বিজ্ঞাপন
কথাবার্তায় শিষ্টাচার, শালীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার গুরুত্ব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। স্ট্যাটাসের শুরুতেই তিনি ‘একজন প্রাক্তন বিসিবি পরিচালকের শিষ্টাচারহীন বক্তব্য’ নিয়ে কিছু কথা বলার কথা জানান।
শিষ্টাচারকে শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়, একজন মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার পরিচায়ক হিসেবেও দেখছেন বিসিবির এই পরিচালক।
তিনি লিখেছেন, ‘কথাবার্তায় শিষ্টাচার, শালীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা শুধু সামাজিক সৌজন্য নয় এটি একজন মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক।’
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও কথাবার্তার আদবকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করেছেন সিরাজউদ্দিন আলমগীর। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলা এবং মত প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা ও ভালো পদ্ধতি অনুসরণ করার শিক্ষা রয়েছে ইসলামে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘অর্থাৎ ইসলামী দৃষ্টিতে সঠিক কথা বলাই যথেষ্ট নয়, কিভাবে বলা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।’
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একটি হাদিসের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’
এই শিক্ষার ব্যাখ্যায় সিরাজউদ্দিন আলমগীর মনে করেন, এমন কোনো কথা বলা উচিত নয় যা কাউকে অকারণে অপমান, আঘাত কিংবা বিভেদের দিকে ঠেলে দেয়। ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে না দেখার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। মতের সমালোচনা করা গেলেও ব্যক্তিগত আক্রমণকে যুক্তিসঙ্গত মনে করেন না এই বিসিবি পরিচালক।
তিনি লিখেছেন, ‘একজনের মতের সমালোচনা করা যায়, কিন্তু তাকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা যুক্তির শক্তি বাড়ায় না বরং নিজের যুক্তির দুর্বলতাই প্রকাশ করে।’
শালীন ভাষায় একই বক্তব্য আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা যায়- এমন একটি উদাহরণও দিয়েছেন তিনি। তার মতে, ‘আপনার এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভুল’- এর পরিবর্তে- আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে দেখি। আমার মনে হয় এখানে আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন- এভাবে বলা বেশি মানানসই।’
গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন।
সিরাজউদ্দিন আলমগীর লিখেছেন, ‘রাজনীতি, ক্রীড়া, ধর্ম, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় নীতি যেকোনো বিষয়ে মতভেদ থাকবেই। কিন্তু যদি আমরা ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা না করে গালি, অপমান, চোর-চাপড়ি, ফকিন্নি বলে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্রহননের মাধ্যমে মোকাবিলা করি, তাহলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে।’
ভিন্নমতকে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম মনে করেন তিনি। তার মতে, শুধু নিজের মতের সঙ্গে একমত মানুষের কথা শুনলে নিজের চিন্তার সীমাবদ্ধতা বোঝা যায় না। বরং বিতর্কের মধ্য দিয়েই নিজের যুক্তির দুর্বলতা এবং অন্য পক্ষের যুক্তির শক্তি বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি লিখেছেন, ‘একটি মন্তব্য মুছে ফেলা গেলেও তার দ্বারা সৃষ্ট আঘাত অনেক সময় মুছে ফেলা যায় না। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাস্তব জীবনের মতোই শিষ্টাচার প্রয়োজন।’
ক্রীড়া প্রশাসন ও সুশাসনের ক্ষেত্রেও ভিন্নমতের প্রতি সম্মানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন সিরাজউদ্দিন আলমগীর। তিনি মনে করেন, একটি ক্রীড়া সংগঠনে সভাপতি, পরিচালক, কর্মকর্তা, খেলোয়াড়, কোচ কিংবা সমর্থকদের মত সবসময় এক হবে না। তবে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্মানজনক পরিবেশ থাকা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘গুড গভর্ন্যান্সের অন্যতম সংস্কৃতি হলো সম্মানজনক ভিন্নমত প্রকাশ অর্থাৎ সম্মানজনকভাবে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ।’
শিষ্টাচারকে দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিসিবির এই পরিচালক। তিনি বলেন, ‘শিষ্টাচার দুর্বলতার লক্ষণ নয় এটি আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি। শালীনতা মানে নিজের মত প্রকাশ না করা নয় বরং দৃঢ়ভাবে নিজের মত প্রকাশ করেও অন্যের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা।’
পরমতের প্রতি শ্রদ্ধার অর্থ নিজের অবস্থান থেকে সরে যাওয়া নয়- এমন কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আমি আপনার মতের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু আপনার মত প্রকাশের অধিকার এবং একজন মানুষ হিসেবে আপনার মর্যাদাকে আমি সম্মান করি।’
সবশেষে একটি সভ্য সমাজে যুক্তি, বিতর্ক ও মতপার্থক্যের পাশাপাশি শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। তিনি লিখেছেন, ‘একটি সভ্য সমাজে যুক্তি থাকবে, বিতর্ক থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু অশালীনতা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপমান যেন যুক্তির বিকল্প না হয়ে ওঠে।’
স্ট্যাটাসের শেষ বক্তব্যে তিনি মানুষের শিক্ষার মূল্যায়ন নিয়েও নিজের মত তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, ‘মানুষের প্রকৃত শিক্ষা শুধু সে কতটা জানে তা দিয়ে নয় সে কতটা ভদ্রভাবে তার জ্ঞান, মত ও ভিন্নমতকে ধারণ করতে পারে তা দিয়েও বিচার করা যায়।’
সিরাজউদ্দিন আলমগীর স্ট্যাটাসে কার উদ্দেশ্যে লিখছেন সেটা বলেননি। তবে বিসিবির সাবেক পরিচালক আসিফ আকবর কয়েকদিন আগে বিসিবি নিয়ে নানা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে সব নির্বাচনই বৈধভাবে হয়েছে শুধু বিসিবি নির্বাচন ছাড়া।’
এছাড়া বিপিএলে দুই বছরে ৪০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে- বিসিবির বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবালের এমন মন্তব্যকেও কয়েকদিন আগে মিথ্যাচার বলেছিলেন আসিফ। ধারণা করা হচ্ছে তার উদ্দেশ্যেই এই স্ট্যাটাস দিয়েছেন সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর।
এসকেডি/আইএইচএস/
বিজ্ঞাপন