বিজ্ঞাপন
বর্তমানে শহরের শিশুদের বেড়ে ওঠার গল্প অনেকটাই ভিন্ন রকম। বিকেলের ঢলে পড়া রোদ যখন শহরের উঁচু ভবনগুলোর গায়ে এসে পড়ে; তখন আর বারান্দার গ্রিল ধরে কোনো শিশুর উৎসুক মুখ দেখা যায় না। গলিগুলোতে নেই সমবয়সীদের হইচই বা দৌড়ঝাঁপের শব্দ। ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় সোফায় বসে থাকা সাত বছরের শিশুটির চোখের কোণে ভেসে ওঠে এক ধরনের নীলাভ আলো।
শহরের বেশিরভাগ শিশুরাই নিয়মিত পড়ার টেবিলে বসার থেকে বা সৃজনশীল কোনো কাজ করার থেকে তার হাতে ডিভাইস নিয়ে ডিজিটাল পর্দার ভেতর দ্রুত আঙুল চালাতে বেশি পছন্দ করে। বাইরের আসল জগতের থেকে তারা ভার্চুয়াল দুনিয়ার অলীক জগতে হারাতে চায়। এটি যে কেবল শহরের অল্প কিছু শিশুর গল্প, তা নয়; আজকের যান্ত্রিক নগরে প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত ঘরের অতি পরিচিত চিত্র।
আরও পড়ুন
আত্মহত্যায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেশি
একান্নবর্তী পারিবারিক ব্যবস্থার বিলুপ্তি, কর্মজীবী বাবা-মায়ের তীব্র ব্যস্ততা এবং আধুনিক আবাসন ব্যবস্থায় খেলার মাঠের অনুপস্থিতি শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে গভীর নিঃসঙ্গতার দিকে। তাই শহুরে জীবনে শিশুদের শৈশব যেন এখন চার দেওয়ালের কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি। নিরাপত্তার খাতিরে কিংবা পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অভিভাবকরাও বাধ্য হয়ে সন্তানকে ঘরের ভেতর আটকে রাখছেন। সমবয়সী সঙ্গী বা মেলামেশার সুযোগ না থাকায় তৈরি হওয়া এই তীব্র একাকিত্বই এক সময় স্ক্রিন আসক্তিতে রূপ নেয়। ফলে শহরের শিশুরা দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে।
অনেক সময় সন্তানকে শান্ত রাখতে বা নিজের কাজ নির্বিঘ্ন করতে অভিভাবকরাও খুব অল্প বয়সে শিশুর হাতে তুলে দেন এই নীল পর্দা। কিন্তু অ্যালগরিদমের রঙিন ঝলকানি, কার্টুন আর গেমসের দ্রুতগতির দুনিয়া খুব অল্প সময়েই শিশুকে গ্রাস করে ফেলে। এ ছাড়াও শিশুদের যখন কথা বলার কেউ থাকে না; তখন শিশুর একা মস্তিষ্কের সবচেয়ে সহজ সঙ্গী হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের কোলের কাছে পড়ে থাকা স্মার্টফোন বা উইজেট। ফলে তৈরি হয় প্রযুক্তিনির্ভর মানসিক আসক্তি, যা থেকে পরে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন
পথশিশুরা সমাজের বোঝা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি
সামাজিক মেলামেশার অভাব ও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি এবং সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে জড়তা দেখা দিচ্ছে। এই যৌথ সংকটের প্রভাব পড়ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে। বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবন বেশি আকর্ষক মনে হওয়ায় শিশুদের মাঝে সহমর্মিতা ও আবেগ প্রকাশের ক্ষমতাও যেন দিনদিন কমে যাচ্ছে। দেখা দিচ্ছে প্রচণ্ড খিটখিটে মেজাজ।
প্রযুক্তির এই জোয়ারে শিশুদের একবারে ডিভাইস থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব বা বাস্তবসম্মত বিষয় নয়, কিন্তু কৃত্রিম পর্দা কখনো মানুষের উষ্ণ সান্নিধ্যের বিকল্প হতে পারে না। শিশুকে এই বন্দিদশা থেকে ফেরাতে হলে সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক সময় ও মনোযোগ। দিনের কিছুটা সময় স্ক্রিন সরিয়ে রেখে সন্তানের সাথে গল্প করা, একসাথে বইপড়া বা ছবি আঁকার মতো ছোট ছোট অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এ ছাড়া নগরায়ণ ও সমাজ ভাবনায় শিশুদের হাঁটাচলা ও খেলার সুযোগ রাখা জরুরি। যন্ত্রের অলীক আলো থেকে বের করে আনলেই কেবল আমাদের সন্তানরা আবার মাটির গন্ধে, রোদের আলোয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে হেসে উঠতে পারবে।
এসইউ
বিজ্ঞাপন