বিজ্ঞাপন
ইসলামে সত্যবাদিতাকে মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভূষণ ও নৈতিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সত্যবাদীদের জন্য সুউচ্চ মর্যাদার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কোনো কথা ‘সত্য’ হওয়াই সেটি প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়; বরং ওই কথার উদ্দেশ্য কী, কার সামনে তা বলা হচ্ছে এবং এর বাস্তব পরিণতি সমাজে কী প্রভাব ফেলতে পারে এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।
খারাপ উদ্দেশ্য ও প্রভাবের কারণে সত্য কথাও অনেক সময় গিবত, চোগলখোরি গণ্য হয় যা গুনাহের কাজ। মুমিনের দায়িত্ব শুধু সত্য কথা বলা নয়, একইসঙ্গে কল্যাণকর কথা বলাও। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭)
এখানে আমরা এমন ৫ ধরনের সত্যের কথা বলছি যা সত্য হলেও বলা থেকেও বিরত থাকতে হবে:
১. গিবত বা পরনিন্দা
কারো অবর্তমানে তার এমন কোনো দোষ বা ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা যা সে শুনলে অপছন্দ করবে তা শরিয়তের পরিভাষায় গিবত। গিবতে আলোচ্য তথ্য শতভাগ সত্য হলেও সেটি কবিরা গুনাহ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) গিবতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘গিবত হলো তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যিই থাকে? তিনি বললেন, ‘তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গিবত করলে। আর তা যদি না থাকে, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ আরোপ করলে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯, সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৩৪)
২. চোগলখোরি
একটি সত্য কথা এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যার উদ্দেশ্য বা পরিণতিতে তাদের মধ্যে বিরোধ, বিদ্বেষ বা সম্পর্কচ্ছেদ ঘটে, তাকে ‘নামিমাহ’ বা চোগলখোরি বলা হয়। ‘আমি তো মিথ্যা বলিনি’—এই সাফাই গেয়ে এ রকম কথার মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক সুসম্পর্ক নষ্ট করা বা ফিতনা ছড়ানো সম্পূর্ণ হারাম।
হজরত হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহিহ বুখারি: ৬০৫৬, সহিহ মুসলিম: ১০৫)
আরও পড়ুন
কারো গিবত করে ফেললে ৪ করণীয়
৩. আমানত রক্ষা
কেউ বিশ্বাস করে কোনো কথা বললে তা আমানত হিসেবে গণ্য হয়। অনুমতি ছাড়া সেই সত্য তথ্য অন্য কারো কাছে প্রকাশ করা আমানতের খেয়ানতের শামিল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি কোনো কথা বলার পর যদি ডানে-বামে তাকায় (অর্থাৎ কেউ শুনছে কি না তা খেয়াল করে), তবে সেই কথাটি আমানত হিসেবে গণ্য।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৬৮, জামে আত-তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৯)।
বিশেষ করে দাম্পত্য জীবন, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার নির্দেশ ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।
৪. ব্যক্তিগত ত্রুটি প্রকাশ করে সম্মানহানি করা
কারো অতীত জীবনের কোনো সত্য ভুল বা ব্যক্তিগত ত্রুটি অপ্রয়োজনে জনসমক্ষে তুলে ধরে তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা গুনাহের কাজ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অন্য মুসলমানের জন্য হারাম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৯৩৩)
৫. ফিতনা সৃষ্টি করা
যেসব সত্য প্রকাশ করার ফলে কোনো শরিয়তসম্মত কল্যাণ বা ফায়দা অর্জিত হয় না; বরং সমাজে বিশৃঙ্খলা, শত্রুতা বা নিরপরাধ মানুষের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়, সেখানে জবান সংবরণ করা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না এবং নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৭৭৮)।
পবিত্র কুরআনেও অনর্থক ও ক্ষতিকর কথাবার্তা থেকে মুমিনদের দূরে থাকার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর যারা অনর্থক কথাবার্তা ও কাজকর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৩)
আরও পড়ুন
চোগলখোরের পরিচয় ও পরিণাম
জুলুম বা অপরাধ সংঘটিত হলে সত্য প্রকাশ করতে হবে
পারস্পরিক কথাবার্তার আমানত নষ্ট হওয়া, অন্যের সম্মানহানি হওয়া, ফিতনা সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি কারণে কোনো কথা তখনই গোপন রাখা যাবে যখন তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, ভুলত্রুটি বা পাপ হবে। যদি অন্যের ওপর কোনো জুলুম হয়ে থাকে, কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে অথবা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে অপরাধীর সম্মানহানি বা ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় সত্য প্রকাশ করা অন্যায় তো নয়ই, বরং সত্য প্রকাশ করাই দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, সাধারণ সব পারস্পরিক কথাবার্তা আমানত, তবে তিন ধরনের কথা আমানাত নয়, যথা- ১. অন্যায়ভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র সম্পর্কিত কথাবার্তা, ২. গোপনে ব্যভিচারের ষড়যন্ত্র সম্পর্কিত কথাবার্তা এবং ৩. অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র সম্পর্কিত কথাবার্তা। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৬৯)
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন