সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মশতবর্ষে প্রথম আলোর ছিল বড় আয়োজন। বিভিন্ন লেখার মাঝে ছিল সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের এ লেখাটি। ‘সৈয়দ মুজতবা আলী: জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধা—শুধু রম্যলেখক নন’ শিরোনামে এ লেখাটি এত দিন ছিল শুধু ছাপা কাগজের পাতায়, আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো
ছেলেবেলায় ডায়েরি লেখাটা একটা অবশ্য-কর্তব্য ছিল। এবং তা লিখতে হতো ইংরেজি ভাষায়, উদ্দেশ্য: উন্নত ভাষা-শিক্ষা। ডায়েরি লেখি কি না, তা বাড়িতে বাবা জিজ্ঞেস করতেন, স্কুলে ইংরেজির স্যার। ওই চর্চা চলেছে কলেজ পর্যন্ত, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে যখন প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করেছি অনেক বিষয়ে, তখন ডায়েরি লেখাটাও বাদ দিয়েছি, চিরদিনের মতো। প্রাণান্তকর মনে হলেও কাজটা অবশ্য খুব খারাপ ছিল না। ইংরেজি ভাষায় তেমন কোনো ব্যুৎপত্তি অর্জিত না হলেও অনেক ঘটনার বিবরণ, যে কটা ডায়েরি এখনো রয়ে গেছে সময়ের উজানস্রোত এড়িয়ে, সেগুলো পড়লে পাই। জসীমউদ্দীন কবে গিয়েছিলেন সিলেটে? অথবা জয়নুল আবেদিন? কবে শেখঘাট বয়েজ ক্লাবকে চার উইকেটে হারিয়েছিল মুনলাইট বয়েজ ক্লাব? কবে মারা গিয়েছিলেন নেহরু অথবা আমার বন্ধু দেবাশীষের বাবা শুভাশীষ কাকু? তার থেকেও বড় কথা জসীমউদ্দীন কী বলেছিলেন, আমাদের স্কুলের অনুষ্ঠানে, সেই ১৯৬১ সালের এক শীতের সকালে? তিনি বলেছিলেন যদি জানতে চান, ‘যারা গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল উপাখ্যানকে গ্রাম্য বলে তাচ্ছিল্য করে, তারা নিজেদের শিকড়েই কোপ মারে।’ তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, শিকড় ছাড়া কি গাছ বাঁচে? আমরা বলেছিলাম, না, বাঁচে না। এই উদ্ধৃতি অবশ্য বাংলায় লিখে রেখেছিলাম। ইংরেজিতে তা কুলানোর কথা নয়।
গ্রামীণ ও গ্রাম্য—এ দুই শব্দের মধ্যে যে অর্থগত পার্থক্য, তা শিখেছিলাম জসীমউদ্দীনের বক্তৃতা শুনে। ডায়েরিতে তা লিখে না রাখলে কবেই ভুলে যেতাম। তাতে নিশ্চয় অনেক সমস্যা হতো।
সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের বিবরণটাও পাই ডায়েরি থেকে। ১৯৬৭ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি সিলেটে এসেছিলেন, আমাদের বাসায়। আমার মা ছিলেন তাঁর বড় ভাগনি। বস্তুত মা তাঁর সব কাজিনের মধ্যে ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ। আমার নানি সৈয়দা হাবিবুন্নেসা (১৯০৭-১৯৫৪), যিনি নিজেও কবি ছিলেন এবং বাংলা একাডেমি তাঁর একটি কবিতা-সংকলনও প্রকাশ করেছিল, ছিলেন মুজতবা আলীর অনুজা। দুজনে বয়সে খুব কাছাকাছি ছিলেন। নানির অকালপ্রয়াণে ব্যথিত ছিলেন মুজতবা আলী। মায়ের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তার বেশির ভাগ ছিল নানিকে নিয়ে।
১৭ এপ্রিল ছিল সোমবার, বাবা সিলেটে ছিলেন ছুটিতে। মা ছুটি নিয়েছিলেন তাঁর স্কুল থেকে। মুজতবা আলী উন্নত খাদ্যের সমঝদার ছিলেন, মা সারা দুপুর তাঁর সেই তুলনাহীন রান্না করেছিলেন মামার জন্য। আমার ওপর ভার পড়েছিল মুজতবা আলীর আরেক ভাগনি তুলি খানমকে সন্ধ্যার আগে নিয়ে আসার। তুলি খালা খুব স্নিগ্ধ রুচির মানুষ ছিলেন। কবিতা লিখতেন। তাঁর ছিল গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ সাহিত্যের এক বিশাল সংগ্রহ এবং বই ধার দিতে তিনি কার্পণ্য করতেন না, মুজতবা আলীর বিপরীত-উপদেশ সত্ত্বেও। তিনিও অকালে প্রয়াত হলেন। তাঁর সঙ্গে মুজতবা আলীর আলোচনা হয়েছে সাহিত্য নিয়ে, বাবার সঙ্গে খোজাদের নিয়ে তাঁর গবেষণা অভিসন্দর্ভ নিয়ে, মায়ের সঙ্গে পরিবার, রান্না ও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে—রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখার স্মৃতি নিয়ে।
তাঁর কোনো ডায়েরিতে সেই প্রথম দেখার স্মৃতি লেখা থাকলে যদি তা পড়া যেত! আমার সঙ্গে পড়াশোনা নিয়ে দু-একটা কথা বলেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, যিনি খুশি হতেন তাঁকে ‘হুরু নানা’ বলে ডাকলে। সে সম্বোধনেই তাঁর অসংখ্য নাতি-নাতনি তাঁকে ডাকত। সেদিনের নানা ঘটনা আমি অবশ্য ডায়েরিতে বাংলাতেই লিখে রেখেছিলাম। ইংরেজিতে পেরে ওঠা সম্ভব ছিল না। হুরু নানা একসময় জিজ্ঞেস করলেন, কী বই পড়ছি। ঘটমান বর্তমান! কলেজে তখন পরীক্ষা চলছে, কাজেই পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো বই পড়া সম্ভব ছিল না। নানা নাখোশ হয়েছিলেন।
আমার সঙ্গে আলোচনার সেখানেই ইতি।
এরপর দেখা হয়েছিল স্বাধীনতার পর, যখন তিনি ঢাকা এলেন এবং উঠলেন ধানমন্ডিতে তাঁর এক নম্বর সড়কের বাড়িতে। দোতলা হলুদ বাড়ি, ছাদটা খোলামেলা। পেছনে পিলখানার সবুজ বিস্তার। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, ডায়েরি লেখার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত। তাঁকে একদিন দেখতে গেলে বললেন তাঁর খাদ্যসংকট চলছে। তাঁর স্ত্রী, আমাদের নানি, স্বাস্থ্যের কথা ভেবে তাঁর খাদ্য রেশন করেছেন। কাজেই আমি যদি আন্তরিক হই, সেই সংকট নিরসন হয়। পুরান ঢাকায় উত্কৃষ্ট কাবাব হয়, বাকরখানি হয়, যদি তা সংগ্রহ করতে পারি। আমার একটা সাইকেল ছিল। সাইকেলে চেপে দু-একবার সাত রওজার হাকিমের সুতি কাবাব আর নাজিমুদ্দিন রোডের বিখ্যাত বাকরখানি নিয়ে নানার কাছে হাজির হয়েছি। তিনি ইশারায় আমাকে আড়ালে যেতে বলতেন। আমি এবং আমার মামাতো-খালাতো দু-এক ভাই তাঁর আড়ালে বসে সেই নিষিদ্ধ খাদ্য-ভক্ষণ দেখেছি। তিনি বলতেন, এই কাজটি মানুষের সবচেয়ে মৌলিক কাজ। পৃথিবীতে আসার কত আগে মানুষ নিষিদ্ধ খাদ্য খেয়েছে! অতএব এতে বাধা দেওয়া অবান্তর। অবশ্য কথাটা নানির শোনার-দূরত্বের বাইরে বসে বলতেন।
খাওয়া শেষে তিনি প্রফুল্ল মনে গল্প করতেন। উদরের মধ্য দিয়ে যে মানুষের অন্তরে পৌঁছানো যায়, তিনি ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
সৈয়দ মুজতবা আলী ইউরোপীয় সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক ছিলেন। তিনি আমাদের গ্যেটে পড়তে বলতেন। নিৎসের দর্শন তাঁকে প্রভাবিত করেছে বলে জানিয়েছিলেন। তবে তাঁর লেখার যে হাসিখুশি ভাবটা, সেটি তিনি জার্মানদের মধ্যে দেখতে পাননি, ফরাসিদের মধ্যে দেখেছিলেন, আর বেশি দেখেছিলেন ইংরেজদের মধ্যে, সেটাও বলতেন।
ইংরেজি সাহিত্যে যত ‘উইট’ এবং ‘হিউমার’ আছে, তত ইউরোপীয় অন্য কোনো সাহিত্যে নেই—এ ছিল তাঁর সুচিন্তিত মন্তব্য। ‘উইট’ শব্দের বাংলা কোনো প্রতিশব্দ নেই। অন্তত একক কোনো শব্দ। আমি বলেছিলাম, মাথা দিয়ে হাসা। তিনি বলেছিলেন, চলবে, তবে একক একটা শব্দ পাওয়া যায় কি না, তিনি ভেবে দেখবেন। যাঁরা বাংলা সাহিত্যে এই মাথা দিয়ে হাসার ব্যাপারটা অনুপস্থিত দেখে হতাশা প্রকাশ করেন, তাঁদের তিনি পরামর্শ দিতেন, লোকজ উৎস সেসব হাসি আর কৌতুকের গল্প আছে, সেসব জানতে, সংগ্রহ করতে। ওই রসবোধ জীবনে চর্চা করতে। ঢাকার কুট্টি সম্প্রদায় ‘উইট’ ব্যবহারে পারদর্শী ছিল এবং তাদের উদাহরণ তিনি অনেকবার টেনেছেন। কিন্তু সহজ-সরল গ্রামীণ জীবনেও (আবার সেই গ্রামীণ!) এর অভাব নেই। তিনি একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন একবার, সেটি লিখে না রাখলেও মনে আছে, বিশেষ করে শওকত ওসমানের কাছে এর একটি ভিন্ন ভার্সন কয়েকবার শোনার ফলে। একটি ছোট্ট গল্প, গ্রামের এক চাষির গরু ঢুকে পড়েছে এক মন্দিরের সীমানায়। ঢুকে গোকর্ম করেছে অর্থাৎ গোবর ছড়িয়েছে এখানে–সেখানে। এক পুরোহিত রেগে বেঁধে রেখেছেন গরুটাকে। চাষি গরু নিতে এসে পড়ল তোপের মুখে। সে ক্ষমা চাইল, আর সান্ত্বনা দিল পুরোহিত মশাইকে। ‘অবুঝ প্রাণী তো, ঢুকে পড়েছে। কী আর করা। আমাকে কোনো দিন ঢুকতে দেখেছেন?’
এই গল্পটি বহু পুরোনো। কিন্তু মুজতবা আলী বলেছিলেন, এটি বলার মতো পরিবেশ ক্রমাগত হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় কোনো চাষির এ রকম মন্তব্য করা তো দূরের কথা, চাষির এই গল্প বলাটাও সহজ হবে না। কী যে ঠিক কথা বলেছিলেন তিনি।
২.
সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমি দেখেছি সামান্যই, আলাপও হয়েছে তাঁর সঙ্গে সামান্যই। তবু তাঁর সম্পর্কে কতগুলো পর্যবেক্ষণ ছিল আমার, কতগুলো সিদ্ধান্তে আমি পৌঁছাতে পেরেছিলাম।
প্রথমত, তাঁর পড়াশোনাটা ছিল বিশাল, এই পড়াশোনার ঐতিহ্য অবশ্য তাঁর পরিবারেই ছিল—তাঁর দুই অগ্রজ, সৈয়দ মুস্তাফা আলী ও সৈয়দ মুর্তজা আলী, পড়াশোনাকে একটা অভ্যাসেই পরিণত করেছিলেন। তাঁর বোনরা? সবাই ছিলেন পাঠক। শান্তিনিকেতনে তাঁর পড়াশোনার স্পৃহাটা বিকাশের একটা অনুকূল পরিবেশ পায়। তাঁর লেখালেখির তালিকা দেখলে বোঝা যায়, এই পড়াশোনার ব্যাপ্তি কী ছিল: নন্দলাল বসুর দেয়াল-ছবি থেকে নিয়ে আঁদ্রে জিদ, পুলিন বিহারী থেকে নিয়ে সক্রেটিস, কবি আবদুর রাজ্জাক থেকে নিয়ে মপাসাঁ—অসংখ্য বিষয় ছিল তাঁর পঠন ও পর্যবেক্ষণের। ভাষাও জানতেন অনেকগুলো। তবে তাঁর প্রিয় ভাষা ছিল—না ফরাসি নয়, ল্যাটিন নয়, জার্মান নয়, ছিল সিলেটি। বলতেন, শান্তিনিকেতন গেলে সিলেটি ভাষাটি তিনি তোরঙ্গে ভরে রাখতেন। সে জন্য ন্যাপথলিনের একটা গন্ধ লেগে থাকত তাঁর সিলেটি ভাষায়। যদি ক্ল্যাসিক্যাল সিলেটি বলে কোনো ভাষা থাকে, তিনি তাই বলতেন। আমাদের সঙ্গে যখন সিলেটিতে কথা বলতেন এবং আমরাও বলতাম, তাতে অকারণ ‘শুদ্ধ বাংলা’ শব্দ ঢোকালে বিরক্ত হতেন, যেমন হতেন বাংলা ভাষায় আবার ইংরেজি শব্দ ঢোকালে। সে জন্য তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা বেশ বিপজ্জনক ছিল। ভাষার শুদ্ধতা তাঁর কাছে ছিল মনের শুদ্ধতার শামিল।
তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্যকে তিনি কাঁধে বা আস্তিনে বয়ে নিয়ে বেড়াতেন না, বস্তুত তিনি যে বহুভাষাবিদ একজন মৌলিক চিন্তাবিদ ও লেখক, এ রকম উল্লেখও তাঁকে বিব্রত করত। তাঁকে আমার আপনভোলা মানুষ মনে হতো এবং খুব হাসিখুশি বাইরেটার আড়ালে আত্মমগ্ন একজন মানুষ। আমার এ রকম একটি ধারণা হয়েছিল, তিনি নিজের মনে অনেক ধ্যান করতেন এবং তাঁর ধ্যানের বিষয়বস্তু ছিল জগৎ, ক্ল্যাসিক সাহিত্য আর জগতের সঙ্গে এই সাহিত্য এবং জগৎ ও সাহিত্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। কথা বলতে বলতে তিনি অনেক সময় হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলাতেন এবং বদলে এ রকম একটা-দুটো বিষয়ের অবতারণা করতেন। একদিন শ্রীনিকেতনের কৃষিবিপ্লব নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলেন এক দর্শনার্থী। সেই সময়ে বিখ্যাত ব্যাংকার ছিলেন ওই দর্শনার্থী, কৃষি ব্যাংকিং বিষয়টি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শ্রীনিকেতন সম্পর্কে সৈয়দ মুজতবা আলী খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন, যদিও তত দিনে রবীন্দ্রনাথের আদর্শের অনেকটাই প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োগ করতে পারেনি। কথার মাঝখানে শ্রীনিকেতন নিয়ে উচ্ছ্বাসটা বজায় রেখেই হঠাৎ হেনরিখ হাইনের ডুয়োনো এলিজিটি আমার কাছে আছে কি না, তা জানতে চাইলেন। আমি সবেমাত্র গিয়েছি, চলে যে আসব তা–ও নয়। নেই শুনে হতাশ হলেন; জোগাড় করে দিতে পারব শুনে আনন্দিত হলেন। আমার মনে হলো, শ্রীনিকেতন নয়, সারা সকাল তাঁকে হাইনেই অধিকার করে রেখেছিলেন।
বিনয়ী মানুষ ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, যেমন বিনয়ী ছিলেন তাঁর আরেক কৃতী ভাগনে এস এম আলী, সাংবাদিক, শেষ জীবনে যিনি ডেইলি স্টার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিজেদের কৃতী নিয়ে কোনো কথা, কোনো মন্তব্য কোনো দিন তাঁদের করতে শুনিনি। অন্যের কৃতীর প্রশংসা করেছেন উচ্চকণ্ঠে। কলকাতার কবি-সাহিত্যিক বন্ধুদের সম্পর্কে অনেক বলতেন মুজতবা আলী। আবু সয়ীদ আইয়ুবের পাণ্ডিত্যের এবং লেখার তারিফ করতেন; সমরেশ বসু বা শঙ্কর অথবা সাগরময় ঘোষ, দেশ পত্রিকার বিখ্যাত সেই সম্পাদকের উল্লেখ করতেন দু-এক ছত্র প্রশংসাসহ। তিনি বলতেন, শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর প্রিয় রম্যলেখক। অন্যের প্রশংসায় উদারতা দেখাতে তিনি কার্পণ্য করতেন না, অন্তত আমাদের কাছে। সমবয়সীদের কাছে এঁদের নিয়ে তিনি কী মন্তব্য করতেন, তা অবশ্য আমাদের জানার সুযোগ ছিল না। সমবয়সীদের কেউ তেমন এসব নিয়ে লিখেছেন, তেমনটি চোখে পড়ে না। কলকাতায় সৈয়দ মুজতবা আলীকে বরং বেশ অবহেলিতই মনে হয়েছে। দু-এক জায়গায় কিছু উন্নাসিক মন্তব্যও পড়েছি। আলী ভালো রম্যলেখক—এ রকম বর্ণনায় একটা উন্নাসিকতাই ফুটে ওঠে। যেন রম্যলেখাটা একটা অ-প্রথম শ্রেণির কাজ। তা ছাড়া আরও বিরক্তিকর যা, শুধু রম্যলেখায় সৈয়দ মুজতবা আলীকে বেঁধে ফেললে তাঁর অসাধারণ কিছু ছোটগল্প এবং অন্তত দুটি উপন্যাসকে অস্বীকার করা হয়। যেগুলো ছোটগল্প এবং উপন্যাস হিসেবে বাংলা সাহিত্যে চিরদিনের জন্য ঠাঁই পেয়ে যাবে। সে কথায় পরে আসছি। তা ছাড়া এই জনরা-ভাঙ্গার দিনে, এই ক্রস-ওভার অভিজ্ঞতার দিনে ভ্রমণকাহিনি বা রম্যরচনাকে কম নম্বর দিতে বসাটাও কোনো কাজের কথা নয়।
সৈয়দ মুজতবা আলী যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন, তা ছিল প্রকৃত অর্থেই সর্বভারতীয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ কবিতাটি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। আমি দু বার তাঁর অটোগ্রাফ পেয়েছিলাম। ১৯৬৭ সালের সেই বিখ্যাত ভ্রমণের সময় আমার খাতায় তিনি চার লাইন লিখে দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ থেকে, ‘সেই ভালো, সেই ভালো/আমারে না হয় না জানো...’ ইত্যাদি এবং সেই ’৭২-৭৩-এ, হাইনের ডুয়েনো এলিজি জোগাড় করে দেওয়ায় খুশি হয়ে তাঁর শবনম উপন্যাসটির প্রথম পাতায় ‘ভারততীর্থ’ থেকে দু লাইন; ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে...’ ইত্যাদি। প্রথম অটোগ্রাফটি আমি চেয়ে নিয়েছিলাম, দ্বিতীয়টি অযাচিতভাবে পেয়েছিলাম। আমার মামাতো-খালাতো ভাইবোনদের কারো কারো সংগ্রহে তাঁর এরকম অটোগ্রাফ রয়েছে, তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা। (তাঁর হাতের লেখাও ছিল রাবীন্দ্রিক ছাঁচের, এতই প্রভাব ছিল ঠাকুরের, তাঁর ওপর।) এসব অটোগ্রাফে তিনি যেসব কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিতেন, সেগুলো নিয়ে একটু ভাবলে তাঁর চিন্তার দু-একটা সূত্র হয়তো পাওয়া যায়, অন্তত আমাকে যে দুই কবিতার কয়েক পঙিক্ত লিখে দিয়েছিলেন সেগুলো থেকে। বলা বাহুল্য, শবনম বইটি উধাও হয়ে গেছে এবং ১৯৬৭ সালের সেই অটোগ্রাফযুক্ত খাতাটাও। আফসোস! কিন্তু চিন্তার সূত্রগুলো আছে এবং সেগুলো এই : তাঁর সর্বভারতীয় ভাবাদর্শে এই ‘মিলাবার’ ও ‘মিলিবার’ আহ্বানটি গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় উন্মাদনা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, সামাজিক হানাহানি, সামঙ্রদায়িক হিংসা-প্রতিহিংসাকে শুধু মানবতার শত্রু নয়, এই উপমহাদেশের দেশগুলোর অস্তিত্বের জন্য সংকট হিসেবেও চিহ্নিত করেছিলেন। দুঃখের বিষয়, এগুলো এখন যেরকম তাঁর সময়েও ছিল, এই ভারত ভূখণ্ডের নিত্যদিনের সমস্যা। এখন অবশ্যই এদের তীব্রতা এবং ব্যাপ্তি অনেক বেড়েছে। মাত্রাটা হয়েছে ভয়াবহ। কিন্তু ছেচলি–শ-সাতচলি–শের অথবা ১৯৬৪-এর সামঙ্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনাগুলো খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। তবে আপনভোলা হলেও, জ্ঞানতত্ত্বে দৃঢ়বিশ্বাস থাকলেও (যার ফলে উমবার্তো একোর মতো তাঁর একটা বিশ্বাস জন্মেছিল, জ্ঞানই মুক্তি দেবে মানুষকে), তিনি জানতেন, অন্তত তাঁর সামাজিক সত্তাটি জানত, পরিস্থিতির অচিরেই কোনো উন্নতি হবে, তেমন সম্ভাবনা নেই। সেই ১৯৪৮ সালে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামে ভবিষ্য-ভাষী একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, এবং এই লেখা ও অন্যান্য লেখালেখি (সেই সঙ্গে তাঁর সেক্যুলার জীবনদর্শন)-এর জন্য পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়ে দীর্ঘদিন নির্বাসনে ছিলেন। এই নির্বাচন তাঁকে বাস্তবের ইট-বালি-সুরকির সঙ্গে একটা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তারপরও তিনি মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন না। যারা বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর প্রচুর লেখার কয়েকটিও পড়েছেন, তারা জানেন, এই দেশটা নিয়ে তাঁর আশাবাদ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে হতাশ করেছে। তারপরও তিনি এ দেশের শিল্প-সাহিত্য ও দেশের সাধারণ মানুষের সংগ্রামী প্রত্যয় (প্রতিদিনের জীবনযাপনে যে সংগ্রাম; বৃহত্তর অর্থে মুক্তির জন্য সংগ্রাম না হলেও) তাঁকে আশাবাদী করত। ভূগোলের, বিশেষ করে কুটিল রাজনৈতিক ভূগোলের আঙিনায় মানুষ মিলতে এবং মেলাতে না পারলেও জ্ঞানের, শিক্ষার, সাহিত্যের পরিচ্ছন্ন জীবনবোধের আঙিনায় তা যে সম্ভব, সেই বিশ্বাস তাঁর ছিল।
১৯৬৭ সালে তিনি যে ‘আমারে না হয় না জানো’ লিখে দিয়েছিলেন আমার খাতায়, তা কিন্তু ‘অটোগ্রাফ দিতে হবে, তাই দু ছত্র লেখা’।-এরকম প্রতিক্রিয়া থেকে দেননি। ভেবেচিন্তে, সময় নিয়ে লিখেছিলেন। এর চার পঙিক্ত তিনি আমাকে মনে রেখেও লেখেননি। তাঁকে তো পারিবারিকভাবে সবাই জানত। লেখক হিসেবেও। কিন্তু না জানার বিষয়টি নিয়ে ভাবলে পরিষ্কার হবে তিনি এসব পরিচয়কে বড় করে দেখেননি, দেখেছেন তাঁর নিজের একান্ত সত্তাটিকে। একজন আরেকজনকে কীভাবে জানে? তার বাইরের পরিচয়গুলো ডিঙিয়ে যদি তার অন্তঃপুরে প্রবেশ না করে? এই জানাটা যদি অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তাহলে পরসঙ্র যে মিলবে আর মেলাবে, সেটা হবে কীভাবে? রবীন্দ্রনাথের যে চার পঙক্তি নিয়ে এত কথা, তার নিশ্চয় একটা প্রেক্ষাপট আছে, অর্থ আছে। হয়তো যে ব্যাখ্যা আমি দিচ্ছি, সৈয়দ মুজতবা আলীর চিন্তার সূত্র ধরে, তাতে অতিপঠন থাকতে পারে। কিন্তু এই বিপদ মেনেও বলা যায়, পঙিক্তগুলো তাঁর চিন্তার সূত্রটি সত্যিই প্রকাশ করে। মুজতবা আলীর কত লেখায় জানা এবং অজানার ব্যাপারটা শিরোনাম হয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা হয়ে এসেছে, ভেবে দেখুন। আমার মনে হয়েছে, দীর্ঘ একাকী বাস তাঁকে নিজের কাছে বারবার হাজির করেছে, তিনি নিজের সঙ্গে অনেক কথা বলেছেন। বস্তুত তিনি এক মনা পাগলার গল্প বলতেন, ছোটবেলায়, তার মৌলভীবাজারে দেখা। মনা পাগলা হাঁটত, আর বিড়বিড় করে কথা বলত নিজের সঙ্গে। এটিও একটি ইঙ্গিত তাঁর আত্ম-অবলোকন, আত্ম-পঠনের।
সৈয়দ মুজতবা আলী লঘু এবং গুরুর ফাঁকটা ভরাট করতে চেয়েছিলেন। এ কাজটি উত্তরাধুনিক সাহিত্য করছে। কিন্তু আলী করেছেন তাঁর ক্লাসিক চিন্তা থেকেই। লঘুত্ব সবসময় পরিহাস নয়, সবসময় ঠাট্টা বা কৌতুক নয়, অথবা হালকাচাল নয়। লঘুত্ব একটি জীবনদর্শন হতে পারে, একটি সাহিত্যভাবনা হতে পারে। এই লঘুত্ব অস্তিত্বের হাঁফ ছাড়ার মতো। যখন জীবনের দুঃসহ ভার জীবনকেই মিটিয়ে ফেলতে চায়, একটা সংকটে ফেলে দেয় অপ্রস্তুত সত্তাটিকে এবং প্রচলিত পথে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথটা পাওয়া যায় না, তখন লঘুত্ব একটা খোলা জানলা দিয়ে আসা হাওয়ার মতো হতে পারে। হয়তো আরো দু-এক যে তুলনা দেব, সেগুলো মিলবে না, কিন্তু আমার জ্ঞানের মধ্যে দুটি মাত্র তুলনা থাকায় তা দেওয়াটা, অন্তত এ মুহূর্তে, সম্মতি পেতে পারে : তার একটি মিলান কুন্ডেরার সেই অস্তিত্বের অসহনীয় লঘুত্বের বিষয়টি। ‘অসহনীয় লঘুত্ব’-ইংরেজিতে একে বলে অক্সিমরোন। দুই বিপরীতের একাসন গ্রহণ। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্প যখন হাসতে হাসতে কাঁদায় পাঠককে, তখন কী হয়? এই কথাটি, মুজতবা আলীর এই হাসতে হাসতে কাঁদানোর ব্যাপারটি আরেক সৈয়দের, যিনি নিজেও বড় গল্পকার-আবদুল মান্নান সৈয়দ। দ্বিতীয় তুলনাটি চিলির লেখক, সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রায় সমবয়সী এবং সমান-জীবনযাপনকারী, মানুয়েল রোহাস (১৮৯৬-১৯৭৩)-এর একটি গল্প। রোহাসের প্রিয় একটি চরিত্র ছিল পথের মানুষ, পিকারো। এই পিকারো ছিল নিসঙ্গ এবং তার পরিভ্রমণ ছিল মুক্তি এবং পরিপূর্ণতার উদ্দেশ্যে। একটি গল্পে এরকম এক পিকারো পুলিশের হাতে পড়েছে, পুলিশ তাকে বসিয়ে রেখেছে থানায়, কী চার্জ দেওয়া যায়, ভাবছে পুলিশ। লোকটি থানায় বসে বসে দেখে, বাইরে একটি লোক কথা বলছে এক মহিলার সঙ্গে। একটি কুকুর এসে হঠাত্ তাড়া করল লোকটাকে। কামড়ে ধরল তার ট্রাউজার। সেটি খুলে গেল, এমনি সেই কামড়। লোকটা ট্রাউজার হারিয়ে কোনোরকমে লজ্জা ঢেকে দিল দৌড়। এই দৃশ্য দেখে পিকারোর সে কী হাসি, তার হাসি আর থামে না। পুলিশ প্রথমে বিরক্ত। তারপর তারাও হাসে, হাসি যেহেতু সংক্রামক। সারা থানা হাসতে থাকল, হাসতে শুরু করল বাইরের মানুষজনও, যারা উঠানে জড়ো হয়েছে নানা কাজে।
রোহাস গল্পটা এখানেই শেষ করেছেন, কাজেই আমাদের জানা হলো না পিকারোর কী হলো। কুকুরটাইবা কার ছিল। পুলিশ কী করবে এরপর। কিন্তু আমাদের জানার প্রয়োজনও নেই। কারণ পিকারোর হাসি একটা বিরাট সিস্টেমের ভিতরে ঢুকে যে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, একটা গুরুভার পাথরকে টলিয়ে দিল, তাই তো যথেষ্ট। সৈয়দ মুজতবা আলী এই কাজটি করেন। তাঁর উইট এবং হাস্যকৌতুকের কাজ আসলে অনেক। এক তো পাঠককে বিমলানন্দ দেওয়া। শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পগুলো যে আনন্দ দিত/দেয় আমাদের। দ্বিতীয় কাজ, সেই ওস্কার ওয়াইল্ড বা বার্নার্ড শ’র মতো জীবনের, চিন্তার, মানুষের সামাজিক আদান-প্রদানের ভেতরের একশ রকমের অসঙ্গতিকে তুলে ধরা। তবে এখানে পাঠক শুধু হেসেই ক্ষান্ত হবে না, সে ভাববে। অসঙ্গতিগুলোর মূলে পৌঁছে যাবে। আর তৃতীয়, অস্তিত্বের অসহনীয় লঘুত্বের সন্ধান দেওয়া। এ কাজটি অবশ্য তিনি করেন একটা উেপ্রক্ষীয় নিম্নতলে, দর্শনের একটা আড়ালে থাকা অঞ্চলে। তবে একটু সচেতনভাবে পড়লে তার ‘রম্যরচনার’ ভেতর তার সন্ধান পাওয়া যাবে।
৩.
সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পগুলো, তাঁর উপন্যাসগুলো পড়লে বোঝা যাবে, তিনি ‘হাস্যরস’ এবং ‘হাস্যকৌতুক’ যদি একান্ত না-ই ব্যবহার করতেন, তাতে তাঁর স্টাইলটা পাল্টাতো নিশ্চয়, গল্প-উপন্যাসের চরিত্রটাও বদলে যেত, কিন্তু তিনি একজন বড় লেখক হিসেবেই থেকে যেতেন। তার গল্প-উপন্যাসের কাঠামো, তাদের গল্প-রেখা, তাদের হয়ে ওঠা, তাদের ভেতরের জীবন, তাদের ভাষা-সবই সেই সাক্ষ্য দেয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>