রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি ফলাফলে এবারও সবার ওপরে বগুড়া। পাসের হার, জিপিএ-৫ এবং শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় বোর্ডের অন্য সাত জেলার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে জেলা। বোর্ডে ৭০ শতাংশের বেশি পাস করা একমাত্র জেলা বগুড়া। আবার শতভাগ পাস করা ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের ২২টিই এই জেলার।
তবে এই সাফল্যের মধ্যেই আছে বড় পতনের হিসাব। গত বছরের তুলনায় বগুড়ায় জিপিএ-৫ কমেছে এক হাজার ৩০৫টি। পাসের হারও কমেছে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ বোর্ডের অন্য জেলার তুলনায় বগুড়া শীর্ষে থাকলেও নিজের গত বছরের ফলাফলের সঙ্গে তুলনায় এবার বড় অবনতি হয়েছে।
এবার বগুড়ায় ৩২ হাজার ১৯৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২৩ হাজার ৩৮৯ জন। পাসের হার ৭২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। গতবছর ৩৩ হাজার ২৪৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৮ হাজার ২৮৪ জন পাস করেছিল। পাসের হার ছিল ৮৫ দশমিক ০৭ শতাংশ। এক বছরে পরীক্ষার্থী কমেছে এক হাজার ৪৯ জন। একই সঙ্গে পাসের হার কমেছে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
আরও পড়ুন
এসএসসির ফলাফল: নম্বরের বাইরে যে প্রশ্ন
জিপিএ-৫-এর হিসাব আরও বড় পতনের চিত্র দেখাচ্ছে। গতবছর বগুড়ায় পাঁচ হাজার ৭৮৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এবার পেয়েছে চার হাজার ৪৭৮ জন। অর্থাৎ কমেছে এক হাজার ৩০৫টি, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২২ দশমিক ৬ শতাংশ কম। তবু বোর্ডের অন্য জেলার তুলনায় বগুড়ার অবস্থান শীর্ষে।
দ্বিতীয় জেলার চেয়ে ১ হাজার ৫২৯ জিপিএ-৫ বেশি
জেলাভিত্তিক ফলাফলে বগুড়ার অবস্থান স্পষ্ট। ৭২ দশমিক ৬৪ শতাংশ পাস নিয়ে বগুড়া প্রথম। দ্বিতীয় জয়পুরহাটে পাসের হার ৬৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৬৫ দশমিক ১৩, নওগাঁ ৬২ দশমিক ৪৯, রাজশাহী ৬২ দশমিক ২৮, নাটোর ৬১ দশমিক ২৫, পাবনা ৬০ দশমিক ৭৬ এবং সিরাজগঞ্জ ৫৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
আরও পড়ুন
এসএসসির ফলাফল খারাপ হলে বকাঝকা নয়, সন্তানের পাশে থাকবেন যেভাবে
অর্থাৎ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জয়পুরহাটের চেয়ে বগুড়ার পাসের হার ৫ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। আর সর্বনিম্ন সিরাজগঞ্জের চেয়ে ব্যবধান ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ।
জিপিএ-৫-এর ব্যবধান আরও বড়। রাজশাহী বোর্ডে এবার মোট ১৬ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর মধ্যে বগুড়ারই চার হাজার ৪৭৮ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রাজশাহীর শিক্ষার্থীরা পেয়েছে দুই হাজার ৯৪৯টি জিপিএ-৫। অর্থাৎ দ্বিতীয় জেলার চেয়ে বগুড়ায় জিপিএ-৫ বেশি এক হাজার ৫২৯টি।
শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠানেও বগুড়ার দাপট
রাজশাহী বোর্ডে এবার ৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছে। এর মধ্যে ২২টি বগুড়ার। অর্থাৎ বোর্ডের শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এই জেলার।
এ তালিকায় শহরের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি উপজেলা ও মফস্বলের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ফলে বগুড়ার ভালো ফল শুধু কয়েকটি নামি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছিল না।
বগুড়ার বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৪৩৬ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৪৩ জন। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুলে ৩৫৭ জনের সবাই পাস করেছে, জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৭৬ জন। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৪১৯ জনের মধ্যে ৪১৮ জন পাস করেছে এবং ৩২৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
আরও পড়ুন
এসএসসির খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন শুরু আজ, যেভাবে করা যাবে
বগুড়া জিলা স্কুল থেকেও ২২৩ জনের মধ্যে ২২২ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭৫ জন।
তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার অনুপাতে এগিয়ে রয়েছে বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ২১৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২১৬ জন পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮৪ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থীদের ৮৪ দশমিক ৪০ শতাংশই জিপিএ-৫ পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ বলেন, শিক্ষকদের নিবিড় তদারকি, নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের সমন্বয়েই ভালো ফল এসেছে।
শহরের বাইরেও সাফল্যের ছাপ
বগুড়ার ফলাফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপজেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান। শাজাহানপুরের মিলেনিয়াম স্কলাস্টিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১২৬ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৪ জন।
নাগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৫ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন। আরএসএফ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২৭ জনের সবাই পাস করেছে এবং ১৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। আসাতননেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪১ জনের সবাই পাস করেছে, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন।
শেরপুর উপজেলার শেরউড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৯৪ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। তাদের ১৩২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
বিএএফ শাহীন কলেজ বগুড়ায় ৯২ জনের মধ্যে ৭০ জন, টিএমএসএস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৫০ জনের মধ্যে ৮০ জন, বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৮৮ জনের মধ্যে ৬০ জন এবং ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাই স্কুলে ১১২ জনের মধ্যে ৬৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
আবার শতভাগ পাস করেও জিপিএ-৫ শূন্য প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ধুনটের পাঁচথুপি নিয়ামতিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৫ জন এবং কাহালুর বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলের ১০ জন পরীক্ষার্থী সবাই পাস করলেও কেউ জিপিএ-৫ পায়নি।
বোর্ডজুড়েই ফলের পতন
বগুড়ার ফলের পতনকে আলাদা করে দেখলে পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হবে না। কারণ এবার রাজশাহী বোর্ডের সামগ্রিক ফলেও বড় ধস নেমেছে।
এবার বোর্ডে এক লাখ ৭৬ হাজার ৪৪ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে এক লাখ ১২ হাজার ৮৬ জন। পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ জন।
গতবছর বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২২ হাজার ৩২৭ জন। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ-৫ কমেছে ছয় হাজার ২১৪টি। এবার বোর্ডের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
অর্থাৎ বোর্ডের সামগ্রিক ফল খারাপ হয়েছে। সেই পতনের মধ্যেও তুলনামূলকভাবে বগুড়ার ফল অন্য জেলার চেয়ে ভালো। কিন্তু গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে বগুড়ার পতনও কম নয়।
ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে মেয়েরা
বোর্ডের ফলাফলে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যেও বড় ব্যবধান রয়েছে। ৯২ হাজার ৭৭৩ ছাত্রের মধ্যে ৫৩ হাজার ১৯১ জন পাস করেছে। পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
অন্যদিকে ৮৩ হাজার ২৭১ ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছে ৫৮ হাজার ৮৯৫ জন। পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রীরা ছেলেদের চেয়ে ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ এগিয়ে।
বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসার রমজান আলী আকন্দ বলেন, রাজশাহী বোর্ডে বগুড়ার ফলাফল এবারও শীর্ষে রয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ ফল অর্জিত হয়েছে। শিক্ষানগরী হিসেবে বগুড়ার যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, এ ফলাফল সেটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এলবি/এসআর/জেআইএম