ব্রেকিং নিউজ
পলাতক আসামিদের দেশে ফেরাতে সরকার কোনো গাফিলতি করবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাঁধনের ওপর হামলায় জড়িত কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত কোর্তোয়ার প্রাচীরে আটকে গেল ইন্টার, রিয়ালের জয় টাঙ্গাইলে দুর্বৃত্তদের হামলায় যুবক নিহত স্থানীয় নির্বাচন: বিদ্যমান আইন ও বিধিতে একগুচ্ছ পরিবর্তনের প্রস্তাব ইসির ইরানের অভিযানে ধরা পড়ল মার্কিন সর্বাধুনিক ডুবোযান বিটিসিএলে যুবকের মৃত্যু: আনসার সদস্যদের জড়িত থাকার খবর ‘ভিত্তিহীন’ রূপপুর প্রকল্পে অগ্নিকাণ্ড: ৪০ ঘন্টায়ও স্বাভাবিক হয়নি বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট চরম উত্তেজনা, হাতাহাতির ম্যাচে হালান্ডের জোড়া গোলে সিটির জয় রাস্তার ওপর ময়লা ফেলায় প্রতিবাদ, চারজনকে কুপিয়ে জখম
জাতীয়

রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞান

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা প্রধানত কবি হিসেবেই চিনি। তাঁর পরিচয় গীতিকার, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক হিসেবেও সুবিস্তৃত। কিন্তু এই বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথের আরও একটি পরিচয় অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়—তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের একজন গভীরভাবে আগ্রহী পাঠক এবং বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তক। তিনি পেশাদার বিজ্ঞানী ছিলেন না, পরীক্ষাগারে কোনো নতুন সূত্র বা তত্ত্ব আবিষ্কার করেননি; কিন্তু বিশ্বপ্রকৃতিকে বোঝার জন্য বিজ্ঞানের যে অনুসন্ধান, তার প্রতি তাঁর ছিল আজীবন কৌতূহল।

আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র থেকে পরমাণুর অদৃশ্য জগৎ, আলো ও পদার্থ থেকে পৃথিবীর জন্ম, প্রাণের আবির্ভাব ও জীবজগতের বিকাশ—প্রকৃতির প্রায় প্রতিটি স্তরই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, বিজ্ঞানের অর্জিত জ্ঞানকে তিনি কেবল তথ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি; তাকে নিজের সাহিত্য, দর্শন ও বিশ্ববোধের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বিজ্ঞানচিন্তার সবচেয়ে সুসংহত প্রকাশ ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থে, প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। কিন্তু বিজ্ঞানের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের শুরু তার বহু দশক আগে—শৈশবে।

বিস্ময়ের শুরু শৈশবে

‘বিশ্বপরিচয়’-এর সূচনায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাল্যকালের বিজ্ঞানশিক্ষার স্মৃতি উল্লেখ করেছেন। তাঁর শিক্ষক সীতানাথ দত্ত সাধারণ পরীক্ষার সাহায্যে বিজ্ঞানের বিষয় বোঝাতেন। গরম পানিতে কাঠের গুঁড়া দিয়ে পরিচলনস্রোত দৃশ্যমান করে তোলার একটি পরীক্ষার কথা রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন। বাইরে থেকে স্থির মনে হওয়া পানির ভেতরেও যে নিয়মমাফিক গতিশীলতা রয়েছে, সেই উপলব্ধি বালক রবীন্দ্রনাথকে বিস্মিত করেছিল। এ ঘটনাটি ছোট হলেও রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানভাবনা বোঝার জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান তাঁর কাছে শুরু হয়েছিল বিস্ময় থেকে—চোখে যা দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতা সব সময় ততটুকু নয়; দৃশ্যমান ঘটনার আড়ালে রয়েছে অদৃশ্য নিয়ম।

প্যারিসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৩০

এরপর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে হিমালয়ের ডালহৌসিতে থাকার সময় রাতের আকাশ তাঁর সামনে বিজ্ঞানের আরেকটি জানালা খুলে দেয়। দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে গ্রহ–নক্ষত্র চিনিয়েছিলেন, সূর্য থেকে তাদের দূরত্ব, পরিক্রমণকাল ইত্যাদি বুঝিয়েছিলেন। সেই জ্ঞান বালক রবীন্দ্রনাথকে এতটাই আকৃষ্ট করেছিল যে তিনি তা লিখেও রাখতে শুরু করেন। পরবর্তী জীবনে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই পড়ার আগ্রহ তাঁর বজায় ছিল। অর্থাৎ তাঁর কাছে আকাশ প্রথমে কবিতার বিষয় হয়ে আসেনি; আকাশ ছিল একই সঙ্গে সৌন্দর্য ও অনুসন্ধানের ক্ষেত্র।

বিজ্ঞান ও কবিতা: দুই বিপরীত মেরু নয়

বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে আমরা প্রায়ই দুটি পৃথক জগৎ হিসেবে দেখি। বিজ্ঞান নির্ভর করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, পরিমাপ ও যুক্তির ওপর; সাহিত্য নির্ভর করে অনুভব, কল্পনা ও ভাষার ওপর। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই বিভাজনকে এত সরলভাবে গ্রহণ করেননি। বিজ্ঞান জানতে চায়—জগৎ কীভাবে কাজ করে?

কবিতা ও দর্শন প্রশ্ন করে—এই জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী? প্রশ্ন দুটি আলাদা, কিন্তু যে বিশ্বকে নিয়ে প্রশ্ন, সেটি একই।

রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রকৃতি তাই শুধু কবিতার ফুল, পাখি, নদী, বর্ষা কিংবা শরৎ ছিল না। মানুষও সেই প্রকৃতির অংশ। যে পদার্থে নক্ষত্র তৈরি, সেই মহাবিশ্বের পদার্থ দিয়েই শেষ পর্যন্ত পৃথিবী এবং জীবনের শরীর গড়ে উঠেছে—আধুনিক বিজ্ঞানের এই ধারাবাহিকতার ধারণা তাঁর বিশ্ববোধের সঙ্গে একধরনের আত্মীয়তা তৈরি করেছিল। তবে এখানে একটি সীমারেখা মনে রাখা প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানকে কবিতায় রূপান্তর করে বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। বৈজ্ঞানিক সত্যের বিচার বিজ্ঞানের নিজস্ব পদ্ধতিতেই হবে—কিন্তু সেই সত্য মানুষের আত্মপরিচয় ও বিশ্ববোধকে কীভাবে পরিবর্তিত করে, সেখানে কবি ও দার্শনিকের প্রশ্ন শুরু হয়।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (ডানে) সঙ্গে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু ও অন্যরা

জগদীশচন্দ্র বসু: বিজ্ঞানীর পাশে কবি

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের সম্পর্ক নিছক সামাজিক পরিচয়ের ছিল না; দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের মধ্যে চিঠিপত্র ও ভাবের আদান-প্রদান চলেছে। বোস ইনস্টিটিউটের সংরক্ষিত প্রকাশনার বিবরণে ১৮৯৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে জগদীশচন্দ্রের লেখা ৮৮টি চিঠির কথাও উল্লেখ রয়েছে।

জগদীশচন্দ্রের গবেষণার প্রতি রবীন্দ্রনাথের গভীর আগ্রহ ছিল, শ্রদ্ধা ছিল। জীব ও জড়ের প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে বসুর গবেষণার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির ঐক্যের এক বৃহত্তর ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছিলেন। আবার জগদীশচন্দ্রও রবীন্দ্রনাথের ভাবনার প্রভাব স্বীকার করেছিলেন। তাঁদের সম্পর্ক তাই শিল্পী বিজ্ঞানকে দূর থেকে প্রশংসা করছেন—এমন নয়; বরং কবি ও বিজ্ঞানীর মধ্যে সক্রিয় বৌদ্ধিক বন্ধুত্বের একটি বিরল উদাহরণ। ১৯১৭ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দির বা বোস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সময় রবীন্দ্রনাথ তার জন্য গানও রচনা করেছিলেন: ‘মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন কর মহোজ্জ্বল আজ হে’। বিজ্ঞানচর্চাকে তিনি এখানে বৃহত্তর জ্ঞানসাধনার অংশ হিসেবেই দেখেছিলেন। এই বন্ধুত্ব রবীন্দ্রনাথের একটি মৌলিক বিশ্বাসকেও স্পষ্ট করে—সত্যকে সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন বলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘরে বন্দী করা যায় না।

‘বিশ্বপরিচয়’: বিজ্ঞান যখন মাতৃভাষায়

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানভাবনার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ দলিল ‘বিশ্বপরিচয়’। জীবনের শেষপর্বে লেখা এই গ্রন্থ ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি তিনি উৎসর্গ করেন পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে—যাঁর নাম আজ বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান এবং “বোসন”-এর ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। প্রসঙ্গত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালেই, ১৯২৪ সালে, সত্যেন্দ্রনাথ বসু তাঁর যুগান্তকারী গবেষণাপত্র “প্লাঙ্কের সূত্র ও আলোক-কোয়ান্টার প্রকল্প” রচনা করেন। এ গবেষণায় তিনি আলোককণা বা ফোটনের আচরণ ব্যাখ্যা করার জন্য পরিসংখ্যানগত গণনার এক সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তাঁর এই মৌলিক চিন্তাই পরবর্তীকালে ‘বোস–আইনস্টাইন পরিসংখ্যান’ নামে পরিচিত হয় এবং যে বিশেষ শ্রেণির মৌলিক কণা এই পরিসংখ্যান মেনে চলে, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সম্মানে তাদের নামকরণ করা হয় ‘বোসন’। উৎসর্গটি নিছক সৌজন্য নয়; সমকালীন বাঙালি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বৌদ্ধিক যোগাযোগেরও একটি প্রতীক।

গ্রন্থটি তৈরির পেছনে শান্তিনিকেতনের বিজ্ঞানশিক্ষক প্রমথনাথ সেনগুপ্তেরও ভূমিকা ছিল। প্রথমে তাঁকেই বইটি লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল; পরে কাজটি ক্রমে রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে নেন এবং তাঁর সহায়তার কথা স্বীকার করেন।

‘বিশ্বপরিচয়’-এ রবীন্দ্রনাথ সাধারণ পাঠককে নিয়ে যান বৃহৎ থেকে ক্ষুদ্রের দিকে—মহাকাশ ও নক্ষত্রজগৎ থেকে পদার্থের গভীরে, আবার পৃথিবী ও জীবনের দিকে। আলো, নক্ষত্র, পদার্থ, পরমাণু এবং প্রাণজগতের বিভিন্ন প্রসঙ্গ সেখানে এসেছে। তিনি বিজ্ঞানীর মতো নতুন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত বিশ্বকে সাধারণ বাঙালি পাঠকের চিন্তার অংশ করে তোলা। এখানেই বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে জগদীশ বসু

বাংলা ভাষাও বিজ্ঞানের ভাষা

‘বিশ্বপরিচয়’-এর মূল্য শুধু এর বৈজ্ঞানিক তথ্যের মধ্যে খুঁজলে ভুল হবে। ১৯৩৭ সালের বিজ্ঞানের অনেক ধারণাই পরবর্তী প্রায় নব্বই বছরে সংশোধিত, সম্প্রসারিত কিংবা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। মহাবিশ্বের উৎপত্তি, কণাপদার্থবিদ্যা, জিনতত্ত্ব ও জীবনের বিবর্তন সম্পর্কে আজ আমাদের জ্ঞান বহুগুণ বেশি। তবু বিশ্বপরিচয় পুরোনো হয়ে যায়নি—কারণ তার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানকে মাতৃভাষায় চিন্তা করা।

জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয় যে বাংলা ভাষায় সুন্দর, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বলা সম্ভব, রবীন্দ্রনাথ তার একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। বাংলায় বিজ্ঞান লেখার অবশ্য তাঁর আগেও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল; অক্ষয়কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, জগদানন্দ রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়সহ অনেকে সেই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। পরবর্তী সময়ে মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুও মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। রবীন্দ্রনাথ সেই ধারায় সাহিত্যিক ভাষার শক্তি যোগ করলেন। তিনি দেখালেন—বৈজ্ঞানিক পরিভাষা প্রয়োজন, কিন্তু বিজ্ঞান বোঝানোর জন্য ভাষাকে দুর্বোধ্য হওয়া আবশ্যক নয়।

মহাবিশ্বের মধ্যে মানুষ

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান–ভাবনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এখানে। মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিজ্ঞান যতই তাঁর দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছে, ততই তাঁর কাছে মানুষের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞান মানুষকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়েছে। পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়; সূর্যও নয়। প্রকৃতির দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়েই মানুষের আবির্ভাব। এতে মানুষ আপাতদৃষ্টে ক্ষুদ্র হয়ে যায়।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দর্শনে এখানেই একটি বিপরীত সম্ভাবনা দেখা দেয়। মানুষ ক্ষুদ্র হলেও তার চেতনা সেই বিরাট বিশ্বকে উপলব্ধি করতে পারে। যে নক্ষত্র কোটি কোটি দূরে, মানুষ তার আলো বিশ্লেষণ করে তার উপাদান জানতে পারে; অদৃশ্য পরমাণুর গঠন সম্পর্কে ধারণা করতে পারে; নিজের উৎপত্তির ইতিহাস অনুসন্ধান করতে পারে। অর্থাৎ মানুষ মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ, অথচ সেই মানুষের চেতনাতেই মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রশ্ন জন্ম নেয়। এই জায়গাটিই রবীন্দ্রনাথকে বিজ্ঞান থেকে দর্শনের দিকে নিয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অ্যালবার্ট আইনস্টাইন

আইনস্টাইন ও রবীন্দ্রনাথ: সত্য কি মানুষ-নিরপেক্ষ

এর সবচেয়ে নাটকীয় প্রকাশ ঘটে আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর আলোচনায়। রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তাঁদের সবচেয়ে বিখ্যাত কথোপকথন হয় ১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, বার্লিনের কাছে কাপুথে আইনস্টাইনের বাড়িতে, সেখানে তাঁদের আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল ‘বাস্তবতার প্রকৃতি—সত্য ও বাস্তবতা মানুষের চেতনার বাইরে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল কি না’। ১৯৩০ সালের ১৯ আগস্ট তাঁরা আবার বার্লিনে মিলিত হন। তাঁদের আলোচনায় বাস্তবতা, কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং ভারতীয় ও ইউরোপীয় সংগীতও স্থান পেয়েছিল। ১৪ জুলাইয়ের আলোচনার মূল প্রশ্নটি আজও দার্শনিকভাবে বিস্ময়কর: মানুষ না থাকলেও কি সত্যের অস্তিত্ব থাকবে? আইনস্টাইন বাস্তব জগতের মানুষ-নিরপেক্ষ অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন। চাঁদের দিকে কেউ না তাকালেও চাঁদ আছে—এই বাস্তববাদী অবস্থানের কাছাকাছি ছিল তাঁর চিন্তা।

রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ভিন্ন। তাঁর কাছে আমরা যে ‘সত্য’ জানি, তা মানবচেতনা ও মানববিশ্বের বাইরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো ধারণা নয়। তিনি আলোচনায় বলেছিলেন, বিশ্ব যখন মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যে ধরা দেয়, তখন তাকে আমরা সত্য হিসেবে জানি এবং সৌন্দর্য হিসেবে অনুভব করি। আলোচনাটি পরে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সাময়িকী (রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত) ১৯৩১ সালের ‘মডার্ন রিভিউ’-তেও প্রকাশিত হয়।

এটি বিজ্ঞান বনাম কবিতার বিতর্ক ছিল না। বরং প্রশ্নটি ছিল জ্ঞানতত্ত্বের—বাস্তবতা কী এবং মানুষ সেই বাস্তবতাকে কীভাবে জানতে পারে? আইনস্টাইন জোর দিচ্ছিলেন মানুষের বাইরে বাস্তবতার স্বাধীন অস্তিত্বের ওপর; রবীন্দ্রনাথ জোর দিচ্ছিলেন জানা সত্যের সঙ্গে মানবচেতনার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ওপর। দুজনের কেউ অন্যজনকে পরাজিত করেননি। প্রয়োজনও ছিল না। তাঁদের কথোপকথনের ঐতিহাসিক সৌন্দর্য এখানেই—বিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী এবং একজন শ্রেষ্ঠ কবি, দুজনেই নোবেল বিজয়ী, একই টেবিলে বসে ‘সত্য’ শব্দটির অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করছেন।

বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং একই অজানার দিকে যাত্রা

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান–ভাবনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যাকে পরস্পরের শত্রু করে দেখার প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়া সত্য দাবি করতে পারে না। কবিতা পরীক্ষাগারের বিকল্প নয়। আবার বিজ্ঞান একটি নক্ষত্রের তাপমাত্রা, রাসায়নিক গঠন ও দূরত্ব বলতে পারলেও সেই নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে মানুষের মনে কেন বিস্ময় জন্মায়—সেই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর পদার্থবিজ্ঞানের দায়িত্ব নয়। মানুষের সভ্যতায় তাই দুটিরই প্রয়োজন। একটি আমাদের শেখায় কীভাবে জানতে হয়, অন্যটি শেখায় জানার অর্থ কী।

সম্ভবত এ কারণেই রবীন্দ্রনাথের হাতে বিজ্ঞান শুষ্ক তথ্যের তালিকা হয়ে থাকেনি। মহাবিশ্বের বিশালতা তাঁকে মানুষের ক্ষুদ্রতার কথা জানিয়েছে, আবার মানুষের চেতনার অসাধারণ ক্ষমতার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। পরমাণুর ক্ষুদ্র জগৎ এবং নক্ষত্রের অসীম দূরত্ব—দুটিই তাঁর কাছে শেষ পর্যন্ত মানুষের জানার আকাঙ্ক্ষার পরিধিকে প্রসারিত করেছে।

‘বিশ্বপরিচয়’ তাই কেবল একজন কবির লেখা বিজ্ঞানের বই নয়। এটি এমন একজন মানুষের বিশ্বকে বোঝার চেষ্টা, যিনি বিশ্বাস করতেন—জ্ঞানকে খণ্ডিত করে দেখলে সত্যের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানী ছিলেন না। কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল বিজ্ঞানীর একটি অপরিহার্য গুণ—অজানার সামনে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা এবং জানা সত্যকেও নতুন করে প্রশ্ন করার সাহস। বিজ্ঞান যেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ম আবিষ্কার করে, রবীন্দ্রনাথ সেখানে আরেকটি প্রশ্ন যোগ করেছিলেন—এই অসীম বিশ্বে মানুষের স্থান কোথায়? সম্ভবত বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মিলনও ঠিক সেই প্রশ্নের কাছেই। একটির হাতে দূরবীক্ষণ ও অণুবীক্ষণ, অন্যটির হাতে ভাষা ও কল্পনা। তাদের পথ আলাদা, পদ্ধতি আলাদা—কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে একই অজানার সামনে। আর সেই অজানার দিকে তাকিয়েই মানুষ প্রথমে বিস্মিত হয়, তারপর প্রশ্ন করে—তারপর শুরু হয় বিজ্ঞান, দর্শন ও কবিতার দীর্ঘ যাত্রা।

ড. রাশিদুল হক, লেখক ও অধ্যাপক

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>