বিজ্ঞাপন
তারকার মৃত্যু সাধারণ মানুষের মৃত্যুর মতো নিছক একটি ঘটনা হয়ে থাকে না। জনপ্রিয়তার কারণে তাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত নিয়েও তৈরি হয় অসংখ্য প্রশ্ন, জল্পনা ও নানা তত্ত্ব। কখনো তদন্তের পরও কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলে না, কখনো সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবারের দাবি মেলে না। আবার কোনো কোনো ঘটনায় সময়ের সঙ্গে নতুন তথ্য সামনে আসায় পুরোনো রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা সালমান শাহ থেকে হলিউডের মেরিলিন মনরো এমন বেশ কয়েকজন তারকার মৃত্যু আজও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে।
সালমান শাহ: আত্মহত্যা, নাকি হত্যা?
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যান বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তারকা সালমান শাহ। তার আসল নাম ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। শুরু থেকেই তার পরিবার মৃত্যুটিকে আত্মহত্যা বলে মানতে চায়নি এবং হত্যার অভিযোগ তুলে আসছিল।
ঘটনাটি নিয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছে। ১৯৯৭ সালে সিআইডি আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। পরে বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০২০ সালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিকেশন (পিবিআই)-এর প্রায় ৬০০ পাতার প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালে আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণও করেছিল।
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ হয়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার আদালত সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেয় এবং সিআইডি-কে নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে বিষয়টি আবার আইনি তদন্তের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ হত্যা প্রমাণিত হয়েছে এমন কথা বলা যাবে না; আবার পুরোনো আত্মহত্যার সিদ্ধান্তও এখন একমাত্র আইনি অবস্থান নয়।
মেরিলিন মনরো: হলিউডের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি
১৯৬২ সালের ৪ আগস্ট মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান মেরিলিন মনরো। লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িতে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে শরীরে বিপুল পরিমাণ ঘুমের ওষুধ ওষুধজাতীয় পদার্থ পাওয়া যায় এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত ওষুধ গ্রহণকে ধরা হয়। তদন্তকারী কর্নারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল ‘প্রবাবলি সুইসাউড’ অর্থাৎ সম্ভাব্য আত্মহত্যা।
কিন্তু আত্মহত্যার কোনো চিঠি পাওয়া যায়নি। এ থেকেই শুরু হয় নানা প্রশ্ন। পরে মেরিলিনকে হত্যা করা হয়েছিল এমন তত্ত্বও জনপ্রিয় হয়। ১৯৮২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দপ্তর বিষয়টি আবার পর্যালোচনা করে। সেই তদন্তে হত্যার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং মূল সিদ্ধান্ত বদলানো হয়নি। ফলে আজও তার মৃত্যু নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থাকলেও সরকারি সিদ্ধান্ত আত্মহত্যার সম্ভাবনার দিকেই।
আরও পড়ুন
মানুষ না খেয়ে কতদিন বাঁচে?
জর্জ রিভস: টেলিভিশনের ‘সুপারম্যান’
১৯৫০-এর দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিজের সুপারম্যান অভিনেতা জর্জ রিভস ১৯৫৯ সালের ১৬ জুন নিজের বাড়ির শোবার ঘরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারা যান। বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর। পুলিশ এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করে। কিন্তু ঘটনাস্থলের কিছু বিষয় পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন তৈরি করে। অস্ত্রে তার আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি, শরীরে গুলির দাগের পাশাপাশি কিছু আঘাতের চিহ্ন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি ছিল। তার মৃত্যুকে ঘিরে হত্যার তত্ত্বও ছড়িয়ে পড়ে। পরে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত হলেও আত্মহত্যার সিদ্ধান্তকে উল্টে দেওয়ার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই রিভসের মৃত্যু সরকারিভাবে আত্মহত্যা, কিন্তু কীভাবে ঠিক সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে রহস্য থেকেই গেছে।
নাটালি উড: নৌকায় শেষ রাত
হলিউড অভিনেত্রী নাটালি উড ১৯৮১ সালের ২৯ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাটালিনা দ্বীপের কাছে পানিতে ডুবে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৪৩ বছর। প্রথমে মৃত্যুর কারণ হিসেবে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে মৃত্যু ধরা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দশক পরে মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। ২০১১ সালে নৌকার ক্যাপ্টেন ডেনিস ডেভার্ন নতুন কিছু তথ্য সামনে আনেন এবং তদন্ত আবার শুরু হয়। ২০১২ সালে মৃত্যুর সনদে কারণ বদলে করা হয় ‘ডুবে যাওয়া এবং অন্যান্য অনির্ধারিত কারণ’। অর্থাৎ কীভাবে তিনি পানিতে পড়েছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। ২০২২ সালে তদন্তকারীরা জানান, তাদের হাতে থাকা সব সূত্র প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখনো তাই নাটালি উডের মৃত্যু পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।
ব্রুস লি: মাত্র ৩২ বছরেই রহস্যমৃত্যু
মার্শাল আর্টের কিংবদন্তি ব্রুস লি ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই হংকংয়ে মারা যান। বয়স মাত্র ৩২। ময়নাতদন্তে তর মস্তিষ্কে সেরিব্রাল ইডিমা বা মস্তিষ্কে অতিরিক্ত ফোলা পাওয়া যায়। সরকারি ব্যাখ্যায় ইকুয়াজেসিক নামের ব্যথানাশক ওষুধের প্রতি অতিসংবেদনশীলতার কারণে এই সমস্যা হয়েছিল বলে ধরা হয়।
তবে কয়েক দশক ধরে তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা তত্ত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে গবেষকেরা প্রস্তাব করেছেন, অতিরিক্ত পানি গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত হাইপোন্যাট্রেমিয়া থেকেও সেরিব্রাল ইডিমা হতে পারে। তবে এটি একটি গবেষণাভিত্তিক হাইপোথিসিস বা অনুমান, চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়।
শেষ পর্যন্ত সত্য কোথায়?
এই ঘটনাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো রহস্য থাকা মানেই হত্যা প্রমাণিত হওয়া নয়। সালমান শাহর ক্ষেত্রে একাধিক তদন্তের পরও আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত এসেছিল, আবার নতুন আইনি প্রক্রিয়ায় হত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে। মেরিলিন মনরোর ক্ষেত্রে হত্যার ষড়যন্ত্রের বহু তত্ত্ব থাকলেও সরকারি তদন্ত তা সমর্থন করেনি। নাটালি উডের মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখনো ‘আন্ডারমাইন্ডেড’, আর জর্জ রিভসের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার সরকারি সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বহু প্রশ্ন অনুত্তরিত।
আরও পড়ুন
মাত্র ১ জন বাসিন্দার এক দেশ, রাজা-মুদ্রা নিজস্ব সবই আছে
তাই জনপ্রিয় তারকাদের মৃত্যুকে ঘিরে প্রচলিত গল্পের সঙ্গে তদন্তে প্রমাণিত তথ্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি। সময় যতই পেরিয়ে যাক, কোনো রহস্যের সমাধান করতে হলে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত-জল্পনা নয়।
সূত্র: বিবিসি, হিস্টোরি ডটকম, ফক্স নিউজ
কেএসকে
বিজ্ঞাপন