বিজ্ঞাপন
শায়খ আহমাদুল্লাহ
সুন্নাহ শব্দের অর্থ হলো নিয়ম, পথ, পদ্ধতি ইত্যাদি। আর প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে কোনো কথা, কাজ, তাঁর সকল প্রকার সমর্থন ও মৌনসম্মতি, তাঁর দৈহিক অবয়ব, তাঁর যাবতীয় গুণবৈশিষ্ট্য এবং তাঁকে ঘিরে যত আলোচনা আছে তার সবকিছুই সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুন্নাহ অনুসরণ একজন মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। সুন্নাহর অনুকরণ ছাড়া একজন মুসলমানের পক্ষে প্রকৃত অর্থে মুসলমান হয়ে ওঠা আসলে সম্ভব নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে কারীমের সুরা আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে অনুপম আদর্শ।’ তাঁর আদর্শের কোনো বিকল্প নেই এবং তাঁর মতো এমন আদর্শ পৃথিবীতে আর কখনো আসেনি।
কোরআনে কারীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের ইমানের পূর্বশর্ত হিসেবে নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুসরণ ও অনুকরণকে উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে বেশ কয়েকটি আয়াত রয়েছে। সুরা আনফালে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।’ এ আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, আমাদেরকে ইমানদার হতে হলে নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আনুগত্য করতে হবে, তাঁর অনুকরণ ও অনুসরণ করতে হবে। তাঁর অনুকরণ-অনুসরণ ছাড়া আখেরাতে আমাদের মুক্তি কিংবা জান্নাত লাভ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
কোরআনে কারীমের সুরা আলে ইমরানে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে রাসূল, আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমার (অর্থাৎ রাসুলে কারীমের) অনুকরণ-অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করবেন।’
আরও পড়ুন
মৃতদেহ কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার পথে ৩ বার থামা কি সুন্নাহ?
আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবী মুহাম্মদ মোস্তফাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের জন্য অনুপম আদর্শ ও বাস্তব মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ যেমন বন্দেগী প্রত্যাশা করেন এবং যে দাসত্বের নির্দেশ তিনি দেন, তার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন।
নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুকরণ-অনুসরণের ওপরই আমাদের জান্নাত নির্ভর করে। আমরা যদি জান্নাতি হতে চাই, তবে তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। সুরা নিসায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’
একই সাথে তাঁর আনুগত্যকে কোরআনে কারীমে স্বয়ং আল্লাহর আনুগত্য বলে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ যদি নবীজিকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করে, তবে তা প্রকারান্তরে আল্লাহর আনুগত্য বলেই বিবেচিত হয়। সুরা নিসায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহ তাআলারই আনুগত্য করল। আর যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য থেকে বিমুখ থাকল, (হে রাসুল!) আপনাকে তাকে বাঁচাবার দায়িত্বশীল করে আমি পাঠাইনি।’
অতএব, একজন ইমানদারকে যদি প্রকৃত ইমানদার হতে হয় এবং আল্লাহর আনুগত্য করতে হয়, তবে তাকে সুন্নাতে রাসুল জেনে-বুঝে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি সুন্নাহকে আমলে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আনুগত্য ও অনুসরণ না করার ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফিতনা ও শাস্তি নাজিল হওয়ার কথা কোরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে বলা হয়েছে। সুরা নূরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘যারা নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে কিংবা তাঁর আদর্শের পরিপন্থী কোনো আদর্শ জীবনে গ্রহণ করে, তারা যেন সতর্ক থাকে; পাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফিতনা এসে তাদেরকে গ্রাস করে এবং কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে স্পর্শ করে।’
হাদিসের ভান্ডারের দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাই, বহু হাদিসে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন, যাতে আমরা সুন্নাহ থেকে এক চুলও বিচ্যুত না হই। একটি বিখ্যাত হাদিসে নবীজি বলেছেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি, এগুলোকে আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথহারা বা গোমরাহ হবে না। তার একটি হলো আল্লাহর কিতাব (কোরআনে কারীম) এবং অপরটি হলো তাঁর নবীর সুন্নাহ।’
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) আনহা থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি দ্বীনের নামে এমন কিছু করবে যা নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ বা সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত নয়, তবে বাহ্যত তা যত ভালো কাজই মনে হোক না কেন, তা আল্লাহর কাছে বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত বলে গণ্য হবে।’
আরও পড়ুন
রাতের নির্জনতায় যে দোয়া পড়তেন মহানবী (সা.)
অন্য আরেকটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে পৃথিবীতে থাকবে, তারা দেখবে যে মানুষ নানা মতের দিকে আহ্বান করছে। নানা মত ও পথ দেখে মানুষ যখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে, সে সময়ের করণীয় সম্পর্কে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, সেই কঠিন ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে তোমাদের কর্তব্য হবে আমার সুন্নাহ এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহকে অত্যন্ত শক্ত ও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা।
আজ যেন আমরা সেই কঠিন সময়টিই পার করছি। চতুর্দিকে এত মত, পথ ও আহ্বানের বেড়াজাল যে, আমরা বিভ্রান্ত হওয়ার উপক্রম। কোন পথের শেষ মাথায় জান্নাত অপেক্ষা করছে আর কোনটির মাথায় জাহান্নাম, তা নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই এই সময়টিতেই সুন্নতে রাসুল আঁকড়ে ধরা আমাদের জন্য আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন