বিজ্ঞাপন
অনন্ত পৃথ্বীরাজ
কবিতা হলো এক ধরনের পাগলামি। বলা চলে, মদ্যপান করা মাতালের মাতলামির নির্যাস। কবিজীবনে এই পাগলামির সূচনা হয় ম্যাডনেস বা অস্থিরতার তাড়না থেকে। যা কবিকে প্রচলিত বাস্তবতার বাইরে অন্যতর এক বাস্তবতার দিকে ধাবিত করে। কবিতার ক্ষেত্রে ধারণাগত যুক্তি-শৃঙ্খলা, কখনো কখনো অসংলগ্ন ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। সেই অন্যতর বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে কবি তার মানসচক্ষে যা দেখেন; যা কিছু মনে মনে উপলব্ধি করেন, তাই হয়তো কবিতা আকারে প্রকাশ করতে চান; আর এই প্রকাশের চারুদক্ষতাই একজন কবি থেকে অন্যজনকে আলাদা করে তোলে।
বাংলা কাব্যকলায় মামুন রশীদ সমসাময়িক কবিদের মধ্যে শিল্পসফল ও প্রাগ্রসর একটি নাম। তিনি পাঠকমহলেও জননন্দিত। মামুন রশীদের পাঠকপ্রিয়তা তার কবিতার আঙ্গিক বিবেচনাপ্রসূত। কবির বাস্তব অভিজ্ঞতা নির্যাস কবিতার প্রতিটি পঙক্তি পাঠক হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। সৃষ্টি করে ভিন্ন ভিন্ন আবহ। মামুন রশীদ আপাদমস্তক একজন কবি এবং জাতকবি। কবিতা ছাড়াও সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতে তার স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ রয়েছে। তিনি কবিতা লেখার পাশাপাশি ছোটদের জন্য গল্প লেখেন; লেখেন উপন্যাস ও মুক্তগদ্য। মামুন রশীদ পেশায় সংবাদকর্মী। সাংবাদিক হওয়ার পরও তার লেখা কবিতা ও গল্প নিছক সংবাদ বা খবর না হয়ে সাহিত্যগুণে ঋদ্ধ হয়ে উঠেছে। তার কবিতায় মানুষের জীবনপ্রবাহ, কথায় পরিমিতিবোধ, কাব্য সৌন্দর্য এবং জীবনের গভীরতা পরিমাপের ধরন চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। মামুন রশীদের কবিতায় ইতিহাস উঁকি দেয়। অধিকারে, প্রশ্নে, নানাবিধ আন্দোলন সংগ্রাম যেন ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। মনে হয়, এ যেন সেলুলয়েডের পর্দায় ভেসে ওঠা কোনো কাল্পনিক সিনেমা। তবে, এ-কথাও সত্য যে, একটি ভালো সিনেমা থেকে মানুষ তার জীবনপাঠ শিক্ষা নিতে পারে। ইতিহাস তো অতীত ঘটনার বিবরণী; যা বই পড়ে, ভাষণ শুনে জানার চেষ্টা করা যায়। এখানে সবচেয়ে করুণ সত্যটি হলো, ইতিহাস মানুষকে শিক্ষা দিলেও মানুষ ইতহাস থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে না।
কবিতায় উত্তরাধুনিক ভাবনা
সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন ও সমৃদ্ধ শাখা হলো কবিতা। যুগ যুগ ধরে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কবিতার মাধ্যমে। হাজার বছরের বাঙালির জীবনাচরণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে কবিতা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ থেকে অদ্যাবধি লিখিত কবিতার রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণের সম্মিলনে মানুষের চাওয়া-পাওয়া, না পাওয়ার বেদনা; এমনকি দ্রোহ-বিদ্রোহ ও সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে কবিতা। শুধু কাব্যনন্দনই নয়, সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব-স্পন্দনের উপলব্ধিও কবিতার মধ্যে বিরাজমান। কবিতা মানুষের মস্তিষ্কজাত অনন্য সাহিত্যরূপ। কবিতা সৃষ্টি হয় কবির মানস-কল্পনায়। জীবন-বাস্তবতার নিরিখে কবি কাব্য সৃজন করেন। কবি মূলত নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, কল্পনা ও বাস্তবতার নির্যাসে নির্মাণ করেন কবিতার অবয়ব। কবিতা পাঠ করে পাঠকের মনে আনন্দ-বেদনা অথবা করুণ রসের উদ্রেক তৈরি করলে তা সার্থক কবিতায় রূপায়িত হয়।
চিমনির ধোঁয়া ওঠা বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়া, অথবা জীবন ঘঁষে আগুন বের করে—সেই আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে তৈরি হয় একেকটি সার্থক কবিতার প্লট। ভালো কবিতা লেখার তাড়না সিরিয়াস কবিদের মধ্যে সব সময় লক্ষ্য করা যায়। সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য একটি কবিতা লেখার জন্য কবিদের নানা প্রতিকূল পরিবেশ ও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে সবাই যে, এই কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করতে পারেন, তেমনটা ভাবা সমুচিত নয়। যে কয়জন কবি সময়ের কালস্রোতে নিজেদের আলাদা করে জাত চেনাতে সক্ষম হয়েছেন—তাদের মধ্যে অন্যতম কবি মামুন রশীদ। তিনি কবিতায় বিশ্বলোকের সন্ধান করেন। সমুদ্রে ঝিনুক খুঁজতে গিয়ে তুলে আনেন মুক্তোর দানা। কবি মামুন রশীদের কবিতা পাঠককে নিয়ে যায় চেতন থেকে অধিচেতন; বিশেষত এক গভীর চিন্তার জগতে। তার কবিতা সময় নিয়ে পড়তে হয়। পড়তে গিয়ে ভাবতে হয়। ভাবতে গিয়ে মনে আসে, নানা জল্পনা-কল্পনা। কখনো আফসোস অথবা অনুশোচনায় মনটা দগ্ধ হয়। আবার সৌন্দর্য অনুভূতির জায়গায় কবি আমাদের নিয়ে যান রোমান্টিকতার জগতে। তৈরি করেন নতুন এক আবহ। আবার পরক্ষণেই কবিতার ভাব পাল্টে যায়। কবিতার জমিনে রিয়ালিটি ভর করে। তৈরি হয় নতুন সাসপেনশন, সুপার সাসপেনশন; প্লট ও এন্টিপ্লটের সামারাইজ ব্যবহার করে কবি পাঠককে নিয়ে যান সুররিয়ালিজমের দরজায়। পাঠকের ভাবনায় তখন জীবন সমুদ্র; জলদি দে সাঁতার। কিন্তু তখনই মনে আসে একটি সহজ প্রশ্ন, সাঁতার জানো তো হে? কারণ মামুন রশীদের কবিতার পটভূমি ধরতে গেলে পাঠককে হতে হয় মস্তিষ্কচাষি। আর যদি কবিতা চাষাবাদের ন্যূনতম অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে আরও ভালো হয়! এ ক্ষেত্রে সমসাময়িক কবি ও কবিতা নিয়ে মামুন রশীদের নিজের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য, ‘সব কবিরই চেষ্টা থাকে কবিতায় নিজের স্বাতন্ত্র্য্য ফুটিয়ে তোলার। কবিতায় নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চান সব কবিই। আর এটা করতে গিয়ে কেউ কেউ নিজের ভেতরের জটিলতা, বৈপরীত্য, বোধকে প্রাধান্য দেন। আবার কেউ অন্তর্গত বেদনার সঙ্গে চেনা দৃশ্য, চেনা পরিবেশকে মিলিয়ে পাঠকের সামনে সহজ, সুন্দর একটি দৃশ্য নির্মাণ করেন। যেন সেই পরিচিত দৃশ্যাবলি অদ্ভুত স্বপ্নময় হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে। পাঠক নিজেকে নতুন করে দেখতে পায় কবির দেখানো আয়নায়।’
মননভূমি ও কবিতাযাত্রা
মামুন রশীদের প্রতিটি কবিতার পেছনে নানা গল্প লুকিয়ে থাকে। তিনি মূলত কাব্যফর্মে গদ্যভাষা ব্যবহার করে আমাদের তার নিজের এবং সমকালের নানা ঘটনা এবং এর পেছনের গল্প বলতে চান। এসব গল্প যেন কবির উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। তাই কবি তার কাব্যফর্মে মানব ইতিহাস, সমাজ-সভ্যতা, শাসকের রাষ্ট্র-ক্ষমতা, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র, মানুষের ভোগবাদী চেতনা, প্রজাতন্ত্রের অধিবাসীদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা এবং স্মৃতি-বিস্মৃতির সুগভীর অস্তিত্বের স্মারকচিহ্ন তুলে ধরেন। তার প্রতীক ও মেটাফোরগুলো পাঠকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্রোতে মিশে গিয়ে গভীর ও বহুমাত্রিক অর্থের জন্ম দেয়। যেমন- মানুষের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে। প্রিয়জনদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। আপনজনেরা ভুল বুঝে দূরে সরে যায়। হারিয়ে ফেলা সম্পর্কগুলো বেদনায় কাতর করে। নিজের কষ্ট, দেশের মানুষের কষ্ট, সমাজ-সভ্যতার ক্রমোন্নতির পেছনে নষ্টদের হাতের ইশারার ভয়াবহ অথচ অনাগত নিয়তি; এসব ভাবনা কবিকে অস্থির করে তোলে। স্মৃতির অবিনশ্বরতা এবং আধুনিক সভ্যতার গভীর অন্তর্দহনকে একসাথে ধারণ করে কবিতা যেন সমকালীন বাংলা সাহিত্য-ধারার এক অনন্য ও শাশ্বত পাঠের আহ্বান জানিয়ে যায়। মামুন রশীদের রচনাসমগ্রের কাব্যশৈলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার কাব্যে ব্যবহৃত ভাষা তিনটি প্রধান আত্মিক বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। প্রথমত, তার কাব্যে ব্যবহৃত কথামালার ভাষ্যরূপ অনেকটা সংলাপধর্মী; যা এক অনন্য দৃশ্যনির্ভর কাব্যভাষার আবহ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয়ত, তার কবিতায় উপমা, অলংকার ও প্রতীকের বহুমাত্রিক ও বহুমুখী রূপায়ণ ঘটেছে। তৃতীয়ত, কবিতায় উত্তরাধুনিক সমাজচিত্র তথা পরাবাস্তব চেতনার সার্থক ও নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করতে কবি সমর্থ হয়েছেন। তাই বলা যায়, ‘কাব্যভাষায় রবীন্দ্র চেতনার অন্তর্জাগতিক বিস্তার কিংবা জীবনানন্দের নিঃসঙ্গ স্মৃতিলোকের ছায়া থাকলেও, মামুন রশীদের পরিবেশনভঙ্গি ও শব্দচয়ন একেবারেই নিজস্ব ও সতেজ।’
‘আমার কবিতা’ সংকলন প্রসঙ্গে
সম্প্রতি মামুন রশীদের কবিতা সংকলন ‘আমার কবিতা’ পড়ে শেষ করেছি। পূর্বে প্রকাশিত মোট পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে সংকলনটি প্রকাশিত। কাব্যগ্রন্থগুলো হলো—কালোপাতা ওড়ো সাদাছাই (২০০৫), কুশল তোমার বাঞ্ছা করি (২০০৯), তোমার পরে মেঘ জমলে (২০১৩), এই বইটির কোনো নাম দিবো না (২০১৪), আমি তোর রাফখাতা? (২০২০)। বেহুলাবাংলা প্রকাশনী থেকে ২০২৫ সালে প্রকশিত দুইশ বারো পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ এ সংকলনে মোট একশ ছাপ্পান্নটি কবিতা স্থান পেয়েছে। শুভেচ্ছা মূল্য মাত্র তিনশ টাকা। সমকালীন সমাজ পরিপ্রেক্ষিত ও সাহিত্য-দর্শন সম্পর্কে সংকলনগ্রন্থের ভূমিকায় কবি অকপটে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। এ সম্পর্কে কবির সহজ স্বীকারোক্তি, ‘ভালো কবিতা ছাড়া পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয় না। যোগাযোগ স্থাপনের সেই ব্যর্থতাই আমার কবিতা। খুব বেশি কবিতা আমি লিখিনি। লিখতে পারিনি। অথচ কবিতাকেই আঁকড়ে ধরতে চেয়েছি। লেখা শুরু করেছিলাম চিঠি ও গদ্য দিয়ে। তারপর হঠাৎ করেই পদ্যের দিকে ঝুঁকে পড়া। গদ্যের অনেক বছর পর, ১৯৯৬ সালে ছাপার অক্ষরে প্রথম পদ্যের সঙ্গে নিজের নামের দেখা মেলে। পেছনে ফিরে কবিতাগুলো পড়ার সময়ে বারবার মনে হয়েছে, এত দুর্বল লেখাগুলো আমারই! অথচ এদের অস্বীকারও করার জো নেই। কারণ ব্যর্থ হলেও প্রতিটি লেখার পেছনেই রয়েছে কোনো না কোনো গল্প। সেই গল্পগুলোর কথা যে লিখছে শুধু সেই জানে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই স্মৃতিরোমন্থনের দিকে ঝোঁকে। লেখাগুলোকে দুই মলাটের মাঝে ধরে আমিও সেদিকেই ইঙ্গিত রাখলাম।’
আরও পড়ুন
‘দুখু মিয়া’ ছাড়াও আর কী কী নামে ডাকা হতো নজরুলকে?
কবিতা পর্যালোচনা
সমকালীন কবিতার শরীরে চোখ রাখলে বোঝা যায়, কবিতার শরীরে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও চিত্রকল্প, সময়, চরিত্র, প্রবাহমানতা, পরিমিত কাব্যালঙ্কার, রূপক, অনুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা, ছন্দ ইত্যাদি চমৎকারভাবে যথাযথ স্থান করে নিচ্ছে। কবি মামুন রশীদের কবিতাও এ-ধারার ব্যতিক্রম নয়। কবিতায় আধুনিক নগর মানুষের কল্পিত নিসর্গ স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে অন্যরকম অনুভূতি ও সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। কবি সমসাময়িক আবহকে শব্দ ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে ফ্রেমবন্দি করার প্রয়াস চালান অবিরত। তাই শৈশব, কৈশোরের মধুময় সময়গুলো কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। সত্যি বলতে, আমাদের এই পার্থিব মানব জীবন এক অর্থে দুঃখ-বেদনার আধার। কবিরা মানুষের জীবনের নানাবিধ সুখ-দুঃখকে শব্দকল্পে বন্দি করে শিল্পরূপ দান করেন। তাই প্রেম, কাম ও হৃদয়ের বহুবর্ণিল বিচ্ছুরণে বাংলা কবিতা টিকে আছে যুগ-যুগান্তর। মানুষ কেবল নিজেদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সেখানে রং বদলে নেয়। মামুন রশীদের কবিতা যেন বেদনার এক অস্ফূট সিম্ফনি হয়ে হৃদয়পটে জেগে থাকে।
‘মুক্তি’ কবিতায় কবি সমাজ-মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের এক চিরন্তন দার্শনিক রূপ তুলে ধরেছেন। কবি ‘মুক্তি’ বা মানসিক প্রশান্তিকে সব সময় আনন্দের ঝরনাধারা বলে অভিহিত করতে নারাজ। তার মতে, ‘মুক্তি’ শব্দের মধ্যেই দুটি সত্তা বিরাজমান। সত্তা দুটি হলো ইতি ও নেতি। মূলত একজন মুক্তি দেয়; অপরজন মুক্তি নেয়। তবে এই লেনাদেনার মাঝে বিস্তর পার্থক্য। আমাদের সমাজে সুপারনোভার বিস্ফোরণের বিভ্রমকে চাঁদের জ্যোৎস্না ভেবে ভুল করা লোকের অভাব নেই। তেমনি ‘মুক্তি’ ভেবে নতুন শৃঙ্খলে জড়ানো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কবির ভাষায়, ‘মুক্তি, তার সমারোহ যে জলধারা নিয়ে/ নেমে আসে ভেসে যায় এপার-ওপার, আদিগন্ত।/ তাকে সবসময় আনন্দের ঝর্ণাধারা বলে/ অভিহিত করার কিছু নেই। যে দেয়,/ যে পায়, দুইয়ের মাঝে ফারাক বিস্তর।/ কেন নদী বারেবারে মিশে যেতে চাইবে নীলে,/ কেন ছোটাছুটি, কেন দৃষ্টিসীমায় বেঁধে রাখার আকুতি/ ঘরের ভেতর থেকে কেন প্রতিদিন সাঁকো বানানোর/ বিপুল পরিশ্রম মিলিয়ে দিতে চাইবে হেসে খেলে?’
‘স্মৃতি’ কবিতায় কবি প্রাত্যহিক জীবনের অনবদ্য রূপ তুলে ধরেছেন। অতীতকে মনে রাখা সমাজে বাস করা মানুষের স্বভাবধর্ম। প্রত্যেক ব্যক্তির মানসচেতনা আলাদা। এখানে নিজের অতীত ভুলে যাওয়া মানে নিজের আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়ার সামিল। যারা শিকড় ছিন্ন করে পুরাতন সম্পর্কের ইতি টেনে—নতুন পরিচয়ে বেড়ে উঠতে চায়; নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিতে চায়, তাদের পুরাতন ছলচাতুরি এক সময় নিজের ভিতকে কাঁপিয়ে দেয়। আর এটাই জীবনের পরাবাস্তবতা। ‘স্মৃতি’ রোমন্থন করতে গিয়ে দেখা যায়, বীভৎস্য ট্রাকের নিচে থেঁতলে পড়ে থাকা বসন্তের শিমুল, কী কুৎসিত তার রূপ! জীবনের প্রতি তখন প্রচণ্ড ঘৃণা সৃষ্টি হয়। তখন মানুষের মধ্যে তৈরি হয় নতুন বিষণ্নতা। ব্যর্থতার গ্লানি পেছনের দিকে টানে। খুব করে জীবন থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু যাবার জায়গা কোথায়? কবির ভাষায়, ‘ঘুমের ভেতরে কোনো স্মৃতি জিইয়ে রাখতে নেই।/ দেহের প্রতিটি ক্ষতে যদি ফুটিয়ে তুলতে থাকো/ গোলাপের সৌন্দর্য-তাকেও জীবনের স্বাদবঞ্চিত/ অনভ্যাসের ভেতর ঢুকিয়ে দিলে পরাবাস্তব বাঁশির সুর/ বাতাসকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়।’
‘একাকিত্ব’ কবিতায় অস্তিত্বকে বোঝার জন্য নাটকীয়ভাবে হাইপো থিসিস রীতি প্রয়োগ করেছেন। সমকালীন বিশ্ব-পরিস্থিতি তুলে ধরতে কবি কৌশলে স্মৃতিভ্রমের আশ্রয় নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিকে একসূত্রে বাঁধতে চেয়েছেন কবিতার বন্ধনে। সমকালে বিশ্ব রাজনীতি প্রচণ্ড অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদ মাথাচারা দিয়ে ওঠার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুখ-শান্তি। কবি যেন স্মৃতিভ্রমের আশ্রয় নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য সভ্যতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ফিলিস্তিন, জেরুজালেম, আলকুদস, আল-আকসার চির দুঃখ-বেদনা, ধ্বংসযজ্ঞ আর দুর্দশার কথা তুলে ধরে আধিপত্যবাদী জুলুম থেকে পরিত্রাণ কামনা করেছেন। কবির ভাষায়, ‘লেভেল ক্রসিংয়ে হুটোপুটি করছে কয়েকটি নেকড়ে।/ দূরে শ্বেতশুভ্র এক খরগোশ স্তব্ধ হয়ে আসা আকাশের/ রঙের কাছে শিখছে একাকিত্ব। হারিয়ে যাওয়া সময়কে/ এক, দুই, তিন, চার, পাঁচগুণে ভাবতে শিখছে, দেখছে/ সূর্যাস্তের ভেতর কেমন মিলিয়ে যায় রাত্রির অন্ধকার।’
‘একটি অসমাপ্ত চুমু’ কবিতায় কবির রোমান্টিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। পাশাপাশি কবিতাটির গঠনশৈলীতে কবি চমৎকার শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। প্রেম-ভালোবাসায় রাগ, অভিমান থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অভিমান প্রেমের অলংকার। প্রেম-ভালোবাসায় অভিমানের কারণে কারো কারো কপাল খোলে, আবার এর বিপরীত দিকটিও লক্ষ্য করা যায়। প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ে অভিমানের পাহাড় জমা হলে আপনা-আপনি পরস্পরের কথা বলা বন্ধ। তখন মনের মধ্যে দুঃখের হাহাকার ভিড় করে, ফলে সম্পর্কের স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ হয়ে যায়। কবির ভাষায়, ‘অভিমানে কখনো কখনো খুব লাভ হয়/ কপাল খুলে যায় কারও কারও/ উধাও মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মাধবীলতা।/ তখন লুকিয়ে রাখা রাশি রাশি শব্দরাও/ চুপচাপ পাশাপাশি বসে থাকার ভেতরে পিয়ানোর/ সুর তোলে-আর নিবিড় বাতাসের মোহনায়/ নির্ভার তোমার গালে আছড়ে পড়ে একটি স্পর্শ।’
‘প্রেম’ কবিতায় রহস্যের বৈচিত্র্যময়তা তুলে ধরে অনিন্দ্য সৌন্দর্যলোকের সন্ধান করেছেন। অপরদিকে ‘আলিঙ্গন’ কবিতায় কবি পৌরাণিক আবহে বাঙালি নর-নারীর শরীরী সৌন্দর্য ও দৈহিক আকর্ষণের দিকে গভীরভাবে ইঙ্গিত করেছেন। এ কবিতায় মুঘল সম্রাট শাহজাহানকে প্রেমিক পুরুষের দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে, নর-নারীর শরীরী আলিঙ্গন বহুদিনের বিষাদ ও হতাশাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে ‘আলিঙ্গন’ কবিতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো— ‘সম্রাজ্ঞীর মতো চরাচর জুড়ে তোমার বিভা/ অবাক তাকিয়ে দেখে যত মুগ্ধ পাগল/ আর খ্যাতির বৃত্তে আছড়ে পড়া যুবকের দল।/ তোমার প্রসারিত-হাত করতল থেকে ঝরে পড়ে স্নেহ,/ কেউ কেউ তাকে ভালোবাসা বলে/ কুড়িয়ে জমা রাখে কাঁচের বয়ামে।’
‘বাংলাদেশ’ প্রকৃতির অনিন্দ্য রূপসি কন্যা। বাংলাদেশকে রূপের রানি বলা হয়। ষড়ঋতুর রূপ-বৈচিত্র, সৌন্দর্য পিপাসুদের বরাবরের মতো আকর্ষণ করে। ‘বর্ষা’ কবিতায় বাংলা মায়ের সৌন্দর্যচিত্তের চিরন্তন সত্তা ফুটে উঠেছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের নানা উপাদান পর্যালোচনার ক্ষেত্রে কবিতাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষত, বর্ষাকে কবি রোমান্টিক আবহে পরিবেশন করেছেন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এ দেশের মানুষের কাছে বর্ষা আলাদা গুরুত্ব বহন করে আসছে। ‘বর্ষা’ মানেই কর্মহীন মানুষের হাহাকার আর প্রেমিক-প্রেমিকার বিরহ-বেদনার উত্তাল তরঙ্গ। কবি বর্ষাকে পাড়ার ‘ছলনাবিহীন’ মেয়ের সাথে তুলনা করেছেন। কবিতাটিতে বরেণ্য কবি আল মাহমুদের কবিতার শিল্প-ধারার প্রভাব চোখে পড়ে। কবির ভাষায়, ‘বর্ষা, আমাদের পাড়ার মেয়ে ছলনাবিহীন। ভেতরে আগুন নেই, কান পেতে শোনা যায় নূপুরের ছন্দ। বিসর্জনে, দেখা যায় উপচে পড়ছে স্রোত। হাসে পিছু পিছু শোভাযাত্রা নিয়ে উঠে আসা স্বপ্নের পলিমাটি। সবুজ মাঠের ভেতর ঝলসানো দাঁত কাটতে থাকে নদী ও পাড়ের সীমানা।’
‘সমুদ্র রাখে না কিছুই’ কবিতায় কবি সমুদ্রের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। সমুদ্রকে কবিতায় নানাভাবে ইঙ্গিতবাহী করা হয়েছে। সমুদ্র যে মানুষের বুকে কত-শত ফটোগ্রাফ এঁকে দেয়—তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সমুদ্র যেন চির-দুঃখী মানুষের একান্ত আপনজন। সমুদ্রের বুকে কান পাতলেই শোনা যায় মানুষের হৃদয়ের হাহাকার। শঙ্খের ধ্বনির মতো হৃদয়ে বাজে বিরহের বাদ্য। কবির ভাষায়, ‘ইতিহাসের পাতা খুলে কবে কোন মোহমুগ্ধ সন্ত/ সফেন ফেনার মাঝে খুঁজেছিল প্রিয়মুখ/ ভয়ার্ত প্রেয়সী তার- নির্বাক, বিস্ময়ে লুটিয়ে/ পড়তে চেয়েছিল নিজেরই জমানো ছায়া।’
‘আমাকেই ছেড়ে যায় সবাই, আমি নই’ কবিতায় কবির বিশ্ব-প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় অনুষঙ্গের সঙ্গে মানবজীবনকে মিলিয়ে দেখার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরি’ কবিতার প্রেক্ষাপট খেয়াল করলে দেখা যায়, সেখানে সৃষ্টি-কর্মরূপী সোনার ধান নেওয়ার জন্য জাগতিক সবাই উদগ্রীব থাকলেও, কবিকে গ্রহণ করার মতো কেউ নেই। আমাদের দেহ খাঁটি মাটি দিয়ে তৈরি। সুফিবাদের তত্ত্বানুয়ায়ী একদিন এ দেহের সবকিছু ফানা হবে। মাটির সম্পদ মাটিতেই হবে লীন। ব্যক্তিসত্তা ছাড়া সবাই একদিন আমাকে ছেড়ে যাবে। কিন্তু আমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারব না। আমি আমাতেই রয়ে যাব অনন্তকাল। কবি লিখেছেন, ‘নিরুদ্দেশে, দূরের কার্নিশে নিজেকে অমর, অক্ষয় করার/ অপ্রাকৃত আনন্দে গা খুঁড়ে খুঁড়ে লেখা নাম, বেদনার/ নীল ক্ষতে ধরে রাখি। প্রিয় অনুরাগে ভ্রমণ পিপাসু/ মানুষ চলে যায়। ভোরের হাওয়ায় বর্ষাভেজা/ আকাশের নিচে যে লেখে নাম- সেও ভুলে যায়।’
মামুন রশীদ বাংলা ভাষার একজন সম্ভাবনাময় তরুণ কবি ও কথাকার। কবিতার সঙ্গে সঙ্গে তার গদ্যসাহিত্যও সাবলীল ও সুখপাঠ্য। অন্তত, মুড়ি খেতে খেতে পড়ার সময় পাঠকের কোনো ধৈর্যচ্যুতি হয় না। কবিতার প্লট বিনির্মাণের ক্ষেত্রে কবি অত্যন্ত সচেতন ও নিরীক্ষারপ্রবণ। কবিতার আঙ্গিক ও গঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে কবির প্রতিভা ও দক্ষতার পরিচয় মেলে। সত্যি বলতে, জাত কবিদের কখনো কারও দ্বারস্থ হতে হয় না। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কল্পনা ও বাস্তবতার নির্যাস মিশিয়ে কবি নির্মাণ করেন কালজয়ী সব কবিতা ও সাহিত্যকর্ম। মামুন রশীদ সেই সকল কবিদের একজন, যারা সমসাময়িক জীবন-বাস্তবতাকে কাব্যের কাঠামোয় বেঁধে সময়কে স্টপওয়াচের ওয়ারে ধরে রাখতে পারেন। তার সময়ের অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকদের প্রবণতা বিবেচনা করে আমরা এ কথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, উত্তরকালে কবি মামুন রশীদ বাংলা কাব্যবলয়ে একটি স্থায়ী আসন লাভ করবেন বলেই বিশ্বাস। আমরা তার কাব্যের উৎকর্ষ এবং কবি জীবনের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।
লেখক: কবি ও এমফিল গবেষক।
আরও পড়ুন
প্রকৃতি ও মানুষ: অধ্যাপক গোলাম মুরশিদকে স্মরণ
এসইউ
বিজ্ঞাপন