বিজ্ঞাপন
নেত্রকোনায় দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হচ্ছে না বিস্কুট
বনরুটিতে ফাঙ্গাস, ডিম-কলাও থাকছে পচা
তদারকির অভাবে অনিয়ম বেড়েছে
নেত্রকোনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে নিম্নমানের খাবার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জেলার দুর্গম হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন উপজেলার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। কোথাও কোথাও পচা ডিম, কলা ও বনরুটি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের বিস্কুট, ডিম, কলা, দুধসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও নিয়মিতভাবে সব খাবার দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে বিস্কুট দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।
‘নির্দেশনা অনুযায়ী, বনরুটি তাজা, নরম ও সঠিকভাবে মোড়কজাত করা হয়েছে কি-না, তা পরীক্ষা করতে হবে। প্যাকেট অক্ষত থাকতে হবে এবং তাতে পচন, ফাঙ্গাস বা দুর্গন্ধ থাকা যাবে না। প্যাকেটের গায়ে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ১২০ গ্রাম নেট ওজন উল্লেখ আছে কি-না, সেটিও যাচাই করতে হবে’
খাদ্যের মান ও বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি স্থানীয় শিক্ষক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন। তবে অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর তদারকি বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
সূত্র বলছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ফিডিং প্রকল্পের খাবার সরবরাহের আগে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। নিম্নমানের, পচা বা ত্রুটিপূর্ণ খাবার কোনো অবস্থাতেই গ্রহণ ও বিতরণ না করার জন্য বলা হয়েছে।
দুর্গম হাওরাঞ্চলের বানোয়ারি জুয়েল চৌধুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রানিচাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মেন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ১৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পচা বনরুটি, পচা ডিম এবং আকারে ছোট ও পচা কলা বিতরণ করা হচ্ছে। অবহেলা বা অনিয়মের কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে প্রধান শিক্ষকরা এসব মানহীন খাবার গ্রহণ করছেন।
‘ডিমের ক্ষেত্রে ফাটল, দুর্গন্ধ বা পিচ্ছিল ভাব থাকা যাবে না। কলা হতে হবে দাগ ও পোকামাকড়মুক্ত। বেশি পাকা বা পচা কলা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা যাবে না। ইউএইচটি মিল্ক ও ফর্টিফাইড বিস্কুটের প্যাকেট অক্ষত আছে কি-না, তা দেখার পাশাপাশি উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নেট ওজনও যাচাই করতে হবে’
নির্দেশনা অনুযায়ী, বনরুটি তাজা, নরম ও সঠিকভাবে মোড়কজাত করা হয়েছে কি-না, তা পরীক্ষা করতে হবে। প্যাকেট অক্ষত থাকতে হবে এবং তাতে পচন, ফাঙ্গাস বা দুর্গন্ধ থাকা যাবে না। প্যাকেটের গায়ে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ১২০ গ্রাম নেট ওজন উল্লেখ আছে কি-না, সেটিও যাচাই করতে হবে।
আরও পড়ুন
মাগুরায় স্কুল ফিডিংয়ের বনরুটিতে আস্ত ব্লেড, সমালোচনার ঝড়
ডিমের ক্ষেত্রে ফাটল, দুর্গন্ধ বা পিচ্ছিল ভাব থাকা যাবে না। কলা হতে হবে দাগ ও পোকামাকড়মুক্ত। বেশি পাকা বা পচা কলা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা যাবে না। ইউএইচটি মিল্ক ও ফর্টিফাইড বিস্কুটের প্যাকেট অক্ষত আছে কি-না, তা দেখার পাশাপাশি উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নেট ওজনও যাচাই করতে হবে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে খাবার গ্রহণের আগেই সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে খাবারের মান যাচাই করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও ঝরে পড়া রোধে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রধান শিক্ষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
আরও পড়ুন
মিড ডে মিলের খাবার নিম্নমানের হলে ফেরত দিন: ববি হাজ্জাজ
হাওরাঞ্চলে বেশি সংকট
জেলার দুর্গম হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট আরও বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবকরা। তাদের ভাষ্য, অনেক সময় নির্ধারিত খাবারের পরিবর্তে অন্য খাবার দেওয়া হচ্ছে অথবা নির্দিষ্ট দিনে খাবার দেওয়া হচ্ছে না।
খালিয়াজুরী উপজেলার একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিস্কুট নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে না। অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বিতরণেও অনিয়ম রয়েছে। নিম্নমানের বা পচা খাবার দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা তা খেতে চায় না। এতে একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
আরও পড়ুন
স্কুল ফিডিংয়ের পাউরুটি-ডিম খেয়ে হাসপাতালে ৯ শিক্ষার্থী
খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রধান শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়ার পরও কেন অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। তাদের দাবি, নিয়মিত তদারকি করা হলে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের সুযোগ থাকতো না।
নীতিমালা থাকলেও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়া রোধে দেশের ১৫০টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের মানসম্মত খাবার সরবরাহ, স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি কমিটি গঠন এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে।
আরও পড়ুন
আগামী বছর সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিডডে মিল: প্রতিমন্ত্রী
তবে নেত্রকোনায় এসব নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খাবার দেওয়ার পর তা ঠিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে না। ফলে নিম্নমানের খাবার বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে নানা নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নেই। নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে সরকারের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
আরও পড়ুন
প্রাথমিকের ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী টিফিনে পাবে দুধ-ডিম-রুটি-ফল
মেন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবক প্রিয়াংকা আক্তার ও রীতামনি আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘রুটিগুলো খাবার যোগ্য না। ফাঙ্গাসে আক্রান্ত। এগুলো ফেলে দিতে হয়। কলা, ডিমও নষ্ট থাকে। দুধ মাঝে মাঝে দেওয়া হয়। এসব খাবার খেয়ে শিশুরা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।’
একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিমাংশু সরকার বলেন, ‘বিস্কুট প্রথম সপ্তাহে দিয়ে পরে আর দিচ্ছে না। রুটি, কলা মানসম্মত না হলে আমরা রাখছি না। উপজেলার আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সভায় বিষয়টি বারবার বলেছি।’
আরও পড়ুন
তৃতীয় ধাপে বাড়ছে প্রাথমিকের ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্পের মেয়াদ
জানতে চাইলে খালিয়াজুরী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজিমেল কদর বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের খাদ্যসামগ্রী বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি তারা অবগত হয়েছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে।
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিদুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যসামগ্রী বিতরণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। দুর্গম হাওরাঞ্চলে নির্ধারিত তালিকার খাদ্যসামগ্রীর ধরন পরিবর্তন করা হলে এ ধরনের সংকট কিছুটা কমতে পারে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে কোনো অবস্থাতেই গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেএএইচ/এসআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন