বিজ্ঞাপন
মিষ্টি দুই বোন, আমেনা ও সুমাইয়া (ছদ্মনাম)। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত বাগেরহাট সদর উপজেলার একটি এলাকায়। একসঙ্গে বিদ্যালয়ে যাওয়া, ফিরে এসে খুনসুটিতে মেতে ওঠা। বছর চারেক আগেও এভাবে হেসে খেলে কেটে যেত তাদের দিন।
তবে হঠাৎ একদিন অন্ধকার নেমে আসে তাদের জীবনে। বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় ১৬ বছর বয়সি বড় বোন আমেনার। মাধ্যমিক শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয় তার শিক্ষাজীবন। তবে সে জীবনও সুখের হয়নি। বিয়ের এক বছর না পেরোতেই নির্যাতনের শিকার হতে হয়। স্বামীকে ব্যবসা করতে টাকা না দেওয়ায় চলতে থাকে নির্যাতন। দফায় দফায় সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার পর দুইদিন ভালো থাকত। আবার একই চিত্র। শেষ পর্যন্ত বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে সন্তান নিয়ে এখন থাকছেন বাবার বাড়িতে।
আমেনার ছোট বোন সুমাইয়ার গল্পটাও প্রায় এক। স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে শিক্ষক হওয়ার। অষ্টম শ্রেণিতে পা দিতেই স্বপ্ন ভাঙে তার। মাত্র ১৪ বছর বছর বয়সে বিয়ে হয়। বিয়ের পর লেখাপড়ার প্রয়োজন কী বলে লেখাপড়া করাতে চাননি শ্বশুরবাড়ির লোকজন।
আমেনা ও সুমাইয়ার বাবা নূর ইসলাম (ছদ্মনাম) বলেন, আমি অন্যের ইজিবাইক চালাই। মালিককে ভাড়া দিয়ে যা থাকে তা দিয়ে সংসার চালানো দায়। এখন বড় জামাইকে ব্যবসা করতে দিতে হবে টাকা। এই টাকা আমি কোথায় পাব? আমার তিন মেয়ে। অভাবের কারণে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এখন বড় মেয়ে আমেনা তার সন্তানসহ বাড়িতে থাকছে। পরিবারের সবার ভরণপোষণের দায়িত্ব আমার একার কাঁধে। সুমাইয়ারও প্রায় শরীর খারাপ হয়। তাকে ডাক্তার দেখাতে হয়, তার পেছনেও বেশ টাকা খরচ হয়। এসবের মধ্যে বড় জামাইকে টাকা দিতে পারিনি বলে শেষ পর্যন্ত আমেনার বিচ্ছেদ হয়।
শুধু আমেনা বা সুমাইয়া নয়; পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর গ্রামের খাদিজা আক্তার (ছদ্মনাম)। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই অষ্টম শ্রেণিতে থাকতে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তার। বিয়ের পর লেখাপড়া বন্ধ। বর্তমানে ভুগছেন শারীরিক জটিল সমস্যায়। এভাবে বাগেরহাট জেলার প্রায় ৪৭.৫ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জেলায় মোট ৪৭.৫ শতাংশ বাল্যবিয়ে হয়। এর মধ্যে ১৫ বছরের নিচে রয়েছে ১০.২ শতাংশ। আর ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে বিয়ে হয় ৩৭.৩ শতাংশ মানুষের।
অল্প বয়সে বিয়ের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে মেয়েরা। একই সঙ্গে অকাল মাতৃত্ব, শারীরিক ও মানসিক জটিলতা, পারিবারিক সহিংসতা, দারিদ্র্য ও নানা সামাজিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ফলে বাল্যবিয়ে শুধু একটি মেয়ের শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিচ্ছে না, বরং তার ভবিষ্যৎ জীবনেও তৈরি করছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
২০০৬ সাল থেকে এই অঞ্চলে শিশু সুরক্ষা ও বাল্যবিয়ে নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘কোডেক’ এর ফোকাল পারসন মাহবুবুর রহমান সুজন মনে করেন, বাল্যবিয়ের পেছনে দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, প্রচলিত সামাজিক মানসিকতা ছাড়াও মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ ও অসচেতনতাই প্রধান কারণ।
তিনি বলেন, বাল্যবিয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর। অল্প বয়সে বিয়ে এবং গর্ভধারণের ফলে মেয়েদের বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটে। একইসঙ্গে অভাব, পারিবারিক সহিংসতা, অপুষ্টি এবং অল্প বয়সে মাতৃত্বের মতো সমস্যাও তাদের জীবনে যুক্ত হয়।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বাগেরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এস কে এ হাসিব বলেন, অল্প বয়সে বিয়ের পর অধিকাংশ মেয়েই পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছে। শুধু শিক্ষাজীবনই নয়, বাল্যবিয়ের কারণে তাদের শারীরিক ও মানসিক নানা জটিলতার মধ্যেও পড়তে হচ্ছে। অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব ও সন্তান ধারণের চাপ তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না। বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সামাজিকভাবে ব্যাপক প্রচার চালানো জরুরি। পাশাপাশি মেয়েদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারগুলোর উদ্বেগ দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি রোগ বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ডালিয়া হালদার বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের থেকে অল্প বয়সে গর্ভধারণ করা নারীরা জটিল রোগে বেশি ভোগে। অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণের ফলে মা ও শিশু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপুষ্টিতে ভোগে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। গর্ভধারণের সময় ও সন্তান প্রসবের সময় জটিল রোগে বেশি ভোগে। এতে মা ও শিশু দুজনই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে।
বাগেরহাট জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহা. সাদেকুল ইসলাম বলেন, বাগেরহাটে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে আর্থ সামাজিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় অনেক মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ১৪-১৮ বছরের মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে। ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করা অবস্থাতেই তাদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এবং বিয়ের পর তারা শিক্ষার থেকে ঝরে পড়ছে।
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে নেওয়া উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের পরিবার এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। একইসঙ্গে বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক ও এর ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যা সম্পর্কে তাদের সচেতন করা হচ্ছে।
নাহিদ ফরাজী/এফএ/জেআইএম
বিজ্ঞাপন