জাতীয়

মাটির পণ্যে নান্দনিকতা, ফিরছে পালদের হারানো মৃৎশিল্প

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই এগুলো মাটির তৈরি। নকশা করা থালা, বাটি, কাপ-পিরিচ, মগ, ফুলদানি ও ফুলের টব সাজানো রয়েছে কারখানাজুড়ে। সামনের খোলা উঠানে কিছু পণ্য শুকানো হচ্ছে, আবার কিছু নেওয়া হচ্ছে পাশের চুল্লিতে পোড়ানোর জন্য। ঘরের ভেতরে চলছে মেশিনের শব্দ, কারিগরদের কাজ আর পণ্যে রঙের প্রলেপ দেওয়ার ব্যস্ততা।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামের একটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেল এমন দৃশ্য। আধুনিক যন্ত্র ও ছাঁচের সাহায্যে তৈরি এসব মাটির পণ্যের গড়নও বেশ সুন্দর। উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রযুক্তিগত সহায়তায় এখানে তৈরি হচ্ছে থালা, বাটি, কাপ-পিরিচ, মগ, জগ, বোতল, ফুলদানি, ফুলের টব, টেরাকোটাসহ নানা পণ্য।

একসময় মাটির তৈজসপত্র তৈরি ছিল পাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পেশা। কম দাম ও বাজারের পরিবর্তনের কারণে অনেকে এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যান। মাঝিয়াড়ায় এখন আধুনিক পদ্ধতিতে সেই পেশাতেই ফিরছেন কেউ কেউ।

কারখানার ভেতরে মেশিনের সাহায্যে মাটি প্রস্তুত করে ঘুরন্ত চাকের মতো একটি যন্ত্রে থালার আকৃতি দিচ্ছিলেন কারুশিল্পী কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই ঘুরতে থাকা যন্ত্রকে জিগার মেশিন বলে। এখানে ছয়টা জিগার মেশিন আছে। আমি তিন বছর ধরে এখানে কাজ করি। এখন সব কাজ শিখে গেছি।’

মাটির তৈরি থালায় রঙের প্রলেপ দিচ্ছেন এক নারী শ্রমিক। গতকাল সকালে তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামে

কারিগরদের ভাষ্য, খালবিল থেকে মাটি সংগ্রহ করে মেশিনে তা ছেঁকে ছোট ছোট দলায় পরিণত করা হয়। এরপর ছাঁচে বসিয়ে জিগার মেশিনে ঘুরিয়ে তৈরি করা হয় নির্দিষ্ট আকৃতির পাত্র। পাত্রগুলো শুকানোর পর দেওয়া হয় রঙের প্রলেপ। সবশেষে সেগুলো পোড়ানো হয় চুল্লিতে।

শুকনো মাটির থালায় রঙের প্রলেপ দিচ্ছিলেন অর্চনা পাল। একে একে থালাগুলো তরল মিশ্রণে ডুবিয়ে তুলছিলেন তিনি। অর্চনা বলেন, ‘কাজ আমি দেখে দেখে শিখেছি। মিশ্রণে খয়ের, সোডা, রংমাটি আর পানি আছে।’

মৃৎশিল্পী নমিতা পাল বলেন, ‘আগে হাত-পা দিয়ে মাটি প্রস্তুত করতাম। এখন মেশিনে করছি। বিভিন্ন ডিজাইনের ছাঁচে পণ্য উৎপাদনে সময় কম লাগে। পরিশ্রমও কম। সবচেয়ে বড় কথা, পণ্যের ফিনিশিং ভালো হচ্ছে। দামও ভালো পাচ্ছি।’

খোলা চত্বরে তৈরি পণ্য শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন ললিতা পাল। তিনি বলেন, ‘আমরা আবার আমাদের পাল সম্প্রদায়ের পুরোনো পেশা ফিরে পেয়েছি। আমার ঠাকুরদা মাটির জিনিসপত্র বানাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়ির আর কেউ এই পেশায় ছিলেন না। এখন আমি আবার এখানে এসে মাটির জিনিসপত্র বানাচ্ছি।’

জিগার মেশিনে ঘুরিয়ে মাটির পাত্রের আকৃতি দিচ্ছেন এক মৃৎশিল্পী। গতকাল তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামে

কথা হয় ওই কারখানার মাঠে ঘাস কাটতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম সরদারের সঙ্গে। কথার ফাঁকে তিনি বলেন, ‘মাটির থালা-বাটি বানাতেও যে মেশিন হয়, এটা কল্পনাও করিনি। পাল বংশের লোকজন আগে হাতে তৈরি করত। এখন মেশিনে আরও সুন্দর হচ্ছে।’

পণ্য পোড়ানোর জন্য কারখানার চত্বরে রয়েছে মাটি ও ইট দিয়ে তৈরি বড় গোলাকার চুল্লি। সেখানে থাকা একজন কর্মী বলেন, শুকনো পণ্য চুল্লিতে সাজানোর পর পরদিন সকালে হালকা আগুন দেওয়া হয়। কারিগরদের ভাষায় প্রাথমিক এই আগুনকে ‘তাওনা’ বলা হয়। পরে ধীরে ধীরে তাপ বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে পণ্য পোড়াতে সময় লাগে ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা।

কারখানার এক নারী শ্রমিক বলেন, তাঁদের অনেকে মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মজুরি পান। এই আয় দিয়ে তাঁরা সংসারের খরচ মেটাতে সহায়তা করেন।

সাতক্ষীরা শহর থেকে কারখানায় পণ্য দেখতে এসেছিলেন আহসান রাজীব। তিনি বলেন, ‘শুনেছি দেশভাগের আগে কলকাতার বাজারে সাতক্ষীরার মাটির পণ্যের পরিচিতি ছিল। পরে সেই বাজার হারিয়ে যায়। এখন মানুষের আগ্রহ আবার বাড়ছে। মাটির এসব পণ্য ঘর সাজানো ও উপহার দেওয়ার জন্যও সুন্দর। মাটির জিনিসপত্রের প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ আছে, এখান থেকেই কিনে নিই।’

কারখানার চত্বরে শুকানোর জন্য রাখা হয়েছে তৈরি করা মাটির পণ্য। গতকাল তালার মাঝিয়াড়া গ্রামে

উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রচেষ্টার হয়ে কারখানাটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন চন্দ্র শেখর দাশ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আধুনিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন ও বিপণন করতে না পারায় পাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পেশাটি হারিয়ে যাচ্ছিল। এখন আধুনিক মেশিন ও ছাঁচে নানা ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এসব পণ্য যাচ্ছে, ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না।’

সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোরের একাংশের প্রায় ৬০০ পালকে সংগঠিত করে আধুনিক পদ্ধতিতে মাটির পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরিচালক শেখ ইয়াকুব আলী। তিনি আরও বলেন, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের সহায়তায় কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কার্যক্রম চলছে। এখন পাল সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও যুক্ত হয়েছেন। পণ্য বিক্রি করে যে আয় ও লভ্যাংশ হচ্ছে, সেখান থেকেই শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিজে তালার মাঝিয়াড়া গ্রামে গিয়ে মৃৎশিল্পীদের কারখানা ও কাজ দেখে এসেছি। হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কাদামাটিকে নানা রূপ দিয়ে সেখানে নান্দনিক সব মাটির তৈজসপত্র তৈরি করা হচ্ছে। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেকোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা অবশ্যই তাঁদের পাশে দাঁড়াব।’

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>