বিজ্ঞাপন
মাহমুদ নোমান
বহুদিন পর একজন তরুণ কবি হয়ে আরেকজন জীবনের মধ্য গগন পেরিয়ে যাওয়া কবির কবিতাগুলো পড়ে আন্দোলিত হচ্ছি! কবি ইউসুফ মুহম্মদের কথা বলছি। একজন কবির কবিতায় জীবনের না-বলা কথা, এমনকি অনুভূতি বুঝতে পারা যায়। আবার কবি তো রহস্যময়। সে রহস্য ভেদ করা অসম্ভব কিন্তু একেক পাঠক একেকভাবে বুঝবে; এটাই দাবি রাখে জীবন্ত কবিতা। কবিতা যার কাছে যাবে তার। আধ্যাত্মিকতার মিশেলে সুস্থির সুস্পষ্ট ইঙ্গিতের কবি ইউসুফ মুহম্মদ। শান্ত কিংবা শ্রান্ত হওয়ার যাত্রাপথে দাগ টেনে যায় তার কবিতা।
তার ‘জল প্রবাহে পদচিহ্ন’ কাব্যগ্রন্থ পাঠে বুঝেছি, তার প্রতিবাদীর কণ্ঠস্বর। যুদ্ধ যে চলমান সেটি বলে রেখেছেন। তবে উগ্রবাদী নন কিংবা ছিঁড়ে দেখার অথবা ছিঁড়ে দেখিয়ে দেওয়ার স্বরে কথা বলেন না। তিনি নিবিড় পরিচর্যার মধ্যে সত্য উদ্ভাসিত করেন। আমার জন্মেরও আগে ১৯৮৮ সালে ইউসুফ মুহম্মদের প্রকাশিত ‘জল প্রবাহে পদচিহ্ন’ বইয়ের কবিতার নামগুলো পড়লে কথাগুলো মিলিয়ে নিতে পারেন। যেমন- আন্তর্জাতিক শান্তিবর্ষে যা লেখা হয়নি; মানুষের গল্প: ক, খ, গ; নেউলের আত্মকথন; আরও অনেক যুদ্ধ আছে; অশরীরী আত্মা; ঈশ্বরের গল্প; পা রেখে চঞ্চল জলে; তোমার বা-হাঁত ইত্যাদি। এসব নামে বোঝা যায়, যুবক বয়সে কেমন পরিণত ছিলেন ইউসুফ মুহম্মদ।
কবির প্রশ্ন শোনার চেষ্টা ছিল। শুধু তাই নয়, প্রশ্ন করা এবং সেই প্রশ্নের সমাধানও খুঁজেছেন, ‘শরতের নদীতে বৃষ্টির দৃশ্য/ তুমি কখনো দেখোনি/ জলের শব্দের সাথে যারা জেগে ওঠে/ তাদের সংগীত-প্রিয়তার/ কথা জানা নেই, তাই তুমি/ বালকের জন্য যাবতীয়/ ঘৃণা মন থেকে মনে আর/ খোলা আকাশে উড়াও;’ (পা রেখে চঞ্চল জাগে; ৩৩ পৃ.)
আরও পড়ুন
‘নৌকাডুবি’ আজও কেন জনপ্রিয় মানুষের কাছে
আমার অগ্রজ কবিদের অর্থাৎ যাদের কবিতা পড়ে বড় হয়েছি; তাদের যুবক বয়সের কবিতা পড়তে আমার যত কৌতূহল। ওই বয়সে দুষ্টু-মিষ্টি কথাবার্তার মধ্যে আবেগের যে টান, সেটি নির্ভেজাল। ওই বয়সে অকপটে বলার যেই প্রতিশ্রুতি কবিতাকে দেয় অনন্য মাত্রা। কবির প্রথম কবিতার বইয়ে কিংবা প্রথম কবিতা বইয়ের পরে নিজের পথ আলাদা হয়ে যায়। এখানে ইউসুফ মুহম্মদ সময়ের অন্যান্য কবিদের থেকে বেশ দূরত্বে।
০২.১৯৮৮সালে ‘জল প্রবাহে পদচিহ্ন’ প্রকাশের পরে ইউসুফ মুহম্মদের কবিতার মধ্যে ছিল নিজেকে ভাঙা-গড়া; ইউসুফ মুহম্মদ মূলত আত্মান্বেষী কবি। একটানে বললে নির্ভেজাল আকুতিভরা প্রেমবাজ কবি। ‘জল প্রবাহে পদচিহ্ন’ প্রকাশের দেড় দশকের দীর্ঘসময়ে নিজেকে গড়ে তুলেছেন আত্মমগ্ন স্কেচে। ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘বিষাদের রেখেছ কী নাম’ কবিতার বই। বইয়ে ইউসুফ মুহম্মদ কবিতাকে নিয়ে গেছেন অনন্য মাত্রায়। শব্দের বন্ধন আরও পোক্ত তবে খোলাসা করে চমৎকারিত্বে; কথার মধ্যে চাতুর্যে মিহি অনুভব পাঠককে আকৃষ্ট করে রিদমিক টিউনে, ‘কথ না শুনেই তুমি হাসো/ তোমার হাসির বিপরীতে/ ওড়ে সুচতুর পাখি’ (৪০ পৃ.)।
এ ছাড়া ইউসুফ মুহম্মদের কবিতার শক্তিশালী দিক হলো, এখনই একটা নতুন কবিতা লিখলে; সেটি মনে হবে তারুণ্যের কবিতা। অর্থাৎ নিজেকে ভাঙা-গড়ার মধ্যে রেখেছেন। আদতে কোনো কবি যদি জেনে যান সেরা কবিতা লিখে ফেলেছেন। তবে লেখার দম শেষ বলে। ইউসুফ মুহম্মদের কবিতায় শব্দ নিয়ে টানাহেঁচড়া নেই। ফর্ম নিয়ে বাতিকও নেই। তবে স্পন্দিত শব্দের স্মার্ট বুননকৌশল আছে।
আরও পড়ুন
যার কবিতার বুনট পলিমাটির মতো উর্বর
০৩.‘বিষাদের রেখেছ কী নাম’ বইয়ের পরে প্রকাশিত হয় ‘অর্ধেক পুতুল’ বইটি। এখানে বেশ শাণিত স্বরের কবি ইউসুফ মুহম্মদকে পাই। বইয়ের সাকিন, নাইয়র, পর্যটন, মল্লিকা নাভির নিচে, অর্ধেক পুতুল, জনান্তিকে কবিতাগুলো বারবার পড়লে বারবার নতুন করে বোধ ও বিশ্বাসের সঞ্চার করে। কবিতাগুলো ইউসুফ মুহম্মদকে বিশিষ্টতা দেবে নিশ্চয়ই। ‘অর্ধেক পুতুল’ বইটি ইউসুফ মুহম্মদকে বাংলা সাহিত্যে মর্যাদাপূর্ণ আসন দেবে- ‘সামনাসামনি বসো/ আমি তোমার দুচোখ পর্যটনে যাবো।/ তখন সতর্ক দৃষ্টি রেখো,/ না হয় তোমার খোঁপায় অকস্মাৎ/ ঢুকে পড়তে পারে সমুদ্রের নুন।’ (পর্যটন; ৭৬ পৃ.)
বইটির পরে প্রকাশিত ‘জানালায় ঘুম’ কবিতার বইয়ে নিজের দৌড়ের গন্তব্যে স্থির একজন ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাই। কিছুটা আক্ষেপও খোঁচা মারে। কিছুটা উপলব্ধ অভিযোগে মিশেল অভিমান অথবা অভিজ্ঞতা। তবে কবিতা তো সিদ্ধান্ত পৌঁছাবার কিছু নয়। একজন ইউসুফ মুহম্মদ যেখানে ক্ষান্ত হবেন; সেখান থেকে আরেকজনের দৌড়। ইউসুফ মুহম্মদের কবিতায় যেই মোহনীয় উপমার মজলিস; সেখানে চিত্রিত কল্পের দর্পিত ছবি জাগতিক বাস্তবতার মধ্যে মিশে যায়। ইউসুফ মুহম্মদের কবিতা পুরোপুরি বুঝে ফেলার কৃতিত্বই দিতে চায় না। একটা মারেফতি ঘোরে টলে যেতে পারেন। অনেকে এখনকার কবিতায় যে ছন্দ খোঁজেন অর্থাৎ অন্ত্যমিলে মানে শেষের দিকে, জীবনই তো শেষ হয়ে শেষ হলো না এমন অবস্থা। সেখানে কবিতায় মিল খোঁজা অনর্থক। এসব কথা আমি লিখেছি তার বাছাই কবিতার সংকলন ‘সাক্ষী যখন শ্রীমতি চাঁদ’ বইটি পাঠশেষে। বইয়ের নামকরণেই বুঝতে পারবেন ইউসুফ মুহম্মদ একজন মাদারজাদ কবি।
এসইউ
বিজ্ঞাপন