বিজ্ঞাপন
এক টিভি অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ডা. জাকির নায়েককে প্রশ্ন করেন, সবকিছু যদি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত তাকদির অনুযায়ীই ঘটে এবং আমি যদি কোনো পাপকাজ বা অপরাধ করে ফেলি, তবে সেই অপরাধের দায় কার? ধরা যাক, আমার ভাগ্যে যদি খুনের মতো কোনো অপরাধ লেখা থাকে এবং আমি তা সংঘটিত করি, তবে স্বাভাবিকভাবেই তো এর জন্য আমার দায়ী হওয়ার কথা নয়; কারণ এটি তো আল্লাহই আমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। অতএব, এর দায় যদি আল্লাহর ওপরই বর্তায়, তবে এই কাজের জন্য আমাকে কেন শাস্তি ভোগ করতে হবে?
উত্তরে ডা. জাকির নায়েক বলেন:
তকদির সম্পর্কিত এই প্রশ্নটি শুধু অমুসলিমদের পক্ষ থেকেই নয়, বরং অনেক মুসলিমের মনেও জাগে। সাধারণ মানুষের জন্য তাকদির বা ভাগ্যের এই রহস্য বুঝে ওঠা কিছুটা কঠিন। তবে বিষয়টি সহজভাবে বোঝানোর জন্য আমি একটি ব্যবহারিক উদাহরণ দিই।
ধরা যাক, একটি শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক সারা বছর শিক্ষার্থীদের পড়ালেন। বছরের শেষে পরীক্ষার ঠিক আগে সেই শিক্ষক অনুমান বা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, ‘ক’ চিহ্নে চিহ্নিত ছাত্রটি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম হবে, ‘খ’ চিহ্নিত ছাত্রটি দ্বিতীয় বিভাগ পাবে এবং ‘গ’ চিহ্নিত ছাত্রটি পরীক্ষায় ফেল করবে। পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর যখন ফলাফল প্রকাশিত হলো, দেখা গেল শিক্ষকের অনুমানই হুবহু সত্য হয়েছে; ‘ক’ প্রথম হয়েছে, ‘খ’ দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছে এবং ‘গ’ অকৃতকার্য হয়েছে।
এখন আমার প্রশ্ন হলো, শিক্ষক আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন বলেই কি ‘গ’ চিহ্নিত ছাত্রটি পরীক্ষায় ফেল করেছে? নিশ্চয়ই নয়। শিক্ষকের অনুমানের কারণে সে ফেল করেনি, বরং শিক্ষক পুরো বছর পর্যবেক্ষণ করে জানতেন যে প্রথম ছাত্রটি মেধাবী ও পরিশ্রমী, দ্বিতীয়জন মাঝারি মানের, আর তৃতীয় ছাত্রটি পড়াশোনা করত না, ক্লাস ফাঁকি দিত এবং বাড়ির কাজ জমা দিত না। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই শিক্ষক আগাম অনুমান করেছিলেন। তাই ফেল করার জন্য ছাত্র ‘গ’ কখনোই শিক্ষককে দোষারোপ করতে পারে না; এই ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণ তার নিজের।
আরও পড়ুন
ইমানের সর্বোচ্চ শাখা কী?
ঠিক একইভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে ‘ইলমে গাইব’ বা ভবিষ্যতের অদৃশ্যের জ্ঞান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন মানুষ যখন জীবনের কোনো মোড়ে বা চৌরাস্তায় এসে দাঁড়ায়, তখন তার সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য একাধিক পথ খোলা থাকে। ধরা যাক, তার সামনে ১, ২, ৩, ৪ ও ৫—এই পাঁচটি রাস্তা আছে এবং কোন পথে সে যাবে তা বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি তাকে দেওয়া হয়েছে। সে যদি নিজের ইচ্ছায় ৩ নম্বর রাস্তাটি বেছে নেয়, তবে তার তাকদিরেও সেটিই লিপিবদ্ধ থাকে।
এখানে কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকদিরে লিখে রেখেছিলেন বলেই লোকটি ৩ নম্বর রাস্তায় যায়নি, বরং সে নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় ৩ নম্বর পথটি বেছে নেবে—আল্লাহ তাআলা তাঁর অনন্ত জ্ঞানের মাধ্যমে তা আগে থেকেই জানতেন বলেই তাকদিরে তা লিখে রেখেছেন। এটি অনেকটা শিক্ষকের সেই আগাম অনুমানের মতো, তবে আল্লাহর জ্ঞান নিখুঁত ও অকাট্য। লোকটির সামনে পথ বাছাইয়ের সুযোগ ছিল, কিন্তু সে যে ৩ নম্বর পথেই যাবে তা আল্লাহ আগে থেকেই জানতেন, তাই তকদিরেও তা-ই নথিভুক্ত হয়েছে।
এরপর লোকটি যখন আবারও একটি মোড়ে এসে দাঁড়ায় এবং ৩ নম্বর রাস্তাটিই বেছে নেয়, তখনো বিষয়টি একই। সে আবারও এই পথটি বেছে নেবে তা আল্লাহ তাঁর ঐশ্বরিক জ্ঞান দিয়ে অগ্রিম জানতেন বলেই তাকদিরে তা লিখে রাখা হয়েছিল। আল্লাহর লেখার কারণে সে পথ বেছে নেয়নি, বরং তার চয়ন বা পছন্দের কারণেই তাকদিরে তা লেখা হয়েছে।
একই কথা জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন মানুষের সামনে কঠোর পরিশ্রম করে সৎ উপায়ে উপার্জনের পথ যেমন খোলা থাকে, তেমনি চুরি বা ডাকাতি করার সুযোগও থাকে। এখন ২৫ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর লোকটি যদি সৎ পথ ছেড়ে চুরির পথটি বেছে নেয়, তবে আল্লাহ তাআলা তাঁর অগ্রিম জ্ঞানের মাধ্যমে আগেই জানতেন যে এই লোকটিকে সুযোগ দেওয়া হলে সে চুরির পথটিই নির্বাচন করবে। তাই তার তকদিরে লেখা হয়েছে যে সে চুরি করবে। আল্লাহ লিখেছেন বলেই সে চুরি করেনি, বরং সে চুরি করবে বলেই আল্লাহ তা আগে থেকে লিখে রেখেছেন।
একইভাবে কেউ যদি খুনের মতো অপরাধ করে, তবে সেটিও ছিল তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তার সামনে অপরাধ না করার বিকল্প পথও খোলা ছিল, কিন্তু সে নিজের ইচ্ছায় অপরাধটি সংগঠন করেছে। অতএব, এর জন্য সম্পূর্ণ দায় তার নিজের।
আরও পড়ুন
ইসলাম মানুষের জীবন কঠিন করে দেয়?
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন