বিজ্ঞাপন
‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যানুয়াল ল লেকচার-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন অডিটোরিয়ামে আইন অনুষদ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এতে ‘বিয়ন্ড জুডিশিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্স: কনস্টিটিউশনাল আইডেন্টিটি অ্যান্ড দ্য কোয়েস্ট ফর ইনস্টিটিউশনাল অটোনমি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উলফসন কলেজের অনারারি অ্যান্ড ভিজিটিং ফেলো ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। স্বাগত বক্তব্য দেন আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক।
আরও পড়ুন
ডাকসু সংগ্রহশালা / জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেললেন ঢাবি শিক্ষার্থী, যে ব্যাখ্যা দিলেন ফরহাদ
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার পাশাপাশি ন্যায়, মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার মূল্যবোধ ধারণ করে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে দীর্ঘ ও গৌরবময় একাডেমিক ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি জবাবদিহিতা, দায়িত্বশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি।
অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম আরও বলেন, আইন, বিধি-বিধান ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। পরিবর্তনশীল বিশ্ব বাস্তবতায় নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।
মূল প্রবন্ধে সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, সংবিধান শুধু কিছু লিখিত বিধান বা আইনগত দলিল নয়; এটি একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতি, সংগ্রাম, আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত মূল্যবোধের প্রতিফলন। তবে সংবিধানের এসব মূল্যবোধ তখনই কার্যকর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেগুলো ধারণ ও বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সাংবিধানিক শাসনের একটি অপরিহার্য শর্ত। তবে বিচারকের মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বাহ্যিক হস্তক্ষেপমুক্ত থাকাই বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না। বিচার বিভাগের নিয়োগ, প্রশাসন, অর্থায়ন ও সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনাসহ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি সাংবিধানিক অঙ্গীকার, আর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন হলো সেই অঙ্গীকারকে টেকসই করার কাঠামো।
সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধের উপস্থিতি থাকলেও এসব মূল্যবোধকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখার মতো শক্তিশালী ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের চরিত্র ও কার্যকারিতা পরিবর্তিত হলে সাংবিধানিক শাসনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, ওই সময় দেশের সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার একটি সুযোগ তৈরি করে। এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষমতার আরও ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন এবং ব্যক্তিনির্ভরতার পরিবর্তে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা।
আরও পড়ুন
ঢাবির ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করলেন ‘মবের শিকার’ তাহসিন জাহান
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক সক্ষমতা, মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, আর্থিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা, পেশাগত সততা ও জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনোভাবেই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানকে আইন, স্বচ্ছতা, পেশাগত নৈতিকতা ও সাংবিধানিক নীতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, কোনো সংস্কার যদি কেবল একজন ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট নেতৃত্বের সময় পর্যন্ত টিকে থাকে, সেটিকে প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বলা যায় না। টেকসই সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, যা নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যেও নিজস্ব মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। ভালো নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুণাবলি দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না; টেকসই সাংবিধানিক শাসনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে আইন অনুষদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
আরটি/এমএমকে
বিজ্ঞাপন