয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসব উড়োজাহাজের সম্মিলিত তালিকামূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেখানো হয়েছে। বিপুল এ ব্যয়ের অর্থনৈতিক ও আইনি যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী গোলাম সারওয়ার।
সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধি অনুসরণের কথা উল্লেখ করে নোটিশে বলা হয়, ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের এ ব্যয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। একই সময়ে দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংকটের পাশাপাশি বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতির মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে উড়োজাহাজ কেনার পর সেগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাবে কি না, সে প্রশ্নও তোলা হয়েছে।
উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী সারওয়ার। তার ভাষ্য, বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসকেও প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া উচিত।
নোটিশে সাম্প্রতিক কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদন এবং এয়ারবাসের প্রস্তাব বিবেচনার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের আহ্বানের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
আরও বোয়িং কিনবে বিমান, ‘অসাধারণ চুক্তি’ বললেন সার্জিও গোর
সরকার বা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে চুক্তি ও সম্ভাব্যতা যাচাই-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়টিও নোটিশে তুলে ধরা হয়েছে। একজন নাগরিক ও করদাতা হিসেবে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে জানার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে প্রাসঙ্গিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সারওয়ার।
নোটিশে উড়োজাহাজ কেনার আগে বিমানের বহরের প্রকৃত প্রয়োজন, রুটভিত্তিক যাত্রী চাহিদা, আসন ব্যবহারের হার বা লোড ফ্যাক্টর, খালি আসনের পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের বাজার পরিস্থিতি বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়নের দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত ব্যয়ের ‘অপরচুনিটি কস্ট’ বা বিকল্প ব্যয় মূল্যায়নের কথাও বলা হয়েছে।
জনসম্পদসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্তকে শুধু বাণিজ্যিক বা নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করে আদালতের পর্যালোচনার বাইরে রাখা যায় না—নোটিশে এমন বক্তব্যের পক্ষে ‘ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ মামলার নজির তুলে ধরা হয়েছে।
এতে সংবিধানে বর্ণিত আইনের আশ্রয় লাভ ও তথ্য জানার অধিকারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বোয়িংয়ের সঙ্গে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে যাবতীয় ফাইল, কার্যবিবরণী, এমওইউ ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংরক্ষণ ও প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, সাতদিনের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করা না হলে, অথবা স্বাধীন যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন করে কোনো চুক্তি করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এফএইচ/এমকেআর
বিজ্ঞাপন