বাংলাদেশে সবচেয়ে পরিচিত হ্রদ বা লেক সম্ভবত রাঙামাটির কাপ্তাই লেক। বিশাল এই জলাধার দূর থেকে দেখলে মনে হয় শুধুই পানির এক অসীম বিস্তৃতি। কাপ্তাই লেকের পানির প্রধান উৎস কর্ণফুলী নদী, যার গতিপথে বাঁধ দেওয়ার ফলেই এই হ্রদের জন্ম। এর বাইরেও কাসালং, মাইনী, চেংগী ও রিঙক্ষ্যং নদীর মতো বেশ কিছু পাহাড়ি নদী এবং ঝরনার পানি এসে জমা হয় এই লেকে।
তবে লেকের কাজ শুধু পানি জমিয়ে রাখা নয়। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, পৃথিবীর কার্বন চক্রেও লেকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো এলাকার নদী বা ঝরনার চলার পথে লেকের সংখ্যা ও আয়তন যত বাড়ে, সেই পথ থেকে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণও তত বাড়ে। অর্থাৎ, পানিপথ শুধু লেকে পানিই বয়ে নেয় না, এটি কার্বনের চলাচলের পথ বা কার্বন চক্রকেও বদলে দেয়।
কাপ্তাই লেক নিয়ে সম্প্রতি কিছু গবেষণার পাশাপাশি সুইডেনের উত্তরাঞ্চলের ৩২টি সংযুক্ত নদী-ঝরনা ও লেক নিয়েও একটি বড় গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।
পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় সুইডেনের উমিও ইউনিভার্সিটির ফ্রেডরিক আলরিকসন ও তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন, নদী ও ঝরনার পানি চলার পথে থাকা লেকের মোট পৃষ্ঠের আয়তন ১০ গুণ বাড়লে সেখান থেকে কার্বন নিঃসরণ প্রায় ১ দশমিক ৮ গুণ বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, নদী, ঝরনা আর লেককে আলাদা করে দেখলে কার্বনের পুরো হিসাব পাওয়া যাবে না; এগুলোকে একটি সংযুক্ত পানিপথ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
ফ্রেডরিক আলরিকসন ও তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন, নদী ও ঝরনার পানি চলার পথে থাকা লেকের মোট পৃষ্ঠের আয়তন ১০ গুণ বাড়লে সেখান থেকে কার্বন নিঃসরণ প্রায় ১ দশমিক ৮ গুণ বেড়ে যায়।
নদী ও ঝরনা তার আশপাশের মাটি থেকে কার্বন সংগ্রহ করে স্রোতের সঙ্গে নিচের দিকে বয়ে চলে। একসময় এই কার্বন বড় নদীতে গিয়ে পৌঁছায় এবং শেষ পর্যন্ত সমুদ্রেও মিশতে পারে। তবে কার্বনের সবটুকু এত দূর যায় না। পানিতে থাকা নানা রাসায়নিক ও জৈবিক প্রক্রিয়ায় কার্বনের একাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইডে পরিণত হয়, যা পরে পানি ছেড়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। কার্বনের কত অংশ পানির নিচে জমা হবে আর কত অংশ বায়ুমণ্ডলে যাবে, তা নির্ভর করে লেকে পানি কতক্ষণ আটকে থাকছে তার ওপর।
দ্রুতগতির নদী বা ঝরনায় পানি বেশি সময় আটকে থাকে না বলে কার্বন দ্রুত নিচের দিকে চলে যায়। কিন্তু লেকে পানির গতি ধীর হওয়ায় রাসায়নিক ও জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো কাজ করার জন্য বেশি সময় পায়। গবেষকেরা নদী, ঝরনা ও লেক মিলিয়ে পানিপথে পানির আটকে থাকার সময় হিসাব করেছেন, যাকে বলা হয় নেটওয়ার্ক রেসিডেন্স টাইম।

সুইডেনের ওই গবেষণা করা নদীগুলোতে দেখা গেছে, কোনো পানিপথে পানির অবস্থানের সময় ছিল মাত্র ৪২ মিনিট, আবার কোনো কোনো পথে তা আটকে ছিল ২৯ বছর! এই বিশাল পার্থক্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে লেক। নদী ও ঝরনার চলার পথে লেক যত বেশি এবং বড় হবে, পানির অবস্থানকালও তত বাড়বে।
পানিতে কার্বন যত বেশি সময় থাকে, অণুজীবগুলো দ্রবীভূত জৈব কার্বন ভাঙার জন্য তত বেশি সময় পায়। ফলে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়, যা পরে পানি থেকে বেরিয়ে বায়ুমণ্ডলে চলে যায়।
লেকে পানি আটকে থাকা কার্বন চক্রে কতটা প্রভাব রাখে, তা বুঝতে গবেষকেরা বছরের চারটি ভিন্ন সময়ে (বসন্ত, গ্রীষ্মের শুরু ও শেষ এবং শরৎ) ৩৬০টির বেশি নদী-ঝরনার অংশ এবং ৪২টি লেক থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। পানির পৃষ্ঠ থেকে বায়ুমণ্ডলে কতটা কার্বন ডাই-অক্সাইড যাচ্ছে এবং পানির সঙ্গে কতটা দ্রবীভূত কার্বন ভেতরের দিকে যাচ্ছে—দুটিই মাপা হয়।
প্রাপ্ত ফল বেশ চমকপ্রদ। দেখা গেছে, পানিপৃষ্ঠের আয়তন ১০ গুণ বেশি হলে পানির অবস্থানকাল বেড়ে যায় প্রায় ৩৫ গুণ! এর সঙ্গে কার্বন নিঃসরণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পানির নিচের দিকে বয়ে যাওয়া কার্বনের তুলনায় এসব জলাধার থেকে বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৮ গুণ বেশি। এর একটি বড় কারণ হলো অণুজীব। পানিতে কার্বন যত বেশি সময় থাকে, অণুজীবগুলো দ্রবীভূত জৈব কার্বন ভাঙার জন্য তত বেশি সময় পায়। ফলে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়, যা পরে পানি থেকে বেরিয়ে বায়ুমণ্ডলে চলে যায়। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন যে সব প্রক্রিয়া সরাসরি মাপা সম্ভব হয়নি, তাই ঠিক কতটুকু কার্বন অণুজীবের কারণে তৈরি হচ্ছে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
গবেষণায় দেখা গেছে, পানিপৃষ্ঠের আয়তন ১০ গুণ বেশি হলে পানির অবস্থানকাল বেড়ে যায় প্রায় ৩৫ গুণ! এর সঙ্গে কার্বন নিঃসরণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
বসন্ত ও শরতে কার্বন নিঃসরণের হার তুলনামূলক কম থাকলেও গ্রীষ্মে তা বেড়ে যায়। উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় নদী ও ঝরনায় পানির প্রবাহ কমে যায়, ফলে কার্বন পানিপথে বেশি সময় আটকে থাকে। এ ছাড়া তাপমাত্রা বেশি থাকায় পানিতে থাকা জৈব কার্বন পরিবর্তনের প্রক্রিয়াগুলোও বেশ দ্রুত হয়। খুব শুষ্ক এক গ্রীষ্মে লেক আছে এমন নদী-ঝরনার পথে একই ধরনের প্রভাব দেখা গেছে। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু একটি ধারায় মোট কতটুকু পানি আছে, সেটিই শেষ কথা নয়; বরং পানিগুলো নদী, ঝরনা ও লেকের মধ্যে কীভাবে ছড়িয়ে আছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কাপ্তাই লেকের তলানিতে জমা হওয়া জৈব কার্বনের পরিমাণ ২ দশমিক ২৩ থেকে ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা আশপাশের ভূমির ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
কাপ্তাই লেক এ ক্ষেত্রে একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে মূলত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে এই কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করা হয়। এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও পর্যটনের জন্য বিখ্যাত। এলসেভিয়ার জার্নালের ডেটাবেস সায়েন্স ডিরেক্ট-এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কাপ্তাই লেক নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কাপ্তাই লেকের পানিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ এবং তা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার হার বেশ উল্লেখযোগ্য। হ্রদটি আঞ্চলিক বায়ুমণ্ডলের জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি নিট উৎস হিসেবে কাজ করছে।

পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি অণুজীবের পচনযোগ্য জৈব পদার্থের উপস্থিতিও কার্বন তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। কাপ্তাই লেকের তলানিতে জমা হওয়া জৈব কার্বনের পরিমাণ ২ দশমিক ২৩ থেকে ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা আশপাশের ভূমির ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। এর অর্থ এই নয় যে নদীর চেয়ে লেক একাই বেশি কার্বন নিঃসরণ করছে। মোট হিসাবে নদী ও ঝরনাই বেশি কার্বন ছড়ায়। তবে নদী ও ঝরনার চলার পথে লেকের পরিমাণ বাড়লে হিসাবটা বদলে যায়। তখন কার্বন স্রোতের সঙ্গে ভেসে সমুদ্রের দিকে যাওয়ার বদলে, এর একটি বড় অংশ মিশে যায় বায়ুমণ্ডলে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>