জাতীয়

ভুল ধারণা বনাম বাস্তবতা: আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের সমাজের কিছু মিথ

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

আমাদের সমাজে আত্মহত্যা নিয়ে নানাবিধ আলোচনা থাকলেও একে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য ভুল ধারণা বা মিথ। এই ভুল ধারণার কারণে অনেকেই মানসিক সংকটে থাকা আপনজনদের অবহেলা করেন, যা প্রকারান্তরে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আত্মহত্যার মতো একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে বুঝতে হলে আমাদের প্রচলিত সামাজিক অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া জরুরি।

অনেকের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে যে যারা আত্মহত্যার কথা মুখে বলে, তারা আসলে কেবলই মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়, বাস্তবে তারা এমন চরম সিদ্ধান্ত নেয় না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আত্মহত্যা করে, তাদের একটি বড় অংশই ঘটনার আগে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের এই ইচ্ছার কথা কাউকে না কাউকে জানায়। ‘আমার আর বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই’ বা ‘আমি মরে গেলে তোদের আর কোনো ঝামেলা থাকবে না’—তরুণদের এমন সাধারণ কথাকে অবহেলা করা উচিত নয়। এটি মূলত তাদের পক্ষ থেকে সাহায্যের জন্য একটি নীরব আকুতি, যা সময়মতো ধরতে না পারলে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।

আরেকটি প্রচলিত মিথ হলো, আত্মহত্যা নিয়ে সরাসরি কথা বললে বা প্রশ্ন করলে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। সমাজ ও পরিবারে এই ভয়ে অনেকেই বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে ইতস্তত করেন।

কিন্তু নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র মানসিক ট্রমা বা হতাশায় থাকা মানুষকে যদি সহমর্মিতার সঙ্গে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে সে নিজের ক্ষতি করার কথা ভাবছে কি না, তবে তার আত্মহত্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। সরাসরি কথা বললে ভুক্তভোগী ব্যক্তি তার মনের অবরুদ্ধ আবেগ প্রকাশের একটি নিরাপদ জায়গা খুঁজে পায় এবং নিজেকে হালকা বোধ করে।

এই সামাজিক কুসংস্কার ও মানুষের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান তাঁর বিখ্যাত সামাজিক কলঙ্ক তত্ত্বে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। গফম্যানের মতে, সমাজ যখন কোনো নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থা বা আচরণকে স্বাভাবিকের চেয়ে আলাদা বা ‘ত্রুটিপূর্ণ’ মনে করে, তখন সেখানে তীব্র এক সামাজিক অবজ্ঞার জন্ম হয় (গফম্যান, ১৯৬৩)।

আমাদের সমাজে প্রচলিত মিথগুলোর কারণে পরিবার যখন বিষণ্নতায় থাকা মানুষটিকে এড়িয়ে চলে বা উপহাস করে, তখন ভুক্তভোগী ব্যক্তির মনে ঠিক এই দুটি অনুভূতিই চরম আকার ধারণ করে। এই সামাজিক বর্জন ও একাকিত্বই তাকে চূড়ান্ত আত্মহননের দিকে ধাবিত করে।

আমাদের সমাজে যখন কেউ বলে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, সমাজ তখন তাকে ‘মানসিকভাবে দুর্বল’ বা ‘কাপুরুষ’ বলে দেগে দেয়। এই সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি তার কষ্ট সবার আড়ালে লুকিয়ে ফেলে, যা তার মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।

এরই ধারাবাহিকতায় মনোবিজ্ঞানী টমাস জয়নরের আত্মহত্যার আন্তব্যক্তিক তত্ত্বটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জয়নরের মতে, মানুষ তখনই আত্মহত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, যখন তার মধ্যে দুটি তীব্র অনুভূতি কাজ করে—একটি হলো সবার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার তীব্র একাকিত্ব এবং অন্যটি হলো নিজেকে নিজের পরিবার বা সমাজের জন্য একটি বড় ‘বোঝা’ মনে করা (জয়নর, ২০০৫)।

আমাদের সমাজে প্রচলিত মিথগুলোর কারণে পরিবার যখন বিষণ্নতায় থাকা মানুষটিকে এড়িয়ে চলে বা উপহাস করে, তখন ভুক্তভোগী ব্যক্তির মনে ঠিক এই দুটি অনুভূতিই চরম আকার ধারণ করে। এই সামাজিক বর্জন ও একাকিত্বই তাকে চূড়ান্ত আত্মহননের দিকে ধাবিত করে।

আমাদের দেশে আঁচল ফাউন্ডেশনের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে পারিবারিক চাপ, তীব্র একাকিত্ব বা অনলাইন জগতের ক্ষতিকর আসক্তির কারণে যখন একজন মানুষের চিন্তাভাবনা চরম মাত্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তখনই সে অন্য কোনো পথ খুঁজে পায় না (আঁচল ফাউন্ডেশন, ২০২৩)। এটি মস্তিষ্কের এমন একটি অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি তার বিচারবুদ্ধি সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলে।

অনেকে মনে করেন, একজন মানুষ যদি একবার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, তবে তাকে আর কোনোভাবেই থামানো সম্ভব নয়। এই নিরাশাবাদী ধারণার কারণে অনেক সময় পরিবার হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু ক্লিনিক্যাল স্টাডিতে দেখা গেছে, আত্মহত্যার তীব্র ইচ্ছাটি মানুষের মনে খুব দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় না; এটি মূলত একটি ক্ষণস্থায়ী তীব্র আবেগপ্রবণ ঢেউ। জেড ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের একটি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সেই নির্দিষ্ট সংকটকালে যদি একজন মানুষকে একা না রেখে তাকে সঠিক মানসিক সহযোগিতা বা কোনো পেশাদার থেরাপিস্টের শরণাপন্ন করা যায়, তবে বেশির ভাগ মানুষের জীবনই বাঁচানো সম্ভব (জেড ফাউন্ডেশন, ২০২৬)।

অনেকে ভাবেন যে কেবল গভীর মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাই আত্মহত্যা করেন। এটিও একটি বড় ভুল ধারণা। বিষণ্নতা বা অন্যান্য মানসিক ব্যাধি আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ালেও কোনো দৃশ্যমান মানসিক রোগ ছাড়াও মানুষ চরম কোনো আবেগপ্রবণ ধাক্কা, যেমন হঠাৎ তীব্র অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক লোকলজ্জা, রিলেশনশিপ ব্রেকআপ বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে তাৎক্ষণিক আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পড়াশোনার চাপ ও দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ব্যাঘাতের মতো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ সমস্যাও অনেক সময় তরুণদের মনে আত্মহত্যার চিন্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখে (আহমেদ ও অন্যান্য, ২০২৪)।

পরিশেষে বলা যায়, আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রথম ধাপ হলো এই ভুল ধারণাগুলোর প্রাচীর ভেঙে ফেলা। যখন আমরা কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে মানসিক সংকটকে একটি স্বাভাবিক রোগ হিসেবে দেখতে শিখব, তখনই সমাজে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আমাদের চারপাশের চেনা মানুষদের অবহেলা না করে তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই পারে একটি মূল্যবান জীবন বাঁচাতে।

  • ইমদাদুল হক তালুকদার মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

    মতামত লেখকের নিজস্ব

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>