বিজ্ঞাপন
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি বিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমালোচনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। সংগঠনটি বিশেষ করে আইনের ধারা ২৫ থেকে ‘মানহানি’ ও ‘হেয়প্রতিপন্ন করা’ বাদ এবং ধারা ২৬ক পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন তথ্য-উপাত্ত ব্লক বা অপসারণে সরকারের অতিরিক্ত ক্ষমতার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করে স্বচ্ছতা ও বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানায় ব্লাস্ট।
ব্লাস্ট বলেছে, নারী ও শিশুসহ অনলাইন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধের নামে বৈধ সমালোচনা, সাংবাদিকতা, ব্যঙ্গ, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা জনস্বার্থের বিতর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। প্রস্তাবিত আইনের ‘মানহানি’, ‘হেয়প্রতিপন্ন করা’, ‘বুলিং’, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’-সংক্রান্ত বিধানগুলো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিস্তৃত ও অস্পষ্ট বলে মনে করছে সংগঠনটি।
ধারা ২৫ থেকে ‘মানহানি’ ও ‘হেয়প্রতিপন্ন করা’ বাদ দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে ব্লাস্ট জানায়, দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানি এরই মধ্যে ফৌজদারি অপরাধ। এর বাইরে অনলাইনের জন্য পৃথক ও বিস্তৃত অপরাধ তৈরি করা হলে গঠনমূলক সমালোচনা, মতামত, ব্যঙ্গ, সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থের বিষয়ে আলোচনা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশেষ করে ‘হেয়প্রতিপন্ন করা’ বলতে কারও মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থান ক্ষুণ্ন করে এমন বক্তব্য বোঝানোর সুযোগ থাকায় বৈধ সমালোচনা ও অপরাধের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা থাকবে না বলে মনে করছে ব্লাস্ট।
আরও পড়ুন
সংশোধন হচ্ছে সাইবার আইন / গুজব-অপতথ্য প্রচারে ১০ বছরের জেল, ৪০ লাখ টাকা জরিমানা
সংগঠনটি বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডও মানহানির ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের আওতা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেছে। এ কারণে ধারা ২৫ থেকে ‘মানহানি’ ও ‘হেয়প্রতিপন্ন করা’—দুটিই বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ব্লাস্ট।
প্রস্তাবিত ‘বুলিং’ বিধান নিয়েও আপত্তি রয়েছে সংগঠনটির। তাদের মতে, বর্তমানে যেভাবে বিষয়টি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক প্রচারণা, ব্যঙ্গ, ভোক্তার অভিযোগ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, ভিন্নমত কিংবা বৈধ অন্য কোনো বক্তব্যও অপরাধের আওতায় চলে আসতে পারে। তাই বুলিংকে কেবল গুরুতর, ইচ্ছাকৃত ও বারবার সংঘটিত ডিজিটাল হয়রানি, হুমকি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো আচরণের মধ্যে সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছে ব্লাস্ট। একই সঙ্গে সমালোচনা, ব্যঙ্গ, সাংবাদিকতা, রাজনৈতিক বক্তব্য, অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচার ও ভিন্নমত প্রকাশকে স্পষ্টভাবে এই অপরাধের বাইরে রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত ধারা ২৬ক নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ব্লাস্ট। এ ধারায় ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’-সংক্রান্ত অপরাধের প্রস্তাব পুরোপুরি বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, কোনো তথ্য অযাচাইকৃত বা অসমর্থিত হলেই সেটি মিথ্যা হয়ে যায় না। জরুরি পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবাধিকার সংকট বা দ্রুত পরিবর্তনশীল কোনো ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সবসময় সম্ভব নয়। এমন তথ্য প্রকাশকে অপরাধের আওতায় আনা হলে সাংবাদিক, গবেষক ও নাগরিকেরা জনস্বার্থের বিষয়ে তথ্য প্রকাশে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
ব্লাস্ট আরও বলেছে, প্রস্তাবিত আইনে ‘মিথ্যা’, ‘বিকৃত’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্যের ধারণাগুলো যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। অথচ এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে অস্পষ্ট সংজ্ঞার সঙ্গে কঠোর শাস্তি যুক্ত হলে আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
আরও পড়ুন
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী / ফেসবুক থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত সরাতে বাধ্য করতে আইন করবে সরকার
অনলাইন তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লক করার ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে ব্লাস্ট। সংগঠনটির মতে, ‘অপতথ্য’ বা ‘গুজব’, জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার সম্ভাব্য ক্ষতি, মানহানিকর বা রাষ্ট্রকে অপমানজনক মনে হওয়ার মতো বিস্তৃত কারণ দেখিয়ে তথ্য ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া হলে তা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে ব্লক করা তথ্যের বিষয়ে বিদ্যমান স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়া এবং ট্রাইব্যুনালের অনুমোদনের সময়সীমা পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে ব্লাস্ট। তাদের মতে, তথ্য ব্লক বা অপসারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বিচারিক তদারকি সরকারের জন্য কোনো অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বাধা নয়; বরং নির্বাহী কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ ঠেকাতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। তাই বিদ্যমান স্বচ্ছতা ও বিচারিক তদারকির ব্যবস্থা বজায় রেখে তা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
ব্লাস্টের ভাষ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩-এর অভিজ্ঞতা থেকে সরকারের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। এসব আইনে অনলাইন বক্তব্যসংক্রান্ত বিস্তৃত ও অস্পষ্ট বিধান থাকায় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সমালোচক ও সাধারণ নাগরিকদের মতপ্রকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল বলে দাবি করেছে তারা। তাই নতুন আইনে আগের বিতর্কিত বিধানগুলো নতুন নামে ফিরিয়ে না আনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
আরও পড়ুন
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইবার বুলিংয়ে বিপর্যস্ত নারী শিক্ষার্থীরা
বিজ্ঞপ্তিতে ব্লাস্ট আরও বলেছে, চূড়ান্ত সাইবার আইন এমন হতে হবে, যাতে প্রকৃত সাইবার হুমকি মোকাবিলার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমালোচনা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারও সুরক্ষিত থাকে। এ জন্য প্রস্তাবিত শাস্তির মাত্রা প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক কি না, তা পর্যালোচনা এবং অনলাইন তথ্য ব্লক ও অপসারণের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা প্রয়োগ ঠেকানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ব্লাস্ট।
সংগঠনটি মনে করে, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন থাকলেও এর নামে বৈধ মতপ্রকাশের পথ সংকুচিত করা উচিত নয়। তাই প্রস্তাবিত সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
এমডিএএ/এসএইচএস
বিজ্ঞাপন