বিজ্ঞাপন
যুদ্ধের ময়দানে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। একই সঙ্গে ভেতরে ভেতরে আরও কঠিন লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে ইরানকে—অর্থনীতি সচল রাখার লড়াইয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে বাধা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশটির অর্থনীতি ক্রমেই চাপে পড়ছে। এর মধ্যেই ইরান সরকার জানিয়েছে, অর্থনীতির দুর্বলতা কাটাতে সংস্কারের উদ্যোগ জোরদার করা হবে। তবে দেশটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা হলে এবার জবাব হবে আরও দ্রুত, কঠোর ও ‘বেদনাদায়ক’।
যুদ্ধ থামেনি, শান্তির পথও বন্ধ
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ছয় মাস পরও যুদ্ধের পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। সংঘাত অনেকটা অচলাবস্থায় আটকে আছে।
জুনে সাময়িক যুদ্ধবিরতির একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেটি ভেঙে পড়ে। যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি আলোচনার পথে ফেরার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাতেও এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি হয়নি।
জুলাইয়ের বড় একটি সময় সামরিক অভিযান কিছুটা কম থাকলেও পরে আবার শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলা। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দুটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে তারা।
এর পরদিন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ‘অনেক দেরি হওয়ার আগেই’ তাদের বুঝতে হবে—ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নিয়ম বদলে গেছে।
তার ভাষায়, এখন থেকে ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তার ওপর যেকোনো হামলার জবাব দেওয়া হবে আরও দ্রুত, আরও কঠোর এবং আরও বেদনাদায়কভাবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও বড় ঝুঁকি
যুদ্ধের এই পর্যায়ে ইরান এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন স্বার্থে হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সংঘাত শুরুর আগে এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ইরান নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও।
নিষেধাজ্ঞার চাপে অর্থনীতি
তবে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখলেও অর্থনৈতিক চাপ সামলানো ইরানের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানি কমিয়ে দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রির পথ বন্ধ করার চেষ্টা জোরদার করেছে।
তিনজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই চাপ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফও বলেছেন, যুদ্ধের সামরিক দিকের পাশাপাশি এখন ইরানের প্রধান লড়াই উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবিকা রক্ষা নিয়ে।
দেশটিতে মুদ্রার বিনিময়মূল্যের ব্যাপক ওঠানামা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বাজার নিয়ন্ত্রণকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
গালিবাফ বলেন, ইরানের মানুষ কঠিন পরিস্থিতি সহ্য করতে পারে। কিন্তু অব্যবস্থাপনা বা নিষ্ক্রিয়তা মেনে নিতে চায় না। তাই সরকারের কাছ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছে জনগণ।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপের জবাব সংস্কারে
ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের জবাব দেওয়া হবে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান তার নীতি পরিবর্তন করবে—এমন ধারণাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে অর্থনীতিকে চাপে ফেলে একটি দেশের জনগণকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু ইরানের অর্থনীতি সংস্কারের দায়িত্ব ইরান সরকার ও জনগণের, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মোরতেজা জামানিয়ানও জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের বিশেষ ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ সদর দপ্তর’ তাদের কার্যক্রম আরও জোরদার করছে।
সামনে দ্বিমুখী চাপ
ইরানের সামনে এখন তাই দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে যুদ্ধের সামরিক চাপ, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞায় দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতি।
সরকার অর্থনীতি সংস্কারের কথা বললেও যুদ্ধ কত দিন চলবে, তেল রপ্তানির ওপর চাপ কতটা বাড়বে এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
একদিকে ইরান হামলার জবাব আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি সামলাতে চাইছে। ফলে যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি ইরানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতিও।
সূত্র: রয়টার্স
এমএসএম
বিজ্ঞাপন