মাটি কেবল পৃথিবীর এক জড় আবরণ নয়; এটি মানবসভ্যতার আদিমতম ক্যানভাস। মানুষের যাপিত জীবন, তার আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম আর অস্তিত্বের সংকট যেন মাটির সঙ্গেই সবচেয়ে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই কাদামাটিকে যখন আগুনে পুড়িয়ে এক চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া হয়, তখন তা আর কেবল মাটি থাকে না, তা হয়ে ওঠে মানুষের অন্তর্নিহিত অনুভূতির এক শক্তিশালী শিল্পভাষ্য। কাদামাটি, আগুন আর মানুষের মনস্তত্ত্বের এমনই এক গভীর মিথস্ক্রিয়া নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে চলছে প্রতিশ্রুতিশীল সিরামিকশিল্পী মো. আনিসুল হকের তৃতীয় একক প্রদর্শনী ‘দ্য জার্নি অব ম্যাটেরিয়াল, ফর্ম অ্যান্ড ফায়ার: ফ্রম ক্লে টু সিরামিক’।

এ প্রদর্শনীর সবচেয়ে অভিনব দিকটি হলো শিল্পীর নিরীক্ষাধর্মী কাজগুলো। সিরামিকের মসৃণ ও চাকচিক্যময় রূপ থেকে বেরিয়ে আনিসুল হক তাঁর কাজে টেক্সচার বা বুনট যুক্ত করেছেন। তিনি কাদামাটির সঙ্গে পুরোনো, জীর্ণ কাপড়ের সমন্বয়ে এমন এক রুক্ষ পৃষ্ঠতল তৈরি করেছেন, যা দর্শকের মনে একাধারে বিস্ময় ও অস্বস্তির জন্ম দেয়।
কেন এই জীর্ণ কাপড়ের বুনট? প্রশ্ন জাগতে পারে দর্শকমনে। তিনি এই রুক্ষ ও জীর্ণ টেক্সচারগুলোর মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের আবেগ-অনুভূতি ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে তুলে ধরেছেন। বর্ণবাদ, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নিপীড়ন, অধিকারবঞ্চিত মানুষের হাহাকার এবং নারীবাদের মতো বিষয়গুলো তাঁর এই জীর্ণ কাপড়ের বুনটের মধ্য দিয়ে যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রদর্শনীর একটি নিরীক্ষাধর্মী কাজে দেখা যায়, স্তরে স্তরে সাজানো ভাঁজ করা কাপড়ের মতো ফর্ম তৈরি করা হয়েছে মাটির বুকে। পোড়ামাটির লালচে, কালো, ধূসর বা সাদার মিশেলে তৈরি এই ফর্মগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ব্যবহারের অযোগ্য জীর্ণ কাপড়ের স্তূপ।

কিন্তু এই স্তূপ আসলে শোষিত মানুষের জমে থাকা আর্তনাদ আর বৈষম্যের প্রতীক। আবার একটি লম্বাটে, এবড়োখেবড়ো নীলচে-সবুজ সারফেসের ওপর যখন তিনি হালকা নীল রঙের রুক্ষ কাপড়ের মতো টেক্সচার দিয়ে একটি বাঁধন তৈরি করেন, তখন তা আবদ্ধতা ও মুক্তির এক অদ্ভুত দার্শনিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়।
আনিসুল হকের ফিগারেটিভ বা অবয়বধর্মী ভাস্কর্যগুলোতে তিনি মানুষের শারীরিক গঠনকে কেবল অনুকরণ করেননি; বরং মানুষের ভেতরের রক্তক্ষরণকে দৃশ্যমান করেছেন। তাঁর ফিগারেটিভ ভাস্কর্যগুলোতে তিনি মানুষের জীবনের হতাশাজনক ও দুঃখজনক পরিস্থিতি দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
একটি দণ্ডায়মান নারীমূর্তির ভাস্কর্যে আমরা দেখতে পাই, শরীরটিকে অত্যন্ত রুক্ষ, জীর্ণ ও ছিদ্রযুক্ত কাপড়ের মতো টেক্সচার দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মুখের অভিব্যক্তিতে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, আছে এক গভীর শূন্যতা ও নীরব প্রতিরোধ।

ভাস্কর্যটি যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা কিংবা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের নিপীড়িত, শৃঙ্খলিত নারীদের এক জীবন্ত দলিল। মানুষের অসহায়ত্ব এবং অস্তিত্ব রক্ষার অদৃশ্য সংগ্রামকে মাটি ও আগুনের রসায়নে এমন জীবন্ত করে তোলা সত্যিই অনন্য এক শৈল্পিক দক্ষতা। শিল্পী তাঁর এই ভাস্কর্যগুলোকে একটি ‘ভার্সেটাইল মিরর’ বা বহুমুখী আয়না বলেছেন, যেখানে দর্শক সমসাময়িক সমস্যা এবং ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর যেন স্বচক্ষে উপলব্ধি করতে পারেন।
সমকালীন ও ধারণাগত ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি শিল্পী সিরামিকের আদিম উপযোগিতাকেও অস্বীকার করেননি। তাঁর ব্যবহারিক কাজ বা ইউটিলিটেরিয়ান সিরামিকসে শিল্পের এক অপূর্ব নন্দনতত্ত্ব যুক্ত হয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত তৈজসপত্র কীভাবে আভিজাত্য ও শিল্পের মর্যাদা পেতে পারে, তা তাঁর কাজগুলো না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া জুস সেট, টি-পট ও কাপগুলোর দিকে তাকালে ফর্মের প্রতি তাঁর নিয়ন্ত্রণ লক্ষ করা যায়। মসৃণ বাদামি পৃষ্ঠতলের দীর্ঘাকৃতির জগ এবং ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতার কাপগুলো অত্যন্ত আধুনিক ও স্নিগ্ধ। অন্যদিকে কালো রঙের ম্যাট ফিনিশ দেওয়া টি-পটে তিনি চমৎকার জ্যামিতিক নকশার প্রলেপ দিয়েছেন, যার সঙ্গে একটি বাঁকানো হাতল যুক্ত করে পাত্রটিকে একটি ভাস্কর্যধর্মী রূপ দেওয়া হয়েছে। মেটালিক গ্লেজ করা আরেকটি টি-পটের সেটে এমন এক ফিনিশিং আনা হয়েছে, যা দেখতে প্রাচীন ব্রোঞ্জ বা তামার পাত্রের মতো রাজকীয় মনে হয়। এ ছাড়া সবুজ রঙের একটি পাত্রে মাছের যে আলংকারিক মোটিফ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আমাদের লোকশিল্পের শিকড়কেই আধুনিক মোড়কে উপস্থাপন করে।
শিল্পের কাজ শুধু ড্রয়িংরুমের শোভা বর্ধন করা নয়; মানুষের মগজে নাড়া দেওয়া, তাকে ভাবতে বাধ্য করা। মো. আনিসুল হকের প্রদর্শনীটি ঠিক সে কাজই করেছে। তাঁর প্রতিটি ভাস্কর্য, প্রতিটি টেক্সচার, প্রতিটি ভাঁজ করা মাটির কাপড়ের বুনন আসলে আমাদেরই সমাজের প্রতিচ্ছবি। বর্তমান বিশ্ব যখন যুদ্ধ, হিংসা, বর্ণবাদ আর ক্ষমতা দখলের অন্ধ খেলায় মেতে উঠেছে, তখন শিল্পীর এই কাদামাটি আর আগুনের শিল্পভাষ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই চিরন্তন সত্যটি—আমরা সবাই মানুষ এবং এই পৃথিবী আমাদের সবার।

জয়নুল গ্যালারির প্রশান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে আনিসুলের এই ভাস্কর্যগুলোর মুখোমুখি হলে মনে হয়, মাটি যেন কথা বলছে। যে মাটি একদিন মানুষের সভ্যতার সূচনা করেছিল, সেই মাটিই আজ মানুষের ধ্বংসলীলা আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
এটি কেবল কিছু সুদৃশ্য সিরামিক পাত্রের প্রদর্শনী নয়; বরং সমকালীন বিশ্ববাস্তবতার এক ‘বহুমুখী আয়না’। আনিসুল হক তাঁর এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সিরামিকশিল্পকে প্রথাগত উপযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও নিরীক্ষাধর্মী উচ্চতায় নেওয়ার চেস্টা করে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে শিল্প সৃষ্টি করা হলো এমন একটি অর্থবহ কাজ, যার একটি শক্তিশালী বার্তা আছে এবং যা সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম।’ সিরামিক তাঁর কাছে কেবল একটি মাধ্যম নয়; এটি তাঁর চিন্তাভাবনা প্রকাশের, মনকে প্রশান্ত করার এবং ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সত্যকে তুলে ধরার একটি শৈল্পিক হাতিয়ার।

পৃথিবীতে এমন আর কোনো উপাদান নেই, যার সঙ্গে মানুষের কাদামাটির মতো এত স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই তিনি তাঁর সিরামিক ভাস্কর্যগুলোতে মানুষের গল্প বলেছেন। শিল্পী বিশ্বাস করেন, সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো মানবতার সেবা করা এবং শিল্পীরাই পারেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবজাতিকে জাগ্রত করতে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা কোন ধর্মে বিশ্বাস করি বা কোন দেশ থেকে এসেছি, তা বিবেচ্য নয়। আমাদের একটিই মাত্র পরিচয়—আমরা মানুষ। মানবজাতির ভেতরের দ্বন্দ্ব ও বৈচিত্র্যের অসীম সম্ভাবনা আমাকে সর্বদা কৌতূহলী ও মুগ্ধ করে।’ শিল্পীর এই মানবতাবাদী দর্শনই তাঁর এই প্রদর্শনীর মূল চালিকা শক্তি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে প্রদর্শনীটি দর্শকের জন্য খোলা থাকবে প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর শেষ দিন ২২ সেপ্টেম্বর।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>