একসময় মনে হয়েছিল, সিনেমা হলের দিন বুঝি শেষ। করোনা মহামারির সময় বিশ্বের প্রায় সব প্রেক্ষাগৃহই দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। দর্শকের অভ্যাস বদলে যায়, ঘরে বসেই নেটফ্লিক্স, ডিজনি প্লাস, অ্যামাজন প্রাইমসহ বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সিনেমা-সিরিজ দেখাই হয়ে ওঠে নতুন স্বাভাবিকতা। তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন, বড় পর্দার জাদু হয়তো আর আগের মতো ফিরবে না।
আরও পড়ুন
৩৬ জুলাইকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস’ বলে শুভেচ্ছা দিলেন তিশা
কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। ২০২৬ সালে এসে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের বক্স অফিস। একের পর এক বড় বাজেটের সিনেমা দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টেনে আনছে। সেইসঙ্গে ফিরছে সিনেমা হলের হারানো ব্যস্ততা।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’। টম হল্যান্ড ও জেনডায়া অভিনীত এই সিনেমা মুক্তির প্রথম তিন দিনেই বিশ্বব্যাপী টিকিট বিক্রির আয় ৯২৭ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। প্রথম সপ্তাহ শেষে এটি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়। যা প্রমাণ করে সুপারহিরো সিনেমার জনপ্রিয়তা এখনো অটুট।২০২২ সালে করোনা-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের সময়ই ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’ হলে দর্শক এনেছিলো
শুধু স্পাইডার-ম্যান নয়, ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ ছবিটিও বিশ্বজুড়ে দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। গ্রিক মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা মুক্তির পর থেকেই প্রশংসা ও বাণিজ্যিক সাফল্য- দুই দিকেই এগিয়ে চলছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সিনেমাটি খুব শিগগিরই এক বিলিয়ন ডলার আয়ের ক্লাবে জায়গা করে নেবে।
অ্যানিমেশনপ্রেমীদের জন্যও বছরটি দারুণ। ‘টয় স্টোরি ৫’ আবারও উডি ও বাজ লাইটইয়ারকে ফিরিয়ে এনে পুরোনো ও নতুন- দুই প্রজন্মের দর্শকের মন জয় করেছে। একইভাবে ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’ ভিডিও গেমের জনপ্রিয় চরিত্রকে বড় পর্দায় এনে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছে।
অন্যদিকে সংগীতভিত্তিক জীবনীচিত্র ‘মাইকেল’ও দর্শকদের আগ্রহের শীর্ষে। কিংবদন্তি পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনের জীবন নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এবং বক্স অফিসেও শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।২০২৩ সাল মাতিয়েছিলো ‘বার্বি’ ও ‘ওপেনহেইমার’
এছাড়া ২০২২ সালে করোনা-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের সময়ই ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’, ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’, ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড: ডমিনিয়ন’, ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’ ও ‘মিনিয়নস: দ্য রাইজ অব গ্রু’ বক্স অফিসে বড় সাফল্য এনে দেয়।
২০২৩ সালে ‘বার্বি’, ‘ওপেনহাইমার’ ছবি দুটি দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়েছে সিনেমা হলে। এছাড়াও ‘দ্য সুপার মারিও ব্রাদার্স মুভি’, ‘গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি ভলিউম ৩’, ‘স্পাইডার-ম্যান: অ্যাক্রস দ্য স্পাইডার-ভার্স’ ছবিগুলোও ছিলো ব্লকবাস্টার।
২০২৪ সালে ‘ইনসাইড আউট ২’, ‘ডেডপুল অ্যান্ড উলভারিন’, ‘মোয়ানা ২’, ‘ডেসপিকেবল মি ৪’, ‘ডিউন: পার্ট টু’ সিনেমাগুলো হলে দর্শকের ঢল নামিয়েছিলো।২০২৩ সালে জাদু দেখায় ‘গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি ভলিউম ৩’
২০২৫ সালে জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’ বিশ্বজুড়ে দর্শকদের আবারও প্রেক্ষাগৃহমুখী করে। ‘জুটোপিয়া ২’, ‘এ মাইনক্রাফট মুভি’, ‘লিলো অ্যান্ড স্টিচ’, ‘সুপারম্যান’, ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড: রিবার্থ’ ছবিগুলোও ছিলো বক্স অফিসে সফল।
আরও পড়ুন
‘বিরল প্রতিভা’ বললেন পূর্ণিমা, যে জবাব দিলেন ভাবনা
মজার বিষয় হলো, গেল কয়েক বছরের এই চিত্র প্রমাণ করছে শুধু বড় বাজেটের সিনেমাই নয়, তুলনামূলক কম বাজেটের ছবিও চমক দেখাতে পারে। শক্তিশালী গল্প, নতুন নির্মাণশৈলী ও দর্শকের ইতিবাচক মুখে মুখে প্রচারের কারণে স্বাধীন ধারার কয়েকটি সিনেমাও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি আয় করছে। এতে প্রমাণ হচ্ছে, ভালো গল্প থাকলে বাজেটই সব নয়।২০২৫ সালের শেষদিকে ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’ বিশ্বজুড়ে দর্শকদের আবারও প্রেক্ষাগৃহমুখী করে
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফেরার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, নির্মাতারা আবার বড় পর্দার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, উন্নত প্রযুক্তির আইম্যাক্স, ডলবি সিনেমা ও ফোর-ডিএক্সের মতো আধুনিক প্রদর্শন ব্যবস্থা দর্শকদের ঘরের বাইরে এসে সিনেমা দেখতে উৎসাহিত করছে। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে সিনেমা দেখার সামাজিক অভিজ্ঞতাও আবার গুরুত্ব পাচ্ছে।‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড : রিবার্থ’ ছবিটিও দর্শক টেনেছিলো
করোনা মহামারির সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের উত্থানে হয়তো প্রেক্ষাগৃহের দিন শেষ। কিন্তু গত কয়েক বছরের একের পর এক ব্লকবাস্টার সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’ থেকে ‘অ্যাভাটার’, ‘বার্বি’, ‘ওপেনহাইমার’, ‘ইনসাইড আউট ২’, ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ কিংবা ‘দ্য ওডিসি’ ছবিগুলো প্রমাণ করছে বড় পর্দার জাদু এখনো অমলিন। সঠিক গল্প, আধুনিক প্রযুক্তি ও দর্শকের আবেগ একসঙ্গে মিললে সিনেমা হলই আবার হয়ে ওঠে বিনোদনের সবচেয়ে বড় ঠিকানা।
এলআইএ