বিজ্ঞাপন
সীমান্ত মানেই শুধু কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল কিংবা দুই দেশের ভূখণ্ডের বিভাজন নয়। সীমান্তের আরেকটি বাস্তবতা হলো চোরাচালানের বহুমাত্রিক জগৎ। একসময় যেখানে মানব পাচার, মাদক, অস্ত্র, গবাদিপশু কিংবা বিদেশি পণ্যের চোরাচালান নিয়ে বেশি আলোচনা হতো, এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে এমন একটি পণ্য, যা শুনতে অদ্ভুত হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য আছে—তা হচ্ছে মানবচুল। মানুষের মাথার চুল এখন সীমান্তপথে চোরাইপণ্যের অংশ। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মানুষের শরীরের অংশবিশেষও যখন অবৈধ বাণিজ্যের পণ্যে পরিণত হয়, তখন সীমান্ত অর্থনীতি ও নিরাপত্তার প্রকৃত চিত্রটি আমরা কতটা বুঝতে পারছি? অর্থাৎ, চোরাচালানের জগৎ ক্রমেই বহুমুখী হচ্ছে। পণ্যের ধরন বদলাচ্ছে, কিন্তু বদলাচ্ছে না এর মূল চালিকাশক্তি, যা অবৈধ মুনাফা নামে পরিচিত।
মানবচুলের বাণিজ্য প্রথম দেখায় মাদক বা অস্ত্রের মতো বিপজ্জনক নয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক চুলের চাহিদা রয়েছে। উইগ, হেয়ার এক্সটেনশনসহ সৌন্দর্যশিল্পে এর ব্যবহার হয়। ফলে সংগ্রহ করা চুলও একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। বৈধভাবে সংগ্রহ ও রপ্তানি হলে এটি কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্যের উৎস হতে পারে। কিন্তু অবৈধ পথে সীমান্ত অতিক্রম করলে তা চোরাচালানের অংশ হয়ে যায়।
চোরাচালানের মূল কারণ অবশ্য শুধু লাভের লোভ নয়। এর পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, সীমান্তবর্তী মানুষের সীমিত কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৈষম্য, শুল্ক ও কর কাঠামোর জটিলতা, দুর্বল নজরদারি, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কখনো কখনো স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের প্রশ্রয়। বৈধ পথে একটি পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে যে খরচ, সময় ও আনুষ্ঠানিকতা লাগে, অবৈধ পথে তা এড়িয়ে দ্রুত বেশি মুনাফা করা সম্ভব হলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি হতে সময় লাগে না।
মানব পাচার ও মানবচুলের চোরাচালান একই ধরনের অপরাধ নয়। কিন্তু দুটির পেছনে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো কাজ করে, সেখানে কিছু মিল রয়েছে। মানব পাচারের ক্ষেত্রে অসহায় মানুষকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়; মানবচুলের চোরাচালানে মানুষের শরীর থেকে সংগৃহীত একটি উপাদান বাজারের পণ্যে পরিণত হয়। প্রথমটি মানবাধিকারের ভয়াবহ লঙ্ঘন, দ্বিতীয়টি মূলত বাণিজ্যিক ও শুল্ক-সংক্রান্ত অপরাধ। তবে মানবচুল সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় যদি প্রতারণা, জোরপূর্বক সংগ্রহ, দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে অস্বাভাবিক কম দামে চুল কেনা কিংবা চুরি জড়িত থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু চোরাচালানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
মানবচুলের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। উইগ, হেয়ার এক্সটেনশন, কসমেটিকস ও সৌন্দর্যশিল্পে প্রাকৃতিক চুলের চাহিদা বহু দেশে রয়েছে। বিশেষ করে উন্নতমানের দীর্ঘ চুলের দাম তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এ চাহিদাই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চুল সংগ্রহ ও পাচারের একটি বাজার তৈরি করেছে। গ্রামের নারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত চুল, সেলুনের বর্জ্য চুল কিংবা বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া চুল একত্র করে ব্যবসায়ীরা বড় চালানে পরিণত করতে পারে। বৈধ বাণিজ্য ব্যবস্থার বাইরে এ ধরনের পণ্য সীমান্ত অতিক্রম করলে রাষ্ট্র রাজস্ব হারায় এবং অপরাধী চক্র লাভবান হয়।
চোরাচালানের ব্যাপ্তি বুঝতে হলে শুধু আটক হওয়া চালানের হিসাব দেখলে চলবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়া পণ্য মূল প্রবাহের একটি অংশমাত্র। যে চালান আটক হয়, তা দৃশ্যমান; যে চালান অদৃশ্যভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যায়, তার হিসাব থাকে না। ফলে চোরাচালানের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। মানবচুলের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে। কোথা থেকে কত চুল সংগ্রহ হচ্ছে, কোন পথে যাচ্ছে, কত দামে বিক্রি হচ্ছে, এর কতটুকু বৈধ আর কতটুকু অবৈধ—এসব তথ্যের সমন্বিত চিত্র সহজে পাওয়া যায় না। এখানেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা প্রকাশ পায়। সীমান্ত নিরাপত্তা অনেক সময় মাদক, অস্ত্র বা মানুষ পারাপারের মতো দৃশ্যমান ঝুঁকিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।
চোরাচালানের আরেকটি বড় কারণ সীমান্তবর্তী মানুষের অর্থনৈতিক দুর্বলতা। সীমান্ত এলাকার বহু মানুষ কৃষি, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা অনানুষ্ঠানিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে যদি বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকে এবং অবৈধ পথে অল্প সময়ে তুলনামূলক বেশি আয় করা যায়, তাহলে কিছু মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে। শুরুতে তারা হয়তো চোরাচালানের প্রকৃত ব্যাপ্তি বা আইনি ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনও থাকে না। বড় চক্রের জন্য এরা হয়ে ওঠে সহজে ব্যবহারযোগ্য বাহক।
সীমান্ত সুরক্ষার অর্থ শুধু মানুষ বা বড় চালান আটকানো নয়। সীমান্ত অর্থনীতির প্রতিটি অস্বচ্ছ প্রবাহ শনাক্ত করাও এর অংশ। মানব পাচার রোধ করতে যেমন মানুষকে সুরক্ষা দিতে হয়, তেমনি চোরাচালান রোধে বৈধ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হয়। সীমান্তে কাঁটাতার অপরাধ ঠেকাতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্য, দুর্বলতা, দুর্নীতি ও অবৈধ মুনাফার বাজারকে একা কাঁটাতার দিয়ে থামানো যায় না। এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইন, সামাজিক মোটিভেশন, স্বচ্ছ বাণিজ্য, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দেশবাসীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ বৈধ জীবিকার সুযোগ।
এই জায়গায় মানব পাচারের সঙ্গে চোরাচালানের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্রও রয়েছে। যে সীমান্তপথে অবৈধভাবে মানুষ পারাপার হয়, সেই পথেই অন্য পণ্যও চলাচল করতে পারে। একটি এলাকায় যদি সংঘবদ্ধ পাচারকারী নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়, তাহলে তারা একাধিক অবৈধ বাণিজ্যে নিজেদের অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ, মানব পাচার, মাদক, অস্ত্র ও পণ্য চোরাচালানকে সবসময় আলাদা আলাদা অপরাধ হিসেবে দেখলে সীমান্ত অপরাধের প্রকৃত নেটওয়ার্ক ধরা কঠিন হবে।
চোরাচালানের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের রাজস্বে। বৈধ আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও অন্যান্য সরকারি ফি আদায় হয়। কিন্তু পণ্য অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করলে রাষ্ট্র সেই রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। বড় পরিসরে এটি বৈধ ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ বৈধ ব্যবসায়ীকে শুল্ক, কর, পরিবহন ব্যয় ও নানা বিধিবিধান মেনে ব্যবসা করতে হয়; চোরাকারবারি এসব ব্যয় এড়িয়ে বাজারে কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারে। ফলে বৈধ ব্যবসা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
চোরাচালানের সামাজিক প্রভাব আরও গভীর। একটি এলাকায় অবৈধ অর্থের প্রবাহ বাড়লে সেখানে অপরাধী নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল তরুণরা সহজ আয়ের প্রলোভনে যুক্ত হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে অপরাধী চক্রের যোগাযোগ তৈরি হলে আইনের প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় চোরাচালান একটি অপরাধ না থেকে স্থানীয় অর্থনীতি ও ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে পারে।
মানবচুলের ক্ষেত্রে আরও একটি সামাজিক প্রশ্ন রয়েছে। চুল সংগ্রহের ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি যুক্ত থাকেন দরিদ্র নারী ও নিম্নআয়ের মানুষ। তাঁদের কাছ থেকে চুল কেনা বৈধ ব্যবসার অংশ হতে পারে, কিন্তু যদি তথ্যের অসমতা ও দরকষাকষির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিক কম দামে চুল সংগ্রহ করা হয়, তাহলে সেখানে শোষণের প্রশ্ন ওঠে। একজন নারী হয়তো কয়েক মাস ধরে চুল বড় করেছেন, কিন্তু তার প্রকৃত বাজারমূল্য সম্পর্কে ধারণা নেই। মধ্যস্বত্বভোগী সেই অজ্ঞতার সুযোগ নিলে মূল্যশৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিই বঞ্চিত হন।
অন্যদিকে, চোরাচালানের সঙ্গে পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও থাকতে পারে। বিশেষ করে যখন বিভিন্ন ধরনের পণ্য একই অবৈধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। অনিয়ন্ত্রিত পণ্য পরিবহন, অস্বাস্থ্যকর সংরক্ষণ এবং উৎস সম্পর্কে অস্বচ্ছতা বাজারের ভোক্তাদেরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই মানবচুলকে শুধু ‘নিরীহ পণ্য’ হিসেবে দেখলে চলবে না; এর উৎস, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির পুরো শৃঙ্খলকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
তবে চোরাচালান বন্ধের নামে সীমান্তবর্তী দরিদ্র মানুষের জীবিকা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং বৈধ ব্যবসার সুযোগ তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। মানবচুল সংগ্রহ ও রপ্তানির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, বাজারদর সম্পর্কে স্থানীয় মানুষকে তথ্য দেওয়া, ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ বাধ্যতামূলক করা এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহশৃঙ্খল যাচাই করা যেতে পারে। এতে বৈধ ব্যবসা যেমন উৎসাহিত হবে, তেমনি অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ কমবে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ, সন্দেহজনক লেনদেন বিশ্লেষণ এবং সীমান্তের দুই পাশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্য বিনিময় চোরাচালান দমনে কার্যকর হতে পারে। শুধু সীমান্তে পণ্য আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এজন্য পণ্য সংগ্রহকারী, অর্থদাতা, পরিবহনকারী, মজুতকারী এবং মূল ক্রেতার পুরো নেটওয়ার্ককে শনাক্ত করতে হবে। চোরাচালানের বাহক ধরা পড়ে, কিন্তু ‘মাস্টারমাইন্ড’ ধরা পড়ে না। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে অপরাধ থামবে না।
দিনে দিনে মানব পাচার থেকে মানবচুল পর্যন্ত চোরাচালানের পণ্যের ধরন বদলেছে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থনীতি বদলায়নি। যেখানে চাহিদা আছে, সেখানে সরবরাহের পথ তৈরি হয়; যেখানে বৈধ পথে খরচ ও জটিলতা বেশি, সেখানে অবৈধ পথের আকর্ষণ বাড়ে; আর যেখানে দারিদ্র্য ও দুর্বল শাসন আছে, সেখানে অপরাধী চক্রের শিকড় গভীর হয়।
তাই মানবচুলের মতো আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটি চোরাচালানও আমাদের জন্য বড় হয়ে দেখা দেওয়া নেতিবাচক খবর। সীমান্ত সুরক্ষার অর্থ শুধু মানুষ বা বড় চালান আটকানো নয়। সীমান্ত অর্থনীতির প্রতিটি অস্বচ্ছ প্রবাহ শনাক্ত করাও এর অংশ। মানব পাচার রোধ করতে যেমন মানুষকে সুরক্ষা দিতে হয়, তেমনি চোরাচালান রোধে বৈধ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হয়। সীমান্তে কাঁটাতার অপরাধ ঠেকাতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্য, দুর্বলতা, দুর্নীতি ও অবৈধ মুনাফার বাজারকে একা কাঁটাতার দিয়ে থামানো যায় না। এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইন, সামাজিক মোটিভেশন, স্বচ্ছ বাণিজ্য, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দেশবাসীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ বৈধ জীবিকার সুযোগ।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের।
fakrul@ru.ac.bd
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন