জাতীয়

মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে শাড়ি-স্যান্ডেল পরে ম্যারাথনে মা

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
  ম্যারাথনের ট্র্যাকে তখন একের পর এক ছুটে চলেছেন প্রতিযোগীরা। কারো পায়ে দামি স্পোর্টস শু, কারো পরনে ঝকঝকে ট্র্যাকস্যুট। প্রস্তুতিও যেন পেশাদার অ্যাথলিটদের মতো। সেই ভিড়েই ছিলেন ৪৭ বছরের এক নারী। পরনে সাধারণ ছাপা শাড়ি, পায়ে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। তাকে দেখে অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, এই দৌড়ে তার জায়গা কোথায়! কিন্তু রমাবাই রণবীরের কাছে ওই দৌড় কোনো শখের ছিল না। তার কাছে আড়াই কিলোমিটার পথ মানে ছিল দুই মেয়ের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ফিনিশিং লাইনের ওপারে ছিল ৩ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়েই মেয়েদের বই, টিউশন ফি আর পড়াশোনার কিছু খরচ মেটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তাই বয়স, পোশাক কিংবা পায়ের স্যান্ডেল কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। মহারাষ্ট্রের বীড় জেলার বাসিন্দা রমাবাই। কয়েক বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। পরিবারটি মূলত কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। স্বামী না থাকায় সেই আয়ও আর আগের মতো ছিল না। তবু দুই মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি রমাবাই। সংসার চালাতে শুরু করেন একাধিক বাড়িতে কাজ। কোথাও রান্না করেন, কোথাও পরিচারিকার কাজ। একটি কাজ শেষ করে আরেকটি বাড়িতে ছুটে যান। সুযোগ পেলে বাড়তি কাজও করেন। তার কাছে পরিশ্রমের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। কারণ তার সামনে লক্ষ্য একটাই মেয়েদের যেন অভাবের কারণে পড়াশোনা থামিয়ে দিতে না হয়। ছোট মেয়ে বিএসসি পড়ছেন। বড় মেয়ে পূজা আবার পুলিশের চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে প্রতিদিনই নতুন করে লড়াই করতে হয় মাকে। মাত্র ৩ হাজার টাকার খবর বদলে দিল সব হিসাব। গত ৩০ আগস্ট, রোববার ভারতের মহারাষ্ট্রের বীড়ের আম্বাযোগাই শহরে আয়োজন করা হয়েছিল ‘অম্রুত দৌড়’ ম্যারাথন। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই আড়াই কিলোমিটারের দৌড়ের আয়োজন করা হয়েছিল। এখানে প্রথম পুরস্কার ছিল ৩ হাজার টাকা। অন্য কারো কাছে হয়তো অঙ্কটা খুব বেশি নয়। কিন্তু রমাবাইয়ের কাছে সেই টাকা ছিল অনেক বড়। কয়েক দিনের টিউশন ফি, মেয়ের প্রয়োজনীয় বই কিংবা পড়াশোনার কিছু খরচ অনেকটাই সামলে দেওয়া সম্ভব সেই অর্থে। তাই আর দ্বিতীয়বার ভাবেননি তিনি। পেশাদার দৌড়বিদদের সঙ্গে তিনিও দাঁড়িয়ে গেলেন স্টার্টিং লাইনে। দামি জুতোর ভিড়ে রমাবাইয়ে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। দৌড় শুরু হওয়ার পরই বোঝা গেল, লড়াইটা সহজ হবে না। হালকা বৃষ্টি হয়েছিল। রাস্তা কাদায় ভরে গিয়েছিল। প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরে দৌড়াতে গিয়ে বারবার পিছলে যাচ্ছিলেন রমাবাই। চারপাশ দিয়ে তখন ছুটে যাচ্ছেন স্পোর্টস শু পরা প্রতিযোগীরা। কিন্তু রমাবাই থামেননি। একসময় বুঝলেন, স্যান্ডেল পরে আর দৌড়ানো সম্ভব নয়। সঙ্গে সঙ্গে স্যান্ডেল খুলে হাতে তুলে নিলেন। তারপর খালি পায়েই শুরু করলেন দৌড়। পথের কাদা, পাথর, স্টোনচিপ কিছুই যেন তখন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ তার মাথায় তখন শুধু মেয়েদের মুখ। পড়াশোনার খরচ। বই কেনার চিন্তা। টিউশন ফি দেওয়ার হিসাব। দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি এগিয়ে গেলেন সবার সামনে। শেষ পর্যন্ত ফিনিশিং লাইন ছুঁয়ে প্রথম স্থান অর্জন করলেন রমাবাই।তবে জয় উদযাপনের মুহূর্তেও তার হাতে ছিল সেই প্লাস্টিকের স্যান্ডেল দু’টি। যেন সেটিই তার কাছে ট্রফির মতো মূল্যবান। এই গল্পের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি অবশ্য তখনো বাকি ছিল। রমাবাইয়ের ঠিক পিছনে ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করেন তার বড় মেয়ে পূজা। যে মেয়ে পুলিশের চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সেই মেয়েই মায়ের পর দ্বিতীয় হয়ে দৌড় শেষ করেন। একদিকে মায়ের হাতে ৩ হাজার টাকার পুরস্কার। অন্যদিকে মেয়ের চোখে পানি। উদ্যোক্তারা যখন মঞ্চে ডেকে রমাবাইয়ের হাতে পুরস্কারের টাকা ও সার্টিফিকেট তুলে দেন, তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, এই বয়সে এতটা দৌড়ালেন কী করে? একবারও থামলেন না কেন? রমাবাইয়ের উত্তর ছিল অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু তার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল একজন মায়ের পুরো জীবনসংগ্রাম। মেয়েদের বই কিনতে হবে। টিউশন ফি দিতে হবে। সেই চিন্তাই মাথায় ঘুরছিল তার। তাই থামার কথা ভাবেননি। ৩ হাজার টাকা তার কাছে ‘অনেক’। কারণ সেই টাকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মেয়েদের স্বপ্ন। ‘মা হারতে শেখেনি’। মায়ের দৌড় শেষ হয়েছে ফিনিশিং লাইনে। কিন্তু আসলে তার দৌড় অনেক দিনের। স্বামীকে হারানোর পর সংসার সামলানো থেকে শুরু করে একাধিক বাড়িতে কাজ করা, নিজের ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া প্রতিদিনই যেন তার কাছে একটি করে ম্যারাথন। সেদিন শুধু সেই লড়াইটাই চোখে দেখা গেল। আর সবচেয়ে সুন্দর বিষয়, সেই দৌড়ে মায়ের ঠিক পেছনে ছিলেন তার মেয়ে। যেন একজন মা তার মেয়ের জন্য যে পথ তৈরি করে দেন, সেই পথ ধরেই মেয়ে একদিন তার পাশে এসে দাঁড়াবে। পূজার চোখের জল আর অস্ফুট কয়েকটি শব্দই যেন পুরো গল্পটির সারাংশ হয়ে উঠেছিল ‘মা হারতে শেখেনি।’ সত্যিই তো, রমাবাইয়ের কাছে ম্যারাথন কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। ছিল জীবনের সঙ্গে লড়াই। দামি জুতো তার ছিল না। ছিল না আধুনিক স্পোর্টস পোশাক। ছিল না পেশাদার প্রশিক্ষণও। ছিল শুধু এক মায়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। আর সেই শক্তির কাছে সেদিন হেরে গিয়েছিল কাদা, ক্লান্তি, অভাব আর মানুষের তাচ্ছিল্য। রমাবাই ৩ হাজার টাকা জিতেছেন ঠিকই। কিন্তু তার চেয়েও বড় জয়। তিনি আবার প্রমাণ করেছেন, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করা মায়ের কাছে কোনো পথই খুব কঠিন নয়। কখনো শাড়ি পরে, কখনো প্লাস্টিকের মায়ের ঠিক পেছনেই মেয়ে ছিল হাতে, কখনো খালি পায়ে মায়েরা আসলে এভাবেই দৌড়ান। আর তাদের প্রতিটি দৌড়ের শেষ প্রান্তে থাকে সন্তানের একটু ভালো ভবিষ্যৎ। কেএসকে
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>