জাতীয়

লন্ডনের রাস্তায় ক্যারিবীয় সংস্কৃতির বর্ণিল মহোৎসব

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
  পশ্চিম লন্ডনের নটিং হিল, ল্যাডব্রোক গ্রোভ, পোর্টোবেলো রোডসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্ট্রিট কার্নিভালের মঞ্চে। রং-বেরঙের পোশাক, ঝিলমিলে সাজ, তুমুল সঙ্গীত, নাচ আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে পশ্চিম লন্ডন যেন এক অন্য শহরে পরিণত হলো। সোমবার যুক্তরাজ্যে সরকারি ছুটির দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত নটিং হিল কার্নিভালের অ্যাডাল্টস’ ডে। এবারের আয়োজনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ ২০২৬ সালে এই ঐতিহ্যবাহী কার্নিভাল উদযাপন করছে তার ৬০তম বার্ষিকী। অ্যাডাল্টস’ ডে: কার্নিভালের সবচেয়ে প্রাণবন্ত দিন রোববারের আয়োজন ছিল শিশু ও পরিবারের জন্য নির্ধারিত চিলড্রেনস’ ডে। কিন্তু সোমবারের অ্যাডাল্টস’ ডে-ই মূলত কার্নিভালের সবচেয়ে বড় ও উচ্ছ্বসিত দিন। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়েছে অ্যাডাল্টস’ প্যারেড। এতে অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন মাস ব্যান্ড, নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী এবং বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত হাজারো মানুষ। বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন মাস ব্যান্ড এই দিনের জন্য তাদের পোশাক, নাচ এবং পরিবেশনা তৈরি করে। ফলে আজকের আয়োজনের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে এক ধরনের সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আবহ—কার পোশাক বেশি আকর্ষণীয়, কার নাচ বেশি প্রাণবন্ত এবং কোন ব্যান্ড দর্শকদের সবচেয়ে বেশি মাতাতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের পোশাকে উৎসবের আলাদা আকর্ষণ অ্যাডাল্টস’ ডে-এর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয়গুলোর একটি হলো কার্নিভাল কস্টিউম। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেক অংশগ্রহণকারী পালক, পুঁতি, ঝিলমিলে কাপড়, উজ্জ্বল রং এবং নানা ধরনের অলংকারে তৈরি বিশেষ পোশাক পরে রাস্তায় নেমেছেন। আরও পড়ুন সংসদ কবে হবে জবাবদিহির জায়গা? কিছু কস্টিউম এতটাই জটিল ও বিশাল যে সেগুলো তৈরি করতে কয়েক মাস সময় লাগে। অনেক পোশাকের মধ্যে ক্যারিবীয় সংস্কৃতি, আফ্রিকান ঐতিহ্য এবং আধুনিক ফ্যাশনের সমন্বয় দেখা যায়। অ্যাডাল্টস’ ডে-তে পোশাকের ধরনও শিশুদের দিনের তুলনায় অনেক বেশি সাহসী, আকর্ষণীয় এবং শরীরকেন্দ্রিক। তবে এই পোশাক ও সাজসজ্জা মূলত কার্নিভালের ঐতিহ্যবাহী মাস কালচার বা উৎসবের পোশাক-সংস্কৃতির অংশ। এখানে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের শরীর, নাচ এবং পোশাকের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রকাশ করেন। কারও পোশাক খুবই ঝলমলে ও আকর্ষণীয়, আবার কেউ বেছে নেন তুলনামূলকভাবে কম পোশাকের সঙ্গে পালক, গহনা ও শরীরের সাজসজ্জা। নাচ ও সঙ্গীতের উন্মুক্ত উৎসব অ্যাডাল্টস’ ডে-এর আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো সাউন্ড সিস্টেম। দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে উচ্চস্বরে গান বাজানো হয়। এর সঙ্গে হাজারো মানুষ নাচতে থাকেন। নটিং হিল কার্নিভালের সঙ্গীত ঐতিহ্যের সঙ্গে রেগে, সোকা, ক্যালিপসো, হাউস, সাম্বা, সোল, ফাঙ্কসহ বিভিন্ন ধারার সঙ্গীত জড়িয়ে আছে। বিশাল স্পিকার, ডিজে, লাইভ পারফরম্যান্স এবং নৃত্যরত মানুষের কারণে রাস্তার প্রতিটি অংশ যেন আলাদা আলাদা ওপেন-এয়ার পার্টিতে পরিণত হয়। অ্যাডাল্টস’ ডে-এর বিশেষ পরিবেশ অ্যাডাল্টস’ ডে-এর পরিবেশ শিশুদের দিনের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন ও উচ্ছ্বসিত। রাস্তার দুই পাশে দর্শকদের ভিড়। মাঝখানে চলছে কার্নিভাল প্যারেড। তার মধ্যে নাচতে নাচতে এগিয়ে যাচ্ছেন মাসকারেডাররা। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধুদের দল নিয়ে কার্নিভালে আসেন। কেউ বিশেষ কস্টিউম পরে আসেন, কেউ সাধারণ পোশাকে এসে সঙ্গীত ও নাচ উপভোগ করেন। অনেকের কাছে এই দিনটি শুধু একটি উৎসব নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের চাপ ও ব্যস্ততা থেকে বেরিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য স্বাধীনভাবে আনন্দ করার একটি সুযোগ। তবে অ্যাডাল্টস’ ডে-কে ঘিরে যে ‘অ্যাডাল্ট’ পরিবেশের কথা বলা হয়, সেটি মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপযোগী সঙ্গীত, নাচ, পোশাক, পার্টির পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রকাশকে বোঝায়। এটি কোনো একক যৌন অনুষ্ঠান নয়; বরং নটিং হিল কার্নিভালের ঐতিহ্যবাহী প্রাপ্তবয়স্কদের দিনের অংশ। ক্যারিবীয় সংস্কৃতি থেকে লন্ডনের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় নটিং হিল কার্নিভাল শুধু গান-বাজনা ও নাচের উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটেনের ক্যারিবীয় অভিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৬০-এর দশকে নটিং হিল এলাকায় জাতিগত উত্তেজনা ও সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে এই উৎসবের বিকাশ শুরু হয়। ১৯৬৬ সালে স্থানীয় উদ্যোগে আয়োজিত ছোট একটি উৎসব ধীরে ধীরে আজকের বিশাল নটিং হিল কার্নিভালে পরিণত হয়েছে।৬০ বছর পর সেই ছোট স্থানীয় আয়োজন এখন লন্ডনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আনন্দের মাঝেও ৭২ সেকেন্ডের নীরবতা উৎসবের আনন্দের মধ্যেও আজ রয়েছে একটি আবেগঘন মুহূর্ত। বিকেল ৩টায় ৭২ সেকেন্ডের নীরবতা পালন করা হয়েছে গ্রেনফেল টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৭২ জনকে স্মরণ করে। কার্নিভালের সঙ্গীত ও নাচের মধ্যে হঠাৎ যখন সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায় এবং হাজারো মানুষ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন উৎসবের পরিবেশ কয়েক মুহূর্তের জন্য বদলে যায়। এই নীরবতা নটিং হিলের স্থানীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস, বেদনা এবং পারস্পরিক সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি নজর এত বিপুল মানুষের সমাগমে নিরাপত্তা বরাবরই একটি বড় বিষয়। এবারের কার্নিভালে ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট, স্টুয়ার্ড এবং পুলিশি নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রথম দিনের ঘটনায় পুলিশ বেশ কিছু গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে মাদক, অস্ত্র, যৌন অপরাধ এবং হামলার অভিযোগও রয়েছে। পুলিশ একই সঙ্গে জানিয়েছে, গুরুতর সহিংসতা কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তাই আনন্দের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং আশপাশের মানুষের প্রতি সম্মানের বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি। ৬০ বছরের ঐতিহ্য, সামনে আরও অনেক পথ ২০২৬ সালের নটিং হিল কার্নিভাল তাই শুধু আরেকটি কার্নিভাল নয়। এটি ছয় দশকের ইতিহাসের এক বিশাল উদযাপন। ৬০ বছর আগে যে আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল বিভক্ত একটি সম্প্রদায়কে কাছাকাছি নিয়ে আসা, আজ সেটিই লন্ডনের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক। ক্যারিবীয় সঙ্গীত, আফ্রিকান প্রভাব, ব্রাজিলীয় ছন্দ, ব্রিটিশ স্ট্রিট কালচার এবং লন্ডনের বহুজাতিক সমাজ—সবকিছু মিলেমিশে তৈরি হয়েছে আজকের নটিং হিল কার্নিভাল। অ্যাডাল্টস’ ডে-তে ঝলমলে পোশাক, নাচ, সঙ্গীত এবং উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি রয়েছে স্বাধীনভাবে নিজেকে প্রকাশ করার একটি সংস্কৃতি। নটিং হিল কার্নিভাল তাই শুধু একটি রাস্তার উৎসব নয়—এটি ৬০ বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিচয়, প্রতিবাদ, স্বাধীনতা এবং আনন্দের এক অনন্য সম্মিলন। এমআরএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>