ব্রেকিং নিউজ
জাতীয়

শহর কি কেবলই মানুষের?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
‘কাকডাকা ভোর’ এখনও আছে। কিন্তু কাক আর প্রায় নেই বললেই চলে। শহরের ভোরে কাকের ডাক ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। অথচ একসময় শহুরে জীবনের সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলোর একটি ছিল কাকের সমবেত কোলাহল। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তারা গাছের ডাল থেকে ডালে উড়ে বেড়াত, একে অন্যকে ডাকত। মনে হতো, দিনের কাজ শুরুর আগে তাদেরও যেন ছোট্ট একটি সভা বসেছে। তারপর ছড়িয়ে পড়ত শহরের নানা প্রান্তে, খাবারের সন্ধানে। সেই দৃশ্য, সেই শব্দ এখন অনেকটাই স্মৃতি। কেবল কাক নয়। শহর থেকে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে আরও কত প্রাণী, কত পাখি। একসময় বাড়ির কার্নিশে, বারান্দায়, গাছের ডালে যাদের নিয়মিত দেখা মিলত, তাদের অনেকেই এখন ঠাঁই নিয়েছে স্মৃতির বারান্দায়। নগর উন্নয়নের গল্প যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই যেন সংকুচিত হয়ে আসছে অন্য প্রাণীদের বাসস্থান। কংক্রিটের বিস্তার বাড়ছে, কিন্তু কমছে জীবনের বৈচিত্র্য। শহরকে আমরা ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পরিণত করেছি, যেখানে মানুষের বাইরে অন্য জীবের অস্তিত্বকে প্রায় অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়। বিড়াল, কুকুর কিংবা অন্য প্রাণীদের আমরা শহরের সহবাসিন্দা হিসেবে নয়, বরং ঝামেলা হিসেবে দেখতে শিখেছি। আর সেখান থেকেই শুরু হয় সহিংসতা। কোথাও বিষ প্রয়োগ করে কুকুর হত্যা করা হচ্ছে, কোথাও পিটিয়ে মারা হচ্ছে। আহত বা অসুস্থ প্রাণীকে সাহায্য করার বদলে অনেক সময় তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কুকুর বা বিড়ালের ওপর নির্যাতনের খবর দেখে আমরা কয়েক মুহূর্তের জন্য বিচলিত হই। কেউ প্রতিবাদ করি, কেউ ক্ষোভ জানাই। তারপর স্ক্রল করে চলে যাই পরের খবরের দিকে। কিন্তু প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনা আসলে আরও বড় একটি সংকটের লক্ষণ। কারণ যে সমাজ দুর্বল ও ‘নির্বাক’ প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি হারাতে থাকে, সেই সমাজ নিজের মানবিকতারও একটি অংশ হারায়। একটি শহরের সভ্যতা মাপা যায় সে শহর তার সবচেয়ে দুর্বল বাসিন্দার সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার প্রেক্ষিতে। সেই বাসিন্দা মানুষ নাও হতে পারে। একটি পুঁচকে চড়ুই, একটি পথকুকুর, একটি বিড়াল, একটি প্রাচীন বটগাছও হতে পারে। মনে রাখতে হবে, সহাবস্থান কোনো দয়া নয়। বরং পৃথিবীতে আমাদের নিজেদের টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। শহর তাই শুধুই মানুষের নয়। এটি মানুষের সঙ্গে আরও অসংখ্য জীবের যৌথ আবাসস্থল। ধোঁয়া, ইট-কাঠ আর কংক্রিটের কঠিন আস্তরণে ভরে থাকা এই শহরটাকে আমরা খুব অনায়াসেই নিজেদের একচ্ছত্র সম্পত্তি ভেবে বসেছি। বহুতল ভবনের বিস্তার আর ঝকঝকে শপিং মলের ভিড়ে আমরা ভুলে যাই, এই ভৌগোলিক সীমানা কেবল মানুষের জন্য নয়। এখানে আরও একটি বিশাল, নীরব এবং বহু প্রজাতির জগৎ রয়েছে। আছে পথকুকুর, বিড়াল, কাক, চড়ুই, শালিক। আছে প্রজাপতি, মৌমাছি, নানা ধরনের কীটপতঙ্গ। আছে গাছ, লতা, ঘাস। আছে এমন অসংখ্য জীব, যাদের অস্তিত্ব আমরা টেরও পাই না, অথচ শহরের বাস্তুতন্ত্রে তাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ভূমিকা আছে। আমরা তাদের দেখি না বলেই তারা নেই, এমন নয়। মানুষ যখন নিজের নিরাপত্তা, বসতি ও জীবিকার জন্য শহর তৈরি করতে শুরু করেছিল, তখন প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো নৈতিক পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু নগরায়ণের দীর্ঘ যাত্রায় আমরা ধীরে ধীরে এক ধরনের নগরকেন্দ্রিক অহংবোধে আক্রান্ত হয়েছি। আমরা ধরে নিয়েছি, শহর মানেই মানুষের কাজের জায়গা, মানুষের আবাসন, মানুষের চলাচল, মানুষের বিনোদন। অন্য প্রাণীরা সেখানে থাকলে তারা থাকবে আমাদের অনুমতিতে। এই ধারণাটিই সমস্যার মূল। শহর মানুষের তৈরি বলে কি কেবল মানুষেরই? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সরল। কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে আমাদের নগরসভ্যতার একটি গভীর নৈতিক সংকট। পথকুকুর বা বিড়ালের কথাই ধরা যাক। এরা কোনো দূরবর্তী জঙ্গল থেকে এসে শহর দখল করেনি। মানুষের বসতি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তারাও এই পরিবেশের অংশ হয়ে উঠেছে। শহরের গলি, ফুটপাত, বাজার, আবর্জনার স্তূপ, পরিত্যক্ত বাড়ি কিংবা নির্মাণাধীন ভবন তাদের জীবনযাপনের ভূগোল তৈরি করেছে। অথচ প্রতিদিন তাদের সঙ্গে আমাদের আচরণ কেমন? উচ্ছিষ্ট খাবার দিতে গিয়ে তাচ্ছিল্য, সামান্য হাঁকডাকের কারণে লাঠির আঘাত, গাড়ির চাকায় চাপা পড়ে আহত হলে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া, কিংবা তাদের সংখ্যা কমানোর নামে নির্বিচার হত্যা বা উচ্ছেদ। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। পথপ্রাণীদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো কোনো দয়া নয়। এটি দায়িত্বশীল সহাবস্থানের অংশ। বাংলাদেশে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর জন্য আইনও রয়েছে। ২০১৯ সালের প্রাণিকল্যাণ আইন পুরোনো ‘The Cruelty to Animals Act, 1920’-কে প্রতিস্থাপন করে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ, সদয় আচরণ এবং দায়িত্বশীল প্রতিপালনের নীতিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনেছে। অর্থাৎ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কেবল নৈতিকভাবে আপত্তিকর নয়; এটি আইনেরও বিষয়। একই কথা শহরের পাখিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একসময় ঢাকা কিংবা অন্য বড় শহরের ভোরে পাখির কিচিরমিচির শোনা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। আজ সেই শব্দ অনেক জায়গাতেই কমে গেছে। গাছ কাটা হয়েছে, পুরোনো বাড়ি ভেঙে গেছে, কার্নিশ ও ছাদের সেই ছোট ছোট আশ্রয়গুলো বদলে গেছে কাঁচ ও কংক্রিটে। পাখির বাসা বাঁধার জায়গা কমেছে। খাবার ও পানির উৎসও কমেছে। চড়ুই, শালিক, দোয়েল, বাবুই কিংবা টুনটুনির মতো পাখিদের হারিয়ে যাওয়া কেবল একটি নস্টালজিক দৃশ্যের অবসান নয়। এটি নগরের বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনেরও একটি সংকেত। আমরা এমন এক শহর তৈরি করছি, যেখানে মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীর উপস্থিতি যেন অপ্রত্যাশিত। গাছের ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা আলাদা নয়। শহরকে ‘সবুজ’ করার নামে অনেক সময় টবে সাজানো বিদেশি গাছ বসিয়ে আমরা সবুজের ছবি তৈরি করি। অথচ একটি পুরোনো বট, অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া কিংবা অন্য কোনো বড় গাছকে ভবন নির্মাণ, রাস্তা সম্প্রসারণ বা উন্নয়নের নামে অনায়াসে কেটে ফেলি। একটি বড় গাছ কেবল অক্সিজেন দেয় না, ছায়া দেয় না, সৌন্দর্যও তৈরি করে না। সেটি নিজেই একটি ক্ষুদ্র প্রতিবেশ। তার ডালে পাখি বাসা বাঁধে, কাণ্ডে ও পাতায় কীটপতঙ্গ বসবাস করে, শিকড়ের আশপাশে অসংখ্য অণুজীবের জীবনচক্র চলে। একটি পরিণত গাছ কেটে ফেলা মানে তাই কেবল একটি গাছের মৃত্যু নয়; তার সঙ্গে যুক্ত একটি ক্ষুদ্র জীবজগতেরও ভাঙন। এই কারণেই বৃক্ষ সংরক্ষণ এখন কেবল সৌন্দর্য বা পরিবেশের প্রশ্ন নয়, নগর পরিকল্পনারও প্রশ্ন। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন প্রণীত হয়েছে। আইনটির উদ্দেশ্যের মধ্যেই রয়েছে বৃক্ষ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা। একই বছর বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-ও প্রণীত হয়েছে, যেখানে জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আরও বিস্তৃতভাবে আনা হয়েছে। আমাদের সংবিধানও এই দায়িত্বের কথা বলে। সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃতি রক্ষা নিছক কোনো সৌখিন পরিবেশবাদী চিন্তা নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বেরও অংশ। তারপরও আমাদের শহরের পরিকল্পনায় মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের জায়গা খুব সামান্য। কারণ আমাদের চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। পরিবেশ-নৈতিকতার ভাষায় একে বলা হয় Anthropocentrism বা মানবকেন্দ্রিকতা। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ হয়ে ওঠে সবকিছুর মাপকাঠি। প্রকৃতি, প্রাণী, নদী, গাছ, মাটি, এমনকি অন্য জীবের অস্তিত্বও মূল্যবান হয়ে ওঠে মূলত মানুষের প্রয়োজনের কারণে। এর বিপরীতে Biocentric ethics বা জৈবকেন্দ্রিক নৈতিকতা আমাদের একটি ভিন্ন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। একটি প্রাণী মানুষের কোনো কাজে না এলেও কি তার বেঁচে থাকার নিজস্ব মূল্য নেই? একটি চড়ুই কি শুধু তখনই মূল্যবান, যখন তার ডাক আমাদের ভালো লাগে? একটি কুকুর কি শুধু তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন সে বাড়ি পাহারা দেয়? একটি গাছ কি শুধু তখনই প্রয়োজনীয়, যখন তার কাঠের দাম আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের শহর সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে হবে। শহরকে কেবল অর্থনৈতিক কর্মক্ষেত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। শহর একটি জীবন্ত প্রতিবেশও। সেখানে মানুষ যেমন বাস করে, তেমনি বাস করে অসংখ্য অন্য প্রাণী। তারা আমাদের শহরের অতিথি নয়। তারা এই প্রতিবেশের অংশ। তাই শহরের মাস্টারপ্ল্যানে শুধু রাস্তা, ড্রেন, ভবন, পার্কিং ও শপিং কমপ্লেক্সের জায়গা থাকলেই হবে না। থাকতে হবে সবুজ করিডর, পুরোনো গাছ সংরক্ষণের পরিকল্পনা, পাখির আবাসস্থল, জলাধার, প্রাণীদের চলাচলের নিরাপদ পরিসর এবং মানুষের সঙ্গে পথপ্রাণীর সংঘাত কমানোর ব্যবস্থা। পথপ্রাণীদের কেন্দ্র করে যে সব সমস্যা, তার সমাধানও আছে। নির্বিচারে হত্যা বা স্থানান্তর কোনো টেকসই সমাধান নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালিত বন্ধ্যাকরণ, টিকাদান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীল খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। আইন আছে, কিন্তু শুধু আইন থাকলেই হবে না। আইনকে কার্যকর হতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিক আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। গরমের দিনে বারান্দা কিংবা ছাদে এক পাত্র পানি রাখা। সম্ভব হলে নিরাপদভাবে পাখির জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। আহত কোনো প্রাণীকে দেখে পাশ কাটিয়ে না যাওয়া। পথপ্রাণীকে অকারণে আঘাত না করা। নিজের এলাকার পুরোনো গাছটি কেটে ফেলার আগে একবার প্রশ্ন করা, সত্যিই কি সেটি কাটা জরুরি? এই ছোট ছোট কাজগুলোকে আমরা হয়তো খুব বড় কিছু মনে করি না। কিন্তু নৈতিকতার বড় পরিবর্তন অনেক সময় ছোট আচরণ থেকেই শুরু হয়। আমরা শহরকে পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে যেন তাকে প্রাণহীন করে না ফেলি। কারণ পরিচ্ছন্ন শহর আর প্রাণহীন শহর এক জিনিস নয়। কংক্রিটের জঙ্গল যতই ঝকঝকে হোক, যদি সেখানে কাকের ডাক না থাকে, চড়ুইয়ের বাসা না থাকে, গাছের ছায়ায় কোনো বিড়াল না ঘুমায়, ফুটপাতের পাশে কোনো পথকুকুরের নিরাপদ আশ্রয় না থাকে, তাহলে সেই শহর হয়তো উন্নত। কিন্তু কতটা বাসযোগ্য? একটি শহরের সভ্যতা মাপা যায় সে শহর তার সবচেয়ে দুর্বল বাসিন্দার সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার প্রেক্ষিতে। সেই বাসিন্দা মানুষ নাও হতে পারে। একটি পুঁচকে চড়ুই, একটি পথকুকুর, একটি বিড়াল, একটি প্রাচীন বটগাছও হতে পারে। মনে রাখতে হবে, সহাবস্থান কোনো দয়া নয়। বরং পৃথিবীতে আমাদের নিজেদের টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। শহর তাই শুধুই মানুষের নয়। এটি মানুষের সঙ্গে আরও অসংখ্য জীবের যৌথ আবাসস্থল। লেখক: সাংবাদিক। এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>