ব্রেকিং নিউজ
সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ জেলায় বজ্রবৃষ্টির আভাস আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যানে থাকা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, নিহত ৬ কূটনৈতিক তৎপরতার আশায় এবার কমে গেল তেলের দাম অভাব-অনিশ্চয়তা পেরিয়ে জিপিএ-৫, এখন কলেজে পড়ার খরচ চিন্তা পত্রিকা: 'পুলিশের কাজে ধীরগতির কারণে নিখোঁজ শিশুদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে' ‘আমি হেরেছি, তুমি জিতেছো’-উদ্ধার চিঠিতে আবেগঘন বার্তা ৪৪ বছর বয়সে সন ইয়ের সাহসী প্রত্যাবর্তন, আলোচনায় নিষিদ্ধ সময়ের প্রেমের গল্প খুলনায় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা : ছাদ থেকে ফেলে দেওয়াসহ যেসব তথ্য সামনে এল এআই খাতে ওয়ারেন বাফেটের দূরদর্শী বিনিয়োগ, কীভাবে মুনাফা করছেন জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী
জাতীয়

মাদারীপুরে নজরুল-আগমনের শতবর্ষ ও ধীবর সম্মেলন

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

১৯২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ড. প্রতাপচন্দ্র গুহরায় তাঁর নিজ রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র মাদারীপুরে ফিরে নতুন উদ্যমে সংগঠক হিসেবে সক্রিয় হন। সেখানে তৎকালীন নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনীর আয়োজন করা হলে অনন্য নেতৃত্বগুণ ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তাঁকে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এ সম্মেলনে প্রতাপচন্দ্রের আহ্বানে মৎস্যজীবীদের পাশাপাশি যুক্ত হয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী শান্তি সেনা সমিতির বহু সদস্য। প্রকৃতপক্ষে স্বদেশী আন্দোলন (১৯০০-১৯৩০) থেকেই বিপ্লবীদের মূল কেন্দ্র হিসেবে মাদারীপুর উঠে এসেছিল, যেখানে অনুশীলন সমিতি (১৯০২) ও যুগান্তর সমিতির (১৯০৬) মজবুত ভিত্তি ছিল। বিশেষ করে ১৯১৩ সালে যুগান্তর দলের ভেতর পূর্ণচন্দ্র দাস নিজের একটি বলয় গড়ে তোলেন এবং পরে ১৯২১ সালে গড়ে তোলেন ‘মাদারীপুর শান্তি সেনা সমিতি’। ১৯১৫ সালের ঐতিহাসিক বালেশ্বরের ট্রেন্সযুদ্ধে প্রখ্যাত বিপ্লবী বাঘা যতীনের সঙ্গে লড়াই করা চার বীর সহযোদ্ধাও ছিলেন পূর্ণচন্দ্রের এই সমিতিরই সদস্য।

ড. প্রতাপচন্দ্র গুহরায় নিজেও একসময় পূর্ণচন্দ্রের এই শান্তি সেনা সমিতির একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে বিপ্লবে যুক্ত ছিলেন। কালক্রমে তিনি মহাত্মা গান্ধীর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সান্নিধ্যে এসে ১৯২৩ সালে গঠিত স্বরাজ্য দলে যোগ দেন। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ লড়াইয়ে তাঁকে ১৫ বছর কারাবরণ করতে হয়েছে। দেশভাগের পর তিনি ভারতে চলে যান এবং ১৯৫২ থেকে ১৯৬৫ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের ডেপুটি স্পিকার ও পরে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরই নেতৃত্বে আয়োজিত ১৯২৬ সালের সেই মৎস্যজীবী সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে ১০ মার্চ সন্ধ্যায় মাদারীপুরে এসে পৌঁছান কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

সেই মৎস্যজীবী সম্মেলনকে সফলভাবে পরিচালনা করার লক্ষ্যে মাদারীপুরের জননেতা ড. প্রতাপচন্দ্র গুহরায়কে সভাপতি এবং কার্তিকচন্দ্র মল্ল বর্মণকে সম্পাদক মনোনীত করে একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির অন্যান্য সক্রিয় সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন নিবারণচন্দ্র মল্ল বর্মণ, যোগেন্দ্রচন্দ্র মল্ল বর্মণ ও বিহারীলাল বিশ্বাসের মতো স্থানীয় ব্যক্তিরা। মাদারীপুরে আয়োজিত নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রাদেশিক মৎস্যজীবী সম্মেলনে যোগ দিতে অতিথিরা যখন স্টিমারঘাটে এসে পৌঁছান, তখন সময়টি ছিল এক আনন্দঘন সন্ধ্যা। ঘাটে অপেক্ষমাণ হাজারো উৎসুক জনতা উৎসবমুখর পরিবেশে বিপুল করতালি ও উষ্ণ অভ্যর্থনার মাধ্যমে তাঁদের সাদরে বরণ করে নেন। ‘লাঙল’ পত্রিকার দ্বাদশ সংখ্যায় (৪ চৈত্র ১৩৩২) ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনী’ শিরোনামে এই সম্মেলনের প্রতিবেদন ছিল এ রকম—

‘গত ১১ই ও ১২ই মার্চ্চ তারিখে ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর শহরে মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশন হয়। ১০ই মার্চ্চ সন্ধ্যায় সভাপতি শ্রীযুত হেমন্ত কুমার সরকার স্টীমারযোগে আসেন। তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম, শ্রীযুক্ত বসন্ত কুমার মজুমদার ও শ্রীমতি হেমপ্রভা মজুমদার ছিলেন। স্টীমার ঘাটে অভ্যর্থনার জন্য প্রায় ৫ হাজার লোক উপস্থিত হইয়াছিলেন। সম্মিলনীতে বঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫শত প্রতিনিধি এসেছিলেন। সভায় শ্রোতার সংখ্যা ৫ হাজারের উপরে হয়েছিল। সভাপতি হেমন্ত বাবুর বক্তৃতা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এবং মৌলিক ধরণের হয়েছিল। কাজী সাহেবের গানে সকলেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ডা. প্রতাপচন্দ্র গুহরায় ও সম্পাদক শ্রীকার্ত্তিকচন্দ্র মল্লবর্মণ মহাশয়ের বক্তৃতাও হৃদয়গ্রাহী হয়েছিল। মৎস্যজীবীগণের হিতকারক নানা প্রস্তাব গৃহীত হয়। শা [শাহ] সৈয়দ এমদাদুল হকের মৎস্যের পোনা সংরক্ষণ আইনের তীব্র প্রতিবাদ করা হয়। হেমন্ত বাবুর ‘বেঙ্গল ফিশারিস বিল’-এর সম্পূর্ণ সমর্থন করা হয়। আগামী সংখ্যায় সম্মিলনীর পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হইবে।

‘দিনাজপুরের কর্মসূচি শেষ করে ১০ই মার্চ সন্ধ্যায় স্টীমারযোগে অতিথিরা মাদারীপুর ঘাটে এসে উপস্থিত হন। অভ্যর্থনা কমিটির নেতৃবৃন্দ ও উৎসুক জনতার এক বিশাল সমাবেশ সেদিন সানন্দে তাঁদের বরণ করে নেয় এবং অতিথিরা সে রাতে মাদারীপুরেই রাত্রিযাপন করেন। পরদিন, অর্থাৎ ১১ই মার্চ সকালে নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রাদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনীর প্রথম অধিবেশনের সূচনা ঘটে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্বরচিত উদ্দীপনামূলক ‘জেলেদের গান’ পরিবেশনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন, যা ছিল ৮৪ পঙ্‌ক্তিতে রচিত এক দীর্ঘ পরিবেশনা। গানটি এমন—

শোন্ রে ও ভাই জেলে,

এবার উঠ্‌ব রে সব ঠেলে।

ঐ বিশ্ব-সভায় উঠ্ল সবাই রে,

ঐ মুটে-মজুর হেলে।

এবার উঠ্‌ব রে সব ঠেলে॥’

‘সর্বহারা’ (১৯২৬) কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হওয়ার সময় যে গানটির শিরোনাম বদলে ‘ধীবরদের গান’ রাখা হয়েছিল, তা মূলত রচিত হয়েছিল মাদারীপুরের এ সম্মেলনের উদ্দেশেই। ‘নজরুল-রচনাবলী’ অনুযায়ী, কবি ‘কৃষ্ণনগর/২৪শে ফাল্গুন, ১৩৩২’ তারিখে গানটি রচনা করেন। জেলেদের বাস্তব জীবনসংগ্রাম, ধনিক শ্রেণির শোষণ ও অধিকার হরণের চিত্র তুলে ধরে অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষের মতো লড়াইয়ের আহ্বান জানানো এই গান ‘লাঙল’ পত্রিকার দ্বাদশ সংখ্যায় (৪ চৈত্র) ৩ থেকে ৫ নম্বর পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হয়। সেখানে এর পাদটীকায় স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, ‘মাদারীপুরে নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনের উদ্বোধন-সঙ্গীত।’ এতে সমাজে অবহেলিত ও শোষিত মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন এবং তাদের জাগ্রত হওয়ার এক শক্তিশালী আহ্বান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে খেটে খাওয়া মানুষগুলো সমাজের তলানিতে পড়ে থেকে অত্যাচার সহ্য করেছে, কবি তাদের অলসতা ও নীরবতা ভেঙে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নামার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। বিশ্বের অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ যেমন মুটে, মজুর কিংবা কৃষকেরা যখন নিজেদের অধিকারের জন্য সোচ্চার হয়ে বিশ্বসভায় জায়গা করে নিচ্ছে, তখন মৎস্যজীবীরা কেন পেছনে পড়ে থাকবে? তারা পরাধীনতা ও শোষকদের অত্যাচারকে লাথির মতো সহ্য করে মৃতপ্রায়ের মতো পড়ে থাকত। নিজ জন্মভূমিতেও তারা ছিল আশ্রয়হীন, ঝড়ের মুখে নৌকার মতো অনিশ্চিত যাদের জীবন। তাদের উপার্জিত সম্পদে থাবা বসাত শোষক সমাজ। নজরুল সেই অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে ধীবর সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং সামনের দিকে ঠেলে ওঠার বিপ্লবমন্ত্র শুনিয়েছেন।

সম্মেলনের ১২ মার্চের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনেও কাজী নজরুল ইসলামের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। দুই দিনের এই আয়োজনে আসাম ও বাংলার নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বক্তব্য দেন ‘নিখিল বঙ্গ ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সমিতি’র সভাপতি হেমন্ত কুমার সরকার, কংগ্রেস নেতা বসন্ত কুমার মজুমদার, হেমপ্রভা মজুমদার এবং অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ডা. প্রতাপচন্দ্র গুহরায় ও সম্পাদক কার্তিকচন্দ্র মল্ল বর্মণ। নেতৃবৃন্দ ও প্রতিনিধিদের আলোচনা এবং সুনির্দিষ্ট সুপারিশের ভিত্তিতে এই সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

সম্মেলনের অধিবেশনে উদ্যোক্তা ও প্রতিনিধিদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়ে একপর্যায়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় কাজী নজরুল ইসলাম নিজে উদ্যোগী হয়ে হারমোনিয়াম হাতে নিয়ে গান গাইতে শুরু করলে নিমেষেই পরিবেশ শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পরে শ্রোতাদের অনুরোধে তিনি আরও একটি সংগীত পরিবেশন করেন এবং আবার সুশৃঙ্খল পরিবেশে সম্মেলনের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। সেই বিশৃঙ্খলার মুহূর্তে নজরুল উদ্দীপনামূলক সংগীত পরিবেশন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

মাদারীপুরে আয়োজিত নিখিল বঙ্গ ও আসাম প্রাদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনের তৃতীয় অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে পরবর্তী কার্যনির্বাহী বছরের জন্য ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে হেমন্ত কুমার সরকার পুনর্নির্বাচিত সভাপতি এবং রমণী মোহন বিশ্বাস সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। এই সম্মেলনে পরপর তিনবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হয়ে হেমন্ত কুমার সরকার যে ভাষণ প্রদান করেছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে ‘লাঙল’ পত্রিকার ত্রয়োদশ সংখ্যায় (১১ চৈত্র, ১৩৩২) ‘মৎস্যজীবীর কথা’ শিরোনামে মুদ্রিত হয়। প্রচ্ছদের পর তৃতীয় থেকে অষ্টম পৃষ্ঠাজুড়ে প্রকাশিত এই অভিভাষণের শুরুতে একটি বিশেষ নোটে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল, ‘এটি মূলত গত ২৭শে ও ২৮শে ফাল্গুন তারিখে মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত মৎস্যজীবী সম্মেলনেরই সভাপতি প্রদত্ত ভাষণ। শেষ দিনের শেষ অধিবেশন শেষেও নজরুল গান গেয়ে মাতিয়ে তোলেন।’

মাদারীপুর সফরের তৃতীয় দিনে, অর্থাৎ ২৮ ফাল্গুন সম্মেলন শেষ হওয়ার পরদিন ২৯ ফাল্গুন (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) কবি কাজী নজরুল ইসলাম মাদারীপুরে বসেই রচনা করেন তাঁর গীতিকবিতা ‘হেমপ্রভা’। সম্মিলনীতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা প্রখ্যাত কংগ্রেস নেত্রী হেমপ্রভা মজুমদারের রাজনৈতিক তেজস্বিতা ও ব্যক্তিত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে কবি গানটির নিচে স্থান ও তারিখ হিসেবে লেখেন, ‘মাদারীপুর, ২৯শে ফাল্গুন, ১৩৩২’। গীতিকবিতাটি এখানে উদ্ধৃত হলো—

‘এসো বাংলার চাঁদ-সুলতানা

বীর-মাতা বীর-জায়া গো।

তোমাতে পড়েছে সকল কালের

বীর-নারীদের ছায়া গো।’

কাজী নজরুল ইসলামের এই গানে ছিল বিপ্লবী ও কংগ্রেস নেত্রী হেমপ্রভা মজুমদারের রাজনৈতিক তেজস্বিতা ও দেশপ্রেমের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। কবি তাঁকে পরাধীন বাংলার আঁধার দূর করতে আসা ‘আলোক-জননী’ ও দুর্গত দেশের ‘বিজয়-লক্ষ্মী’ হিসেবে বন্দনা করেছেন। কবিতায় দেশবাসীর ক্ষুধা ও পরাধীনতার হাহাকারে রক্তে বিপ্লবের চেতনা জাগিয়ে তোলার প্রতীক তিনি। চান্দ সুলতানার মতো বীরত্ব, প্রাচীন পুরাণ ও ইতিহাসের বীর নারীদের ছায়া তাঁর ভেতরে প্রতিফলিত। শিবের সঙ্গে সতীর শ্মশানে জীবনের আকুতি জানানোর রূপকে কবি দেখিয়েছেন, কীভাবে এই বীরাঙ্গনা পরাধীন ও শ্মশানসম ভারতে স্বাধীনতার জন্য লড়ছেন। কবির প্রত্যাশা, এই নারীজাগরণের প্রভাবেই নববাংলার পরাধীনতার আঁধার রজনী কেটে স্বাধীনতা ও মুক্তির নতুন আলো ফুটবে। এই গানের সঙ্গে নজরুলের মাদারীপুরে আগমনের যোগসূত্র রয়েছে।

মাদারীপুরে কাজী নজরুল ইসলামের পদার্পণের শতবর্ষ পূর্তিকে সামনে রেখে তাঁর স্মৃতি চিরস্থায়ী করতে এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান তুলে ধরতে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মী ও সুশীল সমাজের উদ্যোগে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। মাদারীপুরের তৎকালীন স্টিমারঘাট কিংবা মৎস্যজীবী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়া স্থানটি চিহ্নিত করে সেখানে একটি স্মৃতিফলক বা ‘নজরুল স্মারক’ নির্মাণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শহরের অন্যতম প্রধান কোনো সড়ক, মিলনায়তন কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ‘কাজী নজরুল ইসলাম’-এর নামে নামকরণ করা যেতে পারে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি বা পাবলিক লাইব্রেরির অধীন একটি ‘নজরুল কর্নার’ স্থাপন করে নজরুলের বইপত্র সংরক্ষিত রাখা প্রয়োজন। আর ১৯২৬ সালের সেই সফরের তথ্য, ‘লাঙল’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, ‘ধীবরদের গান’ ও ‘হেমপ্রভা’ এবং ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতার অনুলিপি মাদারীপুরের বিভিন্ন সড়কে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। যেহেতু নজরুল মাদারীপুরে এসেছিলেন মূলত জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সম্মেলনে, তাই তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে স্থানীয় আড়িয়াল খাঁ নদের তীরবর্তী এলাকায় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও নজরুলের সাম্যবাদী চেতনাকে ফুটিয়ে তুলে একটি ‘ধীবর মোড়’ বা ভাস্কর্য নির্মাণ করা যেতে পারে। তিন দিনব্যাপী ‘নজরুলের মাদারীপুর আগমনের শতবর্ষ উৎসব’-এর আয়োজন করা যায়, যেখানে নজরুলের মাদারীপুর সফর নিয়ে সেমিনার, নজরুলসংগীত প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা থাকবে। একই সঙ্গে ১৯২৬ সালের সেই সফরের বিস্তারিত দলিল, স্থানীয় ইতিহাসবিদদের লেখা এবং নজরুলের মাদারীপুরকেন্দ্রিক সৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে একটি উচ্চ মানের ‘স্মারকগ্রন্থ’ প্রকাশ করা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>