বিপদের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সবসময় টাকা নয়। কখনো একটি ফোনকল, কখনো একটি দরজায় কড়া নাড়া, কখনো পাশে বসে থাকা একজন মানুষ—এই সামান্য জিনিসগুলোই একজন বিপর্যস্ত মানুষের পৃথিবীকে আবার কিছুটা বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। কিন্তু আমাদের চারপাশে আজ এমন এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষে মানুষে যোগাযোগ বেড়েছে, অথচ মানুষের পাশে মানুষ কমে গেছে।
ফেসবুকে হাজার বন্ধু, ফোনে শত শত নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য অনুসারী—তবু গভীর রাতে বিপদে পড়লে ফোন করার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। একই ভবনে বছরের পর বছর পাশাপাশি বসবাস করেও প্রতিবেশীর নাম জানা হয় না। অফিসে প্রতিদিন দেখা হয়, কিন্তু সহকর্মীর ভেতরের ভাঙন সম্পর্কে কেউ জানে না। পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে বসে থাকেন, অথচ প্রত্যেকে নিজ নিজ পর্দার ভেতরে বন্দী।
আমরা কি সত্যিই এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে অন্যের কষ্টের দিকে তাকানোর সময় নেই? নাকি অন্যের কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সাহসটাই হারিয়ে ফেলছি?
মানুষের পাশে মানুষ না থাকার এই সংকট কেবল নৈতিকতার সংকট নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেরও বড় সংকট। ২০২৫ সালের World Happiness Report-এ সামাজিক সংযোগ, যত্ন ও পারস্পরিক সহায়তার গুরুত্বকে সুখ ও সুস্থতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ১৯ শতাংশ তরুণ জানিয়েছে, সামাজিক সহায়তার জন্য তারা নির্ভর করতে পারে—এমন কাউকে তাদের নেই; ২০০৬ সালের তুলনায় এই হার ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। একই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অন্যদের সঙ্গে নিয়মিত খাবার ভাগ করে খাওয়া সামাজিক সমর্থন ও ইতিবাচক পারস্পরিকতার সঙ্গে যুক্ত, আর একাকিত্বের মাত্রা কম।
একদিন হয়তো আমরা বুঝব, একটি সমাজের প্রকৃত শক্তি তার বড় ভবন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি প্রকাশ পায় বিপদের মুহূর্তে মানুষ কত দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ায়—সেখানে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ একা বাঁচে না। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে আরেকজন মানুষের কণ্ঠ, একটি উষ্ণ হাত, একটি খোলা দরজা এবং সেই আশ্বাস—‘তুমি একা নও।’
অর্থাৎ মানুষ শুধু খাবার, বাসস্থান ও আয় দিয়ে বাঁচে না। মানুষ বাঁচে সম্পর্কের ভেতরেও।
বাংলাদেশের সমাজ ঐতিহাসিকভাবে পারস্পরিক সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে। গ্রামে কারও বাড়িতে বিয়ে হলে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসতেন, কারও ঘর পুড়ে গেলে সবাই মিলে ঘর তুলতেন, কেউ অসুস্থ হলে পালা করে খোঁজ নিতেন। বিপদে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পাড়া ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান ছিল মানুষের স্বাভাবিক আশ্রয়। ‘মানুষ মানুষের জন্য’—এটি শুধু কবিতার পঙ্ক্তি ছিল না; একসময় এটি ছিল সামাজিক বাস্তবতা।
কিন্তু সেই সামাজিক কাঠামো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
নগরায়ণ মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ঢাকার একটি বহুতল ভবনে শত শত মানুষ বসবাস করেন। একই লিফটে ওঠেন, একই পার্কিং ব্যবহার করেন, একই বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু একে অন্যের জীবনের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক প্রায় নেই। কেউ অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে থাকলেও পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটি হয়তো জানেন না। কারও মৃত্যু হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকবার্তা আসে, কিন্তু জীবিত অবস্থায় তার দরজায় কেউ কড়া নাড়েনি।
এটি কেবল শহরের সমস্যা নয়। গ্রামেও সামাজিক পরিবর্তন দ্রুত ঘটছে। বিদেশে বা শহরে কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ ছড়িয়ে পড়ছে, যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার তৈরি হচ্ছে, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান বদলাচ্ছে। ফলে আগের মতো প্রতিদিনের সহায়তার নেটওয়ার্ক অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে আমাদের সময়ের ব্যবহারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু সব যোগাযোগ সম্পর্ক তৈরি করে না। ‘লাইক’ সহানুভূতি নয়, ‘কমেন্ট’ সবসময় সংযোগ নয়, আর অনলাইন উপস্থিতি কখনো কখনো বাস্তব অনুপস্থিতিকে আড়াল করে। আমরা কারও ছবি দেখে বুঝতে পারি সে কোথায় ঘুরছে, কী খাচ্ছে, কী পরছে; কিন্তু সে রাতে ঘুমাতে পারছে কি না, তা জানি না।
এখানেই আধুনিক জীবনের এক গভীর বৈপরীত্য। আমরা সবসময় সংযুক্ত, কিন্তু সবসময় একসঙ্গে নই।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই সংকট ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও গভীর সম্পর্কের অভাব অনেককে একাকিত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। World Happiness Report 2025 বলছে, সামাজিক সম্পর্ক তরুণদের মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো চাপের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সহায়তা করে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে তরুণদের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পরিচালিত একটি জাতীয় পর্যায়ের তথ্যভিত্তিক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ সঙ্গীর অভাব, বিচ্ছিন্নতা এবং প্রয়োজনে কাউকে পাশে না পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল।
অবশ্য মানুষের পাশে মানুষ না থাকার কারণ শুধু প্রযুক্তি নয়। এর পেছনে আছে অর্থনৈতিক চাপ, কর্মজীবনের দীর্ঘ সময়, নগরজীবনের প্রতিযোগিতা, সামাজিক অবিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উদ্বেগ। একজন মানুষ সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন; সন্তানদের সময় দিতে পারেন না। একজন তরুণ চাকরির অনিশ্চয়তায় উদ্বিগ্ন; বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সময় নেই। একজন বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে একই শহরে থেকেও একা। একজন গৃহিণী সারাদিন পরিবারের জন্য কাজ করেন, কিন্তু তাঁর নিজের অনুভূতি শোনার মতো মানুষ নেই।
মানুষের একাকিত্ব অনেক সময় চোখে দেখা যায় না।
কেউ ভিড়ের মধ্যে থেকেও একা। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয় হয়েও একা। কেউ পরিবারের মধ্যে থেকেও একা। আবার কেউ সবসময় হাসিমুখে থাকেন, অথচ ভেতরে গভীরভাবে ভেঙে পড়েন।
আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো—আমরা মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়ার আগে তার দৃশ্যমান প্রমাণ চাই। কেউ কাঁদলে বুঝি সে কষ্টে আছে; কিন্তু নীরব মানুষটির কষ্ট বুঝতে চাই না। কেউ সাহায্য চাইলে তাকে দুর্বল ভাবি; কেউ বারবার খোঁজ নিলে বিরক্ত হই। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে সাহায্য চাওয়াই বন্ধ করে দেয়।
এখানে আমাদের সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
কারও কষ্টকে ছোট করে দেখা যাবে না। ‘এটা কিছুই না’, ‘সবাই তো সমস্যায় আছে’, ‘সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে’—এই কথাগুলো অনেক সময় সহানুভূতির বদলে মানুষের একাকিত্ব বাড়িয়ে দেয়। একজন বিপন্ন মানুষ সবসময় সমাধান চান না; অনেক সময় তিনি শুধু চান, কেউ তাঁর কথা মন দিয়ে শুনুক।
শোনা—এটি আমাদের সামাজিক জীবনের সবচেয়ে অবহেলিত মানবিক কাজগুলোর একটি।
আমরা উত্তর দেওয়ার জন্য শুনি, বোঝার জন্য শুনি না। কেউ কথা বললে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তার কথাকে ছাপিয়ে যেতে চাই। কেউ দুঃখের কথা বললে বলি, ‘আমার তো আরও বড় সমস্যা আছে।’ এতে কথোপকথন হয়, কিন্তু সম্পর্ক তৈরি হয় না।
মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে সব সমস্যা সমাধান করে দেওয়া নয়। কখনো পাশে দাঁড়ানো মানে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, কখনো অর্থ দিয়ে সাহায্য করা, কখনো চাকরির খবর দেওয়া, আবার কখনো শুধু বলা—‘তুমি একা নও।’
এই ছোট বাক্যটি অনেক সময় মানুষের জীবনে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই মানবিকতার ওপর পুরো দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পুনর্গঠন করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় কমিউনিটি সেন্টার, পাঠাগার, খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রবীণদের মিলনকেন্দ্র এবং তরুণদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিসর প্রয়োজন। একটি শহর শুধু রাস্তা, সেতু ও ভবনের সমষ্টি নয়; মানুষের মিলিত হওয়ার জায়গাও শহরের অবকাঠামোর অংশ।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি ওয়ার্ডে নাগরিক সভা, স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক, প্রবীণদের সহায়তা, দুর্যোগে দ্রুত সামাজিক সাড়া এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম গড়ে তোলা যেতে পারে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, সহমর্মিতা, স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক দায়িত্বের চর্চাও বাড়ানো দরকার।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব আছে। কর্মীদের শুধু উৎপাদনশীলতা হিসেবে দেখা যাবে না। কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা, সহকর্মীদের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক, নমনীয়তা ও সহায়তার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একজন কর্মী যখন ব্যক্তিগত সংকটে থাকেন, তখন তাঁকে কেবল ‘পারফরম্যান্স’ দিয়ে বিচার করলে প্রতিষ্ঠানও শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিবারের ভূমিকাও নতুন করে ভাবতে হবে।
একই ঘরে থাকা আর একসঙ্গে থাকা এক বিষয় নয়। পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত কথা বলার সময় দরকার। সপ্তাহে অন্তত একটি খাবার সবাই একসঙ্গে খাওয়া, মোবাইল দূরে রেখে কথোপকথন করা, বৃদ্ধ সদস্যের কথা শোনা, সন্তানকে শুধু ফলাফল দিয়ে বিচার না করা—এসব ছোট অভ্যাস পরিবারকে আবার সম্পর্কের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে পারে। গবেষণাগুলোও দেখাচ্ছে, একসঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়া সামাজিক সংযোগ ও সুস্থতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
তবে সবচেয়ে জরুরি হলো—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখা।
আমরা প্রায়ই মানুষকে তার পেশা, আয়, রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, সামাজিক অবস্থান বা সাফল্য দিয়ে বিচার করি। তার কষ্ট, ভয়, ব্যর্থতা ও দুর্বলতার জন্য জায়গা রাখি না। ফলে মানুষ নিজের প্রকৃত অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে শেখে। একটি সমাজ তখন বাইরে থেকে খুব সক্রিয়, কিন্তু ভেতরে ভীষণ একাকী হয়ে ওঠে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সহমর্মিতা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। যে সমাজে মানুষ একে অন্যকে বিশ্বাস করে, সেখানে সহযোগিতা বাড়ে, অপরাধ কমে, দুর্যোগে মানুষ দ্রুত সাড়া দেয় এবং নাগরিক জীবন আরও নিরাপদ হয়। সামাজিক সম্পর্ক মানুষের সুখ, স্বাস্থ্য ও জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—এ কথা এখন গবেষণায়ও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যে পারস্পরিক সহায়তার যে শক্তি ছিল, তাকে আধুনিক জীবনের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করতে হবে। পুরোনো সামাজিক কাঠামো পুরোপুরি ফিরবে না, ফিরবেও না। কিন্তু তার মানবিক মূল্যবোধকে নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন নাগরিক সংস্কৃতির মাধ্যমে পুনর্গঠন করা সম্ভব।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনে হয়তো বড় কোনো বিপ্লব দরকার নেই। দরকার ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্ত। প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া। বৃদ্ধ আত্মীয়কে ফোন করা। দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই এমন বন্ধুকে একবার ফোন করা। কর্মক্ষেত্রে নীরব সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করা—‘কেমন আছেন?’ পরিবারের সদস্যের কথা না কেটে শোনা। বিপদে থাকা মানুষকে বিচার না করে পাশে দাঁড়ানো।
কারণ সমাজ ভেঙে পড়ে একদিনে নয়। মানুষ যখন একে অন্যের কষ্টকে আর নিজের বিষয় বলে মনে করে না, তখন ধীরে ধীরে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়। আর সমাজ গড়ে ওঠে বড় বড় বক্তৃতায় নয়; প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ‘মানুষের পাশে মানুষ নেই কেন?’—এটি নয়। আরও কঠিন প্রশ্ন হলো: আমি নিজে কি অন্য কারও পাশে আছি?
আমরা এমন এক পৃথিবী চাই, যেখানে বিপদের সময় সাহায্যের জন্য কাউকে ভিক্ষা চাইতে হবে না; যেখানে বৃদ্ধ মানুষটি বুঝবেন, তিনি অপ্রয়োজনীয় নন; তরুণটি জানবে, ব্যর্থ হলেও তার পাশে কেউ আছে; শোকাহত মানুষটি জানবে, তার কান্না অদৃশ্য নয়; আর নিঃসঙ্গ মানুষটি অন্তত একজনকে ফোন করে বলতে পারবে—‘আমার একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছে।’
মানুষের পাশে মানুষ থাকা কোনো অতীতের রোমান্টিক স্মৃতি নয়; এটি একটি সভ্য সমাজের মৌলিক শর্ত। অর্থনীতি বড় হতে পারে, প্রযুক্তি উন্নত হতে পারে, শহর আকাশ ছুঁতে পারে—কিন্তু মানুষ যদি মানুষের কষ্টের প্রতি অন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের ভেতর এক গভীর শূন্যতা থেকে যায়।
একদিন হয়তো আমরা বুঝব, একটি সমাজের প্রকৃত শক্তি তার বড় ভবন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি প্রকাশ পায় বিপদের মুহূর্তে মানুষ কত দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ায়—সেখানে।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ একা বাঁচে না। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে আরেকজন মানুষের কণ্ঠ, একটি উষ্ণ হাত, একটি খোলা দরজা এবং সেই আশ্বাস—‘তুমি একা নও।’
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এএসএম