বিজ্ঞাপন
রাজবাড়ী সাব ডিভিশন (এরিয়া) রেলপথে অধিকাংশ লেভেলক্রসিংই অরক্ষিত। ১৫৪টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ৫৪টিতে রয়েছে বেরিয়ারসহ গেটম্যান। বাকি ১০১টি ক্রসিংয়ে নেই কোনো গেটম্যান কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফলে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত এসব লেভেলক্রসিং পার হচ্ছেন পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা। এতে প্রায়ই ঘটছে ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা। সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতিতে রেলপথের এসব পারাপার যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে রাজবাড়ী এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়াসহ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৬৮ জনের। দুর্ঘটনা রোধে অবৈধ লেভেলক্রসিং বন্ধ করাসহ প্রতিটি লেভেলক্রসিংয়ে বেরিয়ার ও গেটম্যানের দাবি স্থানীয়দের।
এদিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট টু পোড়াদহ রেলপথে কালুখালীর কালিকাপুর রেলব্রিজ যেন এক মৃত্যুফাঁদ। ছাদে ভ্রমণ করে এ স্থানে আসলেই মৃত্যু নিশ্চিত। চলতি বছর এই ব্রিজে প্রায় ৩ থেকে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
‘দুর্ঘটনা শুধু লেভেলক্রসিংয়ে হয় না, রেলপথের বিভিন্ন স্থানে অসাবধানতাবশত বা অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে এসে কাটা পড়ে। কালিকাপুর রেলব্রিজ ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা। এটার উচ্চতা ১৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। ভবিষ্যতে এটার উচ্চতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’
রাজবাড়ী সাব ডিভিশন এরিয়া (গোয়ালন্দ ঘাট টু পাংশার মাছপাড়া এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা জংশন টু গোপালগঞ্জের গোবরা) অংশে বৈধ ও অবৈধ মিলে লেভেলক্রসিং গেট রয়েছে মোট ১৫৪টি। যার মধ্যে বৈধ ৬৭টি এবং অবৈধ রয়েছে ৮৭টি। এগুলো স্থানীয়রা তাদের চলাচলের সুবিধার্থে বিনা অনুমতিতে তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৫৪টিতে বেরিয়ারসহ গেটম্যান থাকলেও ১০৩টি রয়েছে সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
প্রতিদিন রাজবাড়ী হয়ে ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, গোয়ালন্দ ঘাট থেকে পোড়াদহ রুটে একাধিকবার চলাচল করছে সুন্দরবন, বেনাপোল, মধুমতি ও টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস এবং নকশিকাঁথা, গোয়ালন্দ ঘাট-পোড়াদহ ও রাজবাড়ী-ভাটিয়াপাড়া কমিউটার ট্রেন। ফলে এসব এলাকায় রেলপথ থাকার সুবাদে রেলপথের বিভিন্ন অংশের ওপর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বৈধ ও অবৈধ অসংখ্য লেভেলক্রসিং (সড়কপথ)। যার কারণে লেভেলক্রসিংসহ রেলপথের বিভিন্ন স্থানে সামান্য অসাবধানতাসহ নানা কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
আকাশ মাহমুদ বলেন, রাজবাড়ীকে মূলত বলা হয় রেলের শহর। জেলার ৫ উপজেলার মধ্যে দিয়েই রয়েছে কমবেশি রেললাইন। এই রেললাইনের অনেক স্থানে রয়েছে অরক্ষিত লেভেলক্রসিং, যেখানে নেই কোনো গেটম্যান বা বেরিয়ার। সম্প্রতি রাজবাড়ীতে ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ আশা করছি।
‘ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কোনো যাত্রী যেন ছাদে ভ্রমণ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে স্টেশনে জিআরপি সদস্য এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর পদক্ষেপ নেন। এছাড়া রেললাইন তো আসলে সংরক্ষিত এলাকা।’
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারাবি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজবাড়ীতে ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। রাজবাড়ী থেকে পাংশার দিকে আসতে কালিকাপুর রেলব্রিজটা একদমই নিচু। ট্রেনের ছাদ থেকে ব্রিজের গার্ডারের উচ্চতা এক হাতেরও কম হবে। ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত হোক, কেউ যদি ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করে এই স্থানে আসে, তাহলে মৃত্যু অনেকটাই নিশ্চিত। চলতি বছরে এই স্থানে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। কালুখালী এবং পাংশা স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার আগমুহূর্তে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে ট্রেনের ছাদে কাউকে ভ্রমণ করতে না দেওয়া। তাহলে এখানে আর দুর্ঘটনা ঘটবে না।
আরও পড়ুন
স্টপেজের চাপে গতি হারিয়েছে কালনী এক্সপ্রেস, ইঞ্জিনেও সংকট
সৈকত শতদল নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, কালিকাপুর রেলব্রিজ একটি মৃত্যুফাঁদ। ট্রেনের ছাদ থেকে ব্রিজের উচ্চতা খুব কম। যে কারণে কেউ ট্রেনের ছাদে উঠে এখানে এলে মৃত্যু নিশ্চিত। এখানে আহতের চেয়ে নিহতের সংখ্যা বেশি হবে। কোনো কোনো মাসে এখানে এক বা একাধিক ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমানে রাজবাড়ীর ওপর দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রেন চলাচল বেড়েছে। ফলে অনিয়ন্ত্রিত লেভেলক্রসিং এবং রেলপথে এসব দুর্ঘটনা বেড়েছে। আমরা চাই এই ব্রিজের সমস্যা সমাধান করাসহ অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে লোকবল নিয়োগ বা অবৈধ লেভেলক্রসিং বন্ধ করা হোক।
‘রাজবাড়ীকে মূলত বলা হয় রেলের শহর। জেলার ৫ উপজেলার মধ্যে দিয়েই রয়েছে কমবেশি রেললাইন। এই রেললাইনের অনেক স্থানে রয়েছে অরক্ষিত লেভেলক্রসিং, যেখানে নেই কোনো গেটম্যান বা বেরিয়ার। সম্প্রতি রাজবাড়ীতে ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ আশা করছি।’
রতন মাহমুদ বলেন, রাজবাড়ীতে প্রায় শতাধিক অরক্ষিত লেভেলক্রসিং রয়েছে। নানা কারণে এসব স্থানেই ঘটছে দুর্ঘটনা। অরক্ষিত লেভেলক্রসিংগুলোতে জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে দুর্ঘটনা কমবে বলে মনে করছি।
আরও পড়ুন
পর্যটকের চোখে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’, চরবাসীর কাছে যুদ্ধক্ষেত্র
সহকারী লোকোমাস্টার (ট্রেন চালক) এস এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ট্রেন চলাচলের সময় সাধারণত সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া পরিবর্তন হয় না। কোন এলাকা দিয়ে কখন কোন ট্রেন যায়, তা প্রায় সবারই জানা। কিন্তু মানুষ এসব খেয়াল করে না এবং স্মরণও রাখে না। অমনোযোগী হয়ে হেসে-খেলে রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করে। কোনো কোনো সময় ট্রেনের সঙ্গে তারা প্রতিযোগিতা করে। এমন সময় মানুষ সামনে এসে পড়ে, যখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় না। অন্যমনস্ক থাকার কারণেই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে।
রাজবাড়ী রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার তন্ময় কুমার দত্ত বলেন, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কোনো যাত্রী যেন ছাদে ভ্রমণ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে স্টেশনে জিআরপি সদস্য এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর পদক্ষেপ নেন। এছাড়া রেললাইন তো আসলে সংরক্ষিত এলাকা।
আরও পড়ুন
অভিজাত এলাকায় খেয়া নৌকা, ৫ টাকায় পারাপার
তিনি আরও বলেন, যার যার অবস্থান থেকে যদি সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়, তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে। সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে স্টেশনে ট্রেন আসার আগে মাইকিংয়ের মাধ্যমে যাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হয় এবং ছাদে ভ্রমণ না করতে অনুরোধ জানানো হয়।
রাজবাড়ী রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, রাজবাড়ী এলাকায় ১৫৪টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে বেরিয়ারসহ গেটম্যান আছে ৫১টিতে এবং ১০৩টিতে নেই কোনো মানুষ ও বেরিয়ার। এই অংশে ৮৭টি রয়েছে অবৈধ লেভেলক্রসিং। যা স্থানীয়রা তাদের সুবিধার্থে তৈরি করেছে। নিয়মিত এগুলো বন্ধ করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে কেউ না কেউ আবারও খুলে ফেলে। এ নিয়ে আমরা মামলাও করেছি।
তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনা শুধু লেভেলক্রসিংয়ে হয় না, রেলপথের বিভিন্ন স্থানে অসাবধানতাবশত বা অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে এসে কাটা পড়ে। কালিকাপুর রেলব্রিজ ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা। এটার উচ্চতা ১৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। ভবিষ্যতে এটার উচ্চতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এনএইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন